যখন মানুষ খাদ্যরূপে ফল-মূল সংগ্রাহক মাত্র ছিল, যখন খাদ্য সংগ্ৰহকালে সঙ্গীসহচর থাকলেও ঐ কার্যে সহযোগী-সহকারীর প্রয়োজনই ছিল না, তখনো কিন্তু জৈবিক কারণে নারী-পুরুষের মিলন কাম্য ছিল। তখনো হয়তো ব্যক্তিক বিবাদের কারণ ঘটত নারীসম্ভোগ নিয়ে—জীবজগতে আমরা যেমনটি দেখতে পাই। তা ছাড়া মনুষ্যস্মৃতিতে কামই বিপদ-বিবাদের উৎস। আদম-ইভের স্বৰ্গচ্যুতি ঘটে কাম-চেতনা জাগার ফলেই। প্রথম পার্থিব বিবাদ ও নরহত্যার মূলে ছিল নারীর লাবণ্য। কাবিলের হাবিল-হত্যা দিয়েই শুরু ভ্রাতৃ-হননের তথা নরনিধনের। গ্রিক-হিন্দু পুরাণেও রয়েছে দেব-দানবের নারীকেন্দ্রীয় বিবাদ-বিগ্রহের কাহিনী। হোমার-বাল্মীকি-ব্যাসের কাব্যে নয় কেবল, দুনিয়ার রূপকথা, উপকথা ও ইতিকথার মূলেও রয়েছে পুরুষ-ভোগ্য নারী।
কাজেই ‘জমি’র আগে ‘জরু’ই ছিল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উৎস। তারপর পশুপালক ও কৃষিজীবী মানুষের জীবনে বিবাদ-বিগ্রহের কারণ দাঁড়াল দুটো–জারু ও জমি। আরো অনেক পরে যুক্ত হল। আরেকটি কারণ–তা হচ্ছে ‘জওহর’।
সংস্কারমুক্ত স্বৈরিণী নারীর যে-কোনো পুরুষকে দেহ দানে হয়তো আপত্তি ছিল না, কিন্তু সন্তানধারণ ও লালনের জন্যে সে নিশ্চয়ই সহকারীর প্রয়োজন অনুভব করত। সেই আদি জৈব-জীবনে কে করবে। কার সহায়তা! তাই বোধহয় সামাজিকভাবে নারী এক বিশেষ পুরুষের প্রতিই গ্ৰীতি রাখত সাহায্য-সহযোগিতা লাভের প্রত্যাশায়। আজকের মতো এত সচেতন কিংবা সূক্ষ্ম না হোক, নারী কিংবা পুরুষ একেবারে দুর্লভ-দুর্লক্ষ্য না হলে সেদিনও হয়তো অবচেতন রুচিরও একটা প্রেরণা ছিল। যদি এ অনুমান সত্য হয়, তা হলে মানতেই হবে যে পুরুষ ও নারীমাত্ৰই অবিচারে একে অপরের কাম্যজন ছিল না। সেদিনও হয়তো পুরুষে পুরুষে বিরোধ-বিবাদের কারণ ঘটত যৌবনবতী স্বাস্থ্যসুন্দর নারীর রূপ-যৌবন উপভোগের দাবি নিয়েই। নারীও হয়তো বুকে পড়ত সবল-সুরূপপৌরষদৃপ্ত পুরুষের প্রতি। তাই আপ্তবাক্যে ‘জরু ও জমি বীরভোগ্যা’।
অতএব নারী-সমস্যাই মনুষ্যজীবনের আদি ও গুরু সমস্যা–এ অনুমান অসঙ্গত নয়। তাই নিয়ন্ত্রিত কামচৰ্চার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান খুঁজেছে আদিসমাজ। আদম-ইভের প্রতিবারের সন্তান হত বিপরীত লিঙ্গের যমজ। তাদের মধ্যে বিয়ে হতে পারত না। আদিম বুনো বর্বর সমাজে যখন ব্যক্তি-বিয়ে চালু হয় নি, তখন যে নির্বিচার সঙ্গমের রেওয়াজ চালু ছিল, তাতে দেখা যায় স্ব-ক্ল্যান সঙ্গম ছিল টেবু বা নিষিদ্ধ। দুই ভিন্ন ক্ল্যানের নারী-পুরুষে হত কামচৰ্চা–এরই নাম যৌথ বিয়ে। দ্ৰৌপদীকে পাঁচ ভাই বিয়ে করলেন বটে, কিন্তু বিরোধ-বিবাদ এড়ানোর জন্যেই ভাইদের মধ্যে পালাভোগ ছিল। আজও হিন্দুদের মধ্যে জ্ঞাতি বিয়ে নিষিদ্ধ। বৌদ্ধ জাতক মতে রাম-সীতা ছিলেন ভাই-বোন। চার ভাইয়ের এক সুন্দরী বোন থাকলে ভ্ৰাতৃবিরোধ ও ভ্রাতৃহন্তা এড়ানো অসম্ভব দেখেই কেবল ভাই-বোনে নয়, বিশেষ বিশেষ নিকটাত্মীয় বিয়ে আদিসমাজেই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তবু আগে যাদের মধ্যে সঙ্গম-সম্পর্ক হতে পারত, পরবর্তীকালে তা অনভিপ্রেত হলেও, আজও ঠাট্টা-মস্কারার মধ্যে সেসম্পর্ক-স্মৃতির রেশ মেলে। উনিশ শতকেও আরাকানে বর্ময় রাজা ‘মা’ ছাড়া সব পিতৃপত্নীর সম্ভোগ-অধিকার পেত উত্তরাধিকার সূত্রেই। কোনো কোনো বুনোমানুষ সসম্পত্তি বিধবা মামিকে পত্নীরূপে পায়। কোথাও কোথাও মামা-ভাগ্নী বিয়ে করতে পারে। অনেক সমাজেই নিজের পিতা-মাতার সন্তান ছাড়া, ভাই-বোন সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়দের বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ইসলামে চৌদ্দ রকম সম্পর্কের আত্মীয়-কুটুম্বে বিয়ে নিষিদ্ধ। যখন মাতৃকেন্দ্রী ক্ল্যান ছিল তখনো হয়তো রানী মৌমাছির মতোই সঙ্গমের কিছু প্ৰাকৃত বা উদ্ভাবিত বিধি-বিধানের বেড়ার বাধা ছিল। নানা কারণে মনে হয়, আদিমানুষের মধ্যেও কামচৰ্চা ছিল কোনোরকমের বিধি-নিয়ন্ত্রিত–তা গোত্রপতির নির্দেশেই হোক কিংবা জাদু-সংস্কারবশেই হোক। মানতেই হবে যে-সমাজে যেদিন ব্যক্তিক বিয়ে চালু হল, সেদিন থেকেই সে-সমাজে আধুনিক সংজ্ঞার পরিবার-পরিজনও গড়ে ওঠে। সভ্যতা-সংস্কৃতির পত্তন সে-মুহূর্ত থেকেই। যথার্থ আত্মীয়, আত্মীয়তা ও আত্মীয়-সমাজ গড়ে ওঠে ব্যক্তিক-বিয়ে ভিত্তি করেই। জারু নিয়ে নিত্য বিবাদের আশঙ্কা এভাবেই ঘুচিল। কিন্তু জমি নিয়ে বিবাদ বৃদ্ধির কারণও বাড়ল।
ব্যক্তিক বিয়ে থেকেই সামাজিক স্বীকৃতির উদ্দেশ্যেই হয়তো বিয়ের উৎসব ও ভোজ চালু হয়। আর নারী যখন প্রবল পুরুষের ভোগ্যা, তখন রূপ-গুণ-যৌবনবতী নারীও বেচা-কেনার পণ্য হল। পণ আভরণ ও নামান্তরে বিক্রি কিংবা ভাড়ামূল্যই। এই দাম্পত্যলব্ধ সন্তানই নন্দন-নন্দিনী। কাজেই তেমন সন্তানের জন্মে আনন্দ-উৎসবের এবং কল্যাণে নানা আচার-সংস্কারের উদ্ভব। অতএব স্থায়ী দাম্পত্য মানবিক বৃত্তিবিকাশের ও মানব-সমাজ-সংহতির একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ও স্তর। দাম্পত্য-ভিত্তিক পরিবার-পরিজন-আত্মীয়-কুটুম্ব্বের পারস্পরিক প্রীতিপ্রসূত বিশ্বাস-ভরসা ও নির্ভরতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ব-চেতনা ও কর্তব্য বুদ্ধি মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক রীতি-রেওয়াজ, প্ৰথা-প্রতিষ্ঠান ও আচার-আচরণকে মিলনমুখী ও কল্যাণধৰ্মী করতে সহায়তা করেছে। সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশে এসবের প্রভাব গভীর ও ব্যাপক হয়েছিল। অবাধ কামচৰ্চা শুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করেছিল বলেই হয়তো অবৈধ কামচৰ্চা আজও গুরুতর পাপ, লজ্জা, নিন্দা ও শাস্তির বিষয়। বন্ধু-সখী মহলে এমনকি দাম্পত্যজীবনেও রতিক্রিয়ার আলোচনা অশ্লীল, অনভিপ্রেত ও লজ্জাকর।
