॥ জঙ্গনামা ॥
কারবালা কাহিনী নিয়েও অনেক যুদ্ধকাব্য ও মর্সিয়া-সাহিত্য গড়ে উঠেছে। এগুলো সাধারণত জারি ও জঙ্গনামা নামে পরিচিত। এ বিষয়ক ফারসি কেতাব মক্তুল হোসেনকে আদর্শ করেই বাঙলা জঙ্গনামাগুলো রচিত হয়েছে। বাঙলায় মত্তুল হোসেন বা জঙ্গনামার আদি কবি দৌলত উজির বাহরাম খান (১৬ শতক)। দ্বিতীয় কবি শেখ ফয়জুল্লাহ, ইনি জয়নবের চৌতিশা নামে বিলাপ রচনা করেন। তৃতীয় কবি মোহাম্মদ খান। ইনিই জঙ্গনামার শ্রেষ্ঠ কবি; তার কাব্যের নাম মক্তুল হোসেন। এর পরে যারা জঙ্গনামা রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে হায়াত মাহমুদ, জাফর, গরীবুল্লাহ ইয়াকুব, সফীউদ্দিন, সাদ আলী, আলি মোহাম্মদ, জিন্নাত আলী, হামিদুল্লাহ খান, আবদুল ওহাব, রাধাচরণ গোপ, মুহম্মদ মুন্সী, আবদুল হামিদ ও জনাব আলীর নাম উল্লেখযোগ্য। কারবালা যুদ্ধ ঐতিহাসিক কাহিনী। কিন্তু আমাদের পুথিকারেরা অলৌকিক ও অপ্রাকৃত কাহিনী সংযোগে তাকে রূপকথায় পরিণত করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন যুদ্ধকাহিনী রয়েছে–রসুল বিজয়, আলির জঙ্গনামা, জয়কুমরাজার লড়াই, হানিফার লড়াই, হামজার দিগ্বিজয়, জঙ্গে বদর, জঙ্গে খয়বর প্রভৃতি। ইসলামের উন্মেষযুগের এসব গৌরবগাথা রচনা করে মুসলমানকে স্বাজাত্যগর্বী ও স্বধর্মনিষ্ঠ করার প্রয়োস ছিল কবিদের।
॥ বিবিধ রচনা ॥
এ ছাড়া, রাগ-তাল, জ্যোতিষ, চিকিৎসাশাস্ত্র, তুক্তা প্রভৃতি নানা বিষয়ক অনেক রচনা পাওয়া যায়। বারোমাসী কিংবা চৌত্রিশা কোনো বিশেষ বিষয়ক রচনা নয়। বারোমাসীতে মাস ও ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সাথে নায়িকার (কৃচিৎ নায়কের) হৃদয়ের বৃত্তি-প্রবৃত্তির রূপান্তরের, বিশেষ করে বিরহ ব্যথার, চিত্র অঙ্কিত হয়। আর বাঙলার চৌত্রিশটি বর্ণের প্রত্যেকটিকে এক বা একাধিক পঙক্তির আদ্যক্ষর রূপে প্রয়োগ করে যে-পদবন্ধ রচনা করা হয় তাকেই চৌত্রিশা বলে। প্রায় সব পুথিতে বারোমাসী ও চৌত্রিশা পাওয়া যায়। এগুলো সেকালের সাহিত্য-শিল্পের বিশেষ অঙ্গ ছিল।
॥ দোভাষীরীতি ॥
সতেরো শতকের কবি কৃষ্ণরাম দাস তাঁর রায় মঙ্গল নামক কাব্যে বড় খা গাজীর মুখে ভাঙা হিন্দি প্রয়োগ করেছিলেন, সেই থেকে প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন সত্যনারায়ণ পাঁচালিকার ও ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ প্রমুখ কবি অবাঙালি পাত্র-পাত্রী মুখে বিকৃত হিন্দুস্তানী ব্যবহার করেছেন। আঠারো শতকের শেষার্ধে হাওড়াবাসী কবি ফকির গরীবুল্লাহই (১৭৫৭-৮০ ) প্রথম বাঙলা ও হিন্দুস্তানী বাকধারার মিশ্রণে তার ইউসুফ জোলেখা, সোনাভান, মদন কামদেব পালা (সত্যপীরের পাঁচালি) ও জঙ্গনামা (হোসেন মঙ্গল) রচনা করেন। এই রীতির নাম দোভাষী রীতি। এ ভাষার লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হিন্দুস্থানী (অর্থাৎ আরবি-ফারসি ও হিন্দি শব্দাধিক্য) শব্দ এবং হিন্দি বাক্য গঠন-রীতির প্রভাবপ্রসূত তেরা, মেরা, এয়সা, যেএসা প্রভৃতির বহুল প্রয়োগ। আঠারো শতকে গরীবুল্লাহ অনুসরণ করেন হাওড়াবাসী সৈয়দ হামজা (১৭৮৮-১৮০৫ খ্র.)। উনিশ-বিশ শতকে হাওড়া-হুঁগলীবাসী কবি মালে মুহম্মদ, জনাব আলি, মুহম্মদ খাতের প্রমুখ বহু কবি দোভাষী রীতিতে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু হাওড়া, হুগলী ও কলকাতা অঞ্চলের বাইরে কোথাও মুসলমানেরা এ রীতির অনুকরণ চর্চা করেনি।
কাজেই দোভাষী রীতি ব্রজবুলির মতো একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা। নতুন বন্দর কলকাতাকে কেন্দ্র করেই এর উদ্ভব এবং তার চতুম্পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরাই এর স্রষ্টা এবং ধারক। দোভাষী সাহিত্য ইংরেজ আমলের রাজধানী ও বন্দর অঞ্চলের অর্থাৎ কলকাতা-হাওড়া হুগলী এলাকার নির্জিত আধাবাঙালি মুসলমানের মন, মনন ও সংস্কৃতির প্রসূন। রোমান্স থেকে শরিয়ত-কথা অবধি সব বিষয়েই দোভাষী গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু এগুলো ভাষায়, ভাবে ও ভঙ্গিতে সাহিত্য হয়নি। তবু গত দেড়শ বছর ধরে বাঙলার অশিক্ষিত জনসাধারণের রস-পিপাসা ও জিজ্ঞাসা মিটিয়ে আসছে এ সাহিত্য। বিকল্প পাঠ্যপুস্তকের অভাবে সবাইকে পড়তে-শুনতে হয়েছে বলে একে জনপ্রিয় সাহিত্য বলে মনে করার হেতু নেই। অকালে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে মানুষ যা খায়, তাকে পুষ্টিকর সুখাদ্য বলে না ওতে ধড়ে প্রাণ যদি-বা টিকে থাকে, কিন্তু স্বাস্থ্যরক্ষা হয় না। দোভাষী পুথিও মানস-আকালের সাহিত্য। যারা এ সাহিত্য রচনা করেছেন, তাদের বর্তমান ছিল অনিশ্চিত আর ভবিষ্যৎ ছিল অন্ধকার। তাই তাঁরা আশ্রয় খুঁজেছেন কল্পলোকে এবং অতীতের গৌরবময় ও আনন্দোচ্ছল জগতে একটু শ্রান্তিহর ও গ্লানিমুক্ত স্বস্তির ভরসায়। অতএব, জীবনবিমুখ কল্পনাশ্রয়ী এ সাহিত্যের সঙ্গে মন বা মাটির যোগ ছিল না, এ হল পরগাছা।
দোভাষী পুথিতে কেউ কেউ মুসলমানদের গৌরবের সামগ্রী খুঁজে পান। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গরীবুল্লাহর আবির্ভাব পলাশী যুদ্ধের পরে এবং তাঁর গ্রন্থগুলি রচিত হয় ১৭৬০-৮০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে। নতুন-পুরাতনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে সমাজ-সংস্কৃতির পরিবর্তনের এবং রাষ্ট্রীয় ও অর্থনীতিক ভাঙাগড়ার এ সময়টিতে জীবন-জীবিকায় যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, বগীর হাঙ্গামা ও কোম্পানির দেওয়ানী লাভের ফলে ধন-প্রাণের উপর আকস্মিক বিপদপাতের যে-শঙ্কা জেগেছিল তাতে কারো পক্ষেই রসচর্চা করা সম্ভব ছিল না। তবু মানুষ যেহেতু স্থবির নয় এবং নাড়ির ক্ষুধার মতো মানস ক্ষুধাও মিটাতে হয় সেহেতু নিতান্ত গরজে পড়ে কাজ চালানো গোছের রসচর্চা তাকে করতেই হয়েছে। সুখ-সৌভাগ্যে যেমন রাজধানীর লোকেরই অগ্রাধিকার, দুঃখ-নির্যাতনেরও তেমনি তারাই প্রথম শিকার। এ রাষ্ট্রিক, আর্থিক, তজ্জাত নৈতিক, সমাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পুরোনো শহর মুর্শিদাবাদ ও নতুন বন্দর কলকাতা ও তার উপকণ্ঠের লোক যখন দিশেহারা, তখনো দূরাঞ্চলে সে হাওয়া পৌঁছেনি। কলকাতায় তখন বুদ্ধিমান ও উদ্যোগী কিন্তু চরিত্রহীন, ঘরছাড়া, বেপরোয়া লোকের ভিড় জমেছে। কলকাতা তখন দালাল, বেনিয়া, জোচ্চোর ও ঠকের আড়া। এ বাজারে ইংরেজ-বাঙালি র চারিত্রিক ভেদ ছিল না। অযোগ্য ও দুশ্চরিত্র লোকের হাতে টাকা এলে যা হয়, তাই হল; এসব হঠাৎ-নবাবেরা ধরাকে সরা-জ্ঞানে উদ্দাম হয়ে উঠল। স্বল্প লোকের এ শ্ৰেণীটা ছাড়া বাকি লোকের জীবন তখন সর্বপ্রকার অনিশ্চয়তায় ম্লান। এমনি পরিবেশে কলকাতার হিন্দুসমাজে কবিওয়ালা আর মুসলমান সমাজে শায়ের-এর উদ্ভব। দুটো নামই তাচ্ছিল্য জ্ঞাপক। প্রশ্ন হতে পারে, কোম্পানির প্রত্যয়-পুষ্ট, কৃপা-জীবী হিন্দুরা যখন কোম্পানির অযাচিত অনুগ্রহে উদ্দাম হয়ে উঠছিল, তখন হিন্দুসমাজে কেন বন্ধ্যা যুগ এল? উত্তরে এটুকু বললেই চলে যে আপামরে বিলাবার মতো কৃপার পুঁজি তখনো কোম্পানির হাতে আসেনি; বিশেষত দেশের কোটি মানুষের জীবনে যখন দুর্যোগ-দুর্দিন নেমে এসেছে, তখন গুটিকয় সুখী মানুষের অন্তৰ্জীবনেও স্বস্তি থাকতে পারে না। দূষিত আবহ তাদের অবচেতন মনে নিশ্চিতই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভারতচন্দ্রের ভাষায় বলা যায় নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?