বললাম, তুমি সদয় হলেই লিখতে পারি।
ছদ্ম ভয়ে দু চোখ বড় করে ফেলল একটু, সদয় হলে মানে? কি করতে হবে?
-মাঝের বাইশটা বছরের ফারাক জুড়তে হবে, অর্থাৎ বাইশ বছরের খবর সব বলতে হবে।
সুলক্ষণা বলল, না শুনেই তো ঘেন্নায় চলে যেতে চাইছিলে, শুনলে তো এ নাম আর মুখেও আনবে না–কলম ধরা তো দূরের কথা!
সেই বিরূপ অনুভূতিটা এরই মধ্যে নিঃশেষে মিলিয়ে গেল কি করে ভেবে পাচ্ছিলাম না। এখন থেকে থেকে কেন যেন কেবলই মনে হচ্ছে শোনার মতো অনেক কথা আছে, আর শুনলে পর কলমও ধরা যাবে। গম্ভীর বক্তৃতার সুরে বললাম, লেখক হিসেবে আমি ভালো-মন্দ সুন্দর-কুৎসিত সব দেখি আর শুনি, শেষে তাই থেকেই জীবন-সোনা ঝালিয়ে তুলি।
সুলক্ষণা তেমনি চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখতে লাগল। তারপর বলল, ও বাবা। থাক, এটুকু শুনেই আমি ঘাবড়ে যাচ্ছি।
চায়ের ট্রে হাতে একটি মেয়ে ঘরে ঢুকল। দু পেয়ালা চা, একটা ডিশে কিছু ঘরের তৈরি খাবার। একটা কাগজ পেতে দিয়ে সেই ট্রেও শয্যার ওপরেই রাখতে বলল সুলক্ষণা। এটুকুও ব্যতিক্রম মনে হল আমার। কারণ, মেয়েটির মুখে বিস্ময়। মাখা সম্ভ্রম দেখলাম।
মেয়েটি চলে যেতে সুলক্ষণা ট্রে থেকে নিজের পেয়ালাটা শুধু তুলে নিল। বললাম, আর কিছু নেবে না?
নাঃ, তোমার খাতিরে চা খাচ্ছি, নইলে এ-সময় কিছুই চলে না। তুমি খাও
একটু বাদে হালকা সুরে জিজ্ঞাসা করল, জয়ন্ত আমার কথা আর কি বলেছে তোমাকে?
-বলেছে, বয়েস হলেও এখনো বেশ মাইরি, চোখ ফেরানো যায় না।
হাসতে গিয়ে চা আটকে বিষম খেল সুলক্ষণা। তারপর আধা-খাওয়া পেয়ালা ঘরের কোণে সরিয়ে রাখতে রাখতে হেসেই রাগ দেখালো, বরাবর ওটা পাজির পা-ঝাড়া একটা
আমি নরম প্রতিবাদ করলাম, কেন, খুব মিথ্যে তো বলেনি।
হ্যাঁ, চাইলে ওর চোখে বাইশ বছর আগের সেই হাসি এখনো ঝিলিক দিয়ে উঠতে পারে বটে। মুখে তরল ঝাঝালো সুরে বলল, দেখো, তুমি ওর সঙ্গে গলা মিলিও না বলছি।
খেতে খেতে নিরীহ প্রশ্ন ছুঁড়লাম, মেলালে ওর মতোই গলাধাক্কা দেবে?
ও মা, ওকে গলাধাক্কা কখন দিলাম!
বাড়ির হদিস দিলে না, আসবে বলে এলেও না–গলাধাক্কা আর কাকে বলে?
ও হাসতে লাগল। তারপর বলল, নাঃ, তোমার সঙ্গে ওর মতো ব্যবহার করব, হাজার হোক দুর্বলতা একদা ছিলই
-কার ছিল, তোমার না আমার?
-তুমি বড় জেরা করো। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, এখানে কোথায় উঠেছ?
বললাম। একটু ভেবে নিয়ে সুলক্ষণা বলল, লোভ হলেও এখানে তোমাকে থাকতে বলতে পারছি না, জানলে কত জনের চোখ টাটাবে ঠিক নেই। তার থেকে দুপুরে আর রাতে এখানে এসে খাবে–বেশি দূর নয়, টাঙায় মিনিট দশেক লাগে।
-আমি তো কালই দিল্লী চলে যাচ্ছি।
যেন আমার ওপর এখনো জোর আছে, এমনি করে সুলক্ষণা বলল, কাল তুমি মোটেই যাচ্ছ না।
আপত্তি নেই খুব, কারণ সুলক্ষণার জীবনের মাঝের এই বাইশটা বছর নিয়ে এখন দুর্বার কৌতূহল আমার। এতগুলো মেয়ের মধ্যে ওকে ঠিক এই পরিবেশে না দেখলে এত আগ্রহ হত না হয়তো।
একটু বাদেই ওদিক থেকে শাঁখের আওয়াজ কানে এলো। একটি মেয়ে সাঁঝের ধূপধুনো দিয়ে গেল। তারপরেই খোলকরতালের আওয়াজ শুনলাম। সুলক্ষণা আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরুলো। শেষের বড় ঘরটায় এসে ঢুকলাম ওর সঙ্গে। সেখানে এ-মাথা ও-মাথা শতরঞ্জীর ওপর ফরাস পাতা। সেই ফরাসে এখন তিরিশ-চল্লিশটি মেয়েছেলে বসে। বেশির ভাগই বয়স্কা আর বিধবা। ঘরের এক মাথায় মালা গলায় বেশ বড়সড় গোপাল মূর্তি। তার সামনে হারমোনিয়াম, তবলা, খোল করতাল। সেখানে এখানকার অর্থাৎ এই ডেরার মেয়েরা বসে। তাদের সামনে বেশ সুন্দর একটা আসন পাতা।
আমাকে সামনের দিকে বসিয়ে সুলক্ষণা এগিয়ে গিয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে গোপাল প্রণাম করল। কম করে তিন-চার মিনিট মাথা ঠেকিয়ে পড়ে রইল সে। তারপর উঠে আস্তে আস্তে সেই খালি আসনটায় গিয়ে বসল।
গান শুরু হল। একটানা ভজন গান। মূল গায়িকা সুলক্ষণা। অন্য মেয়েরাও থেকে থেকে সুর মেলাচ্ছে, সুলক্ষণা থামলে তারা সেই বিরতিটুকু ভরাট করে রাখছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলল এই গান। না, এরকম গান আমি খুব বেশি শুনিনি। গলা বরাবরই মিষ্টি ছিল সুলক্ষণার। সেই গলা কত যে ভালো হয়েছে আরো, কানে না শুনলে বিশ্বাস হত না। কিন্তু এই গানের গলা আর সুরই যেন সব নয়, সমষ্টিগত সত্তার নিবিড় যোগ না থাকলে এমন গান হয় না, এ-রকম পরিবেশ সৃষ্টি হয় না।
বাইরের মহিলারা সব উঠে উঠে গোপাল প্রণাম করে টাকা আধুলি সিকিটা ফেলে চলে যেতে লাগলেন।
আমি উঠে পায়ে পায়ে আবার সুলক্ষণার ঘরে এসে বসলাম। বাইশ বছর আগের সুলক্ষণার সঙ্গে একে যেন কিছুতে মেলাতে পারছিলাম না।
মিনিট পনের বাদে সুলক্ষণা ঘরে এলো। চোখে মুখের সেই তন্ময় ভাবটুকু গেছে। হালকা সুরেই জিজ্ঞাসা করল, কেমন লাগল?
-বেশ।
ঠিক এইটুকু জবাব আশা করেনি হয়তো। মুখের দিকে চেয়ে রইল। ভিতরটা আমার হঠাৎই আবার কেন যে অসহিষ্ণু হয়ে উঠল জানি না। হয়তো, সুলক্ষণার বাইশ বছর আগের ঘর ছাড়া, আর এই গোপাল চরণে আত্মসমর্পণ–এর কোনোটার সঙ্গেই আপোস নেই আমার।
বললাম, সবটুকুই ভক্তি না এর সঙ্গে জীবিকার যোগও আছে?
থমকে তাকালো মুখের দিকে। মনে হল বেদনার ছায়াও পড়ল একটু। জবাব দিল, জীবিকার ব্যবস্থা না থাকলে ভক্তি আসবে কোত্থেকে?
