বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই
(অদ্যকার আলোচ্য বিষয়ঃ প্রধানতঃ সাংখ্যদর্শনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শঙ্করাচার্যের যুক্তি।)
সাংখ্যেরা বলেন, জ্ঞান একটি মিশ্র বা যৌগিক পদার্থ, আর তারও পারে বিশ্লেষণ করতে করতে শেষে আমরা সাক্ষিস্বরূপ পুরুষের অস্তিত্ব অবগত হই। এই পুরুষ—সংখ্যায় বহু; আমরা প্রত্যেকেই এক-একটি পুরুষ। অদ্বৈত-বেদান্ত কিন্তু এর বিরুদ্ধে বলেন, পুরুষ কেবল একটিই হতে পারেন, সেই পুরুষ চেতন; তিনি অচেতন বা কোন গুণসম্পন্ন হতে পারেন না, কারণ গুণ থাকলেই সেগুলি তাঁর বন্ধনের কারণ হবে, পরিণামে সেগুলির লোপও হবে। অতএব সেই এক বস্তু অবশ্যই সর্বপ্রকারগুণরহিত, এমন কি—জ্ঞান পর্যন্ত তাতে থাকতে পারে না, এবং সেই পুরুষ জগৎ বা আর কিছুর কারণ হতে পারে না। বেদ বলেন, ‘সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্’—হে সৌম্য, প্রথমে সেই এক অদ্বিতীয় সৎই ছিলেন।৪৯
যেখানে সত্ত্বগুণ সেইখানেই জ্ঞান দেখা যায় বলে প্রমাণিত হয় না যে, সত্ত্বই জ্ঞানের কারণ; বরং, মানুষের ভিতর জ্ঞান পূর্ব হতেই রয়েছে, সত্ত্বের সান্নিধ্যে সেই জ্ঞান উদ্বুদ্ধ হয় মাত্র। যেমন আগুনের কাছে একটা লৌহগোলক রাখলে ঐ আগুন লৌহগোলকটার ভিতর পূর্ব হতেই যে তেজ অব্যক্তভাবে ছিল, তাকেই ব্যক্ত করে গোলকটাকে উত্তপ্ত করে—তার ভিতরে প্রবেশ করে না, সেই রকম।
শঙ্কর বলেন—জ্ঞান একটা বন্ধন নয়, কারণ জ্ঞান সেই পুরুষ বা ব্রহ্মের স্বরূপ। জগৎ ব্যক্ত বা অব্যক্তরূপে সর্বদাই রয়েছে, সুতরাং চিরন্তন জ্ঞেয় বস্তু একটি আছেই। জ্ঞান-বল-ক্রিয়াই ঈশ্বর। জ্ঞানলাভের জন্য তাঁর দেহেন্দ্রিয়াদি কোন আকারেরই প্রয়োজন নেই; যে সসীম, তার পক্ষে সেই অনন্ত জ্ঞানকে ধরে রাখবার জন্য একটা প্রতিবন্ধকের (অর্থাৎ দেহেন্দ্রিয়াদির) প্রয়োজন আছে বটে, কিন্তু ঈশ্বরের ঐরূপ সহায়তার আদৌ কোন আবশ্যকতা নেই। বাস্তবিক এক আত্মাই আছেন, বিভিন্ন-লোকগামী ‘সংসারী’ জীবাত্মা বলে স্বতন্ত্র আত্মা কিছু নেই। পঞ্চ প্রাণ যাঁতে একীভূত হয়েছে—এই দেহের সেই চেতন নিয়ন্তাকেই ‘জীবাত্মা’ বলে, কিন্তু সেই জীবাত্মাই পরমাত্মা, যেহেতু আত্মাই সব। তুমি তাকে যে অন্যরূপ বোধ করছ, সে ভ্রান্তি তোমারই, জীবে সে ভ্রান্তি নেই। তুমিই ব্রহ্ম, আর তুমি নিজেকে আর যা কিছু বলে ভাবছ, তা ভুল। কৃষ্ণকে কৃষ্ণ বলে পূজা কর না, কৃষ্ণের মধ্যে যে আত্মা রয়েছেন, তাঁরই উপাসনা কর। শুধু আত্মার উপাসনাতেই মুক্তিলাভ হবে। এমন কি, সগুণ ঈশ্বর পর্যন্ত সেই আত্মার বহিঃপ্রকাশমাত্র। শঙ্কর বলেছেন, ‘স্বস্বরূপানুসন্ধানং ভক্তিরিত্যভিধীয়তে।’—নিজ স্বরূপের আন্তরিক অনুসন্ধানকেই ভক্তি বলে।
আমরা ঈশ্বরলাভের জন্য যত বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে থাকি, সে সব সত্য। যেমন ধ্রুবতারাকে দেখাতে হলে তার আশপাশের নক্ষত্রগুলির সাহায্য নিতে হয়, এও তেমনি।
* * *
ভগবদ্গীতা বেদান্তসম্বন্ধে শ্রেষ্ঠ প্রামাণিক গ্রন্থ।
শুক্রবার, ১৯ জুলাই
যতদিন আমার ‘আমি, তুমি’ এইরূপ ভেদজ্ঞান রয়েছে, ততদিন একজন ভগবান্ আমাদের রক্ষা করছেন, এ-কথা বলবার অধিকারও আমার আছে। যতদিন আমার এইরূপ ভেদবোধ রয়েছে, ততদিন এই ভেদবোধ থেকে যে-সকল অনিবার্য সিদ্ধান্ত আসে, সেগুলিও নিতে হবে, ‘আমি, তুমি’ স্বীকার করলেই আমাদের আদর্শস্থানীয় আর একটি তৃতীয় বস্তু স্বীকার করতে হবে, যা আমি-তুমির মাঝখানে আছে; সেইটিই ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুস্বরূপ। যেমন বাষ্প তুষার হয়, তুষার থেকে জল হয়, সেই জল আবার গঙ্গাদি নানা নামে প্রসিদ্ধ হয়; কিন্তু যখন বাষ্পাবস্থা, তখন আর গঙ্গা নেই; আবার যখন জল, তখন তার মধ্যে বাষ্প চিন্তা করি না।
সৃষ্টি বা পরিণামের ধারণার সঙ্গে ইচ্ছাশক্তির ধারণা অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। যতদিন পর্যন্ত আমরা জগৎকে গতিশীল দেখছি, ততদিন তার পশ্চাতে ইচ্ছাশক্তির অস্তিত্ব আমাদের স্বীকার করতে হয়। ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান যে সম্পূর্ণ ভ্রম, পদার্থবিজ্ঞান তা প্রমাণ করে দেয়; আমরা কোন জিনিষকে যেমন দেখি, শুনি, স্পর্শ ঘ্রাণ বা আস্বাদ করি, স্বরূপতঃ জিনিষটা বাস্তবিক তা নয়। বিশেষ বিশেষ প্রকারের স্পন্দন বিশেষ বিশেষ ফল উৎপন্ন করছে, আর সেইগুলি আমাদের ইন্দ্রিয়ের উপর ক্রিয়া করছে; আমরা কেবল আপেক্ষিক সত্যই জানতে পারি।
‘সত্য’-শব্দ ‘সৎ’ থেকে এসেছে। যা ‘সৎ’ অর্থাৎ ‘আছে’, যেটি ‘অস্তিস্বরূপ’ সেটিই সত্য। আমাদের বর্তমান দৃষ্টি থেকে এই জগৎপ্রপঞ্চ ইচ্ছা ও জ্ঞানশক্তির প্রকাশ বলে বোধ হচ্ছে। আমাদের কাছে আমাদের অস্তিত্ব যতটুকু সত্য, তাঁর নিজের কাছে সগুণ ঈশ্বরের অস্তিত্বও ততটুকু সত্য, তদপেক্ষা অধিক সত্য নয়। আমাদের রূপ যেমন দেখা যায়, ঈশ্বরকেও তেমনি সাকারভাবে দেখা যেতে পারে। মানুষ-হিসাবে আমাদের একটি ঈশ্বরের প্রয়োজন; আত্মস্বরূপে আমাদের ঈশ্বরের প্রয়োজন থাকে না। সেইজন্যই শ্রীরামকৃষ্ণ সেই জগজ্জননীকে সদাসর্বদা তাঁর কাছে বর্তমান দেখতেন—তাঁর চারপাশের অন্যান্য সকল বস্তু অপেক্ষা তাঁকেই বেশী বাস্তব বলে দেখতেন; কিন্তু সমাধি-অবস্থায় তাঁর আত্মা ব্যতীত আর কিছুর অনুভব থাকত না। সেই সগুণ ঈশ্বর ক্রমশঃ আমাদের কাছে এগিয়ে আসতে থাকেন, শেষে তিনি যেন গলে যান, তখন ‘ঈশ্বর’ও থাকেন না, ‘আমি’ও থাকে না—সব সেই আত্মায় লীন হয়ে যায়।
