সোমা গাঙ্গুলি তেমনি জবাব দিলেন, মিথ্যের ব্যবসারও কিছু সুবিধে হয় বোধহয়।
ওঁরা না বুঝেও হাসলেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে, এবার ওঠার তাড়া। অবশ্য রিকশতেই যাবেন, অল্প রাস্তা হলেও হিম লাগার ভয়ে সোমা তার ভদ্রলোককে হাঁটতে দেবেন না।
সকলে একসঙ্গে নেমে আসতেই খাৈকা গাঙ্গুলির দুচোখ তামার খনির দিকে গেল। ওদিকটা গনগনে লাল। সেই লালের আভা আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়েছে। রাত হতে না হতে রোজই সকলের চোখে পড়ে তামার খনির অগ্নিকুণ্ডের আগুন। সেদিকে চোখ রেখে খোকা গাঙ্গুলি নিস্পৃহ মন্তব্য করলেন, ওই তপতপে লাল দেখতে বেশ লাগে আমার, ঘরে যিনি আছেন তাঁর সঙ্গে ওটার প্রায়ই খুব মিল দেখি।
মোহিনী সরকার জোরেই বলে উঠলেন, অবজেকশন-অবজেকশন! একজন। মহিলার ওপর আপনি মিথ্যে অপবাদ চাপাচ্ছেন।
সোমা চাপা গলায় ঠেস দিলেন, মিথ্যের ব্যবসা পেশা নিজেই তো স্বীকার করেছেন–অবজেকশন দিয়ে কি লাভ।
পরের তিনদিন রোজই হাটে বা বাজারে আর সুবর্ণরেখার ধারে দেখা হয়েছে। এই অন্য জুটিকে পেয়ে সরকার-দম্পতির দিন বেশ হাসিখুশির মধ্যে কাটছে। সেদিন বাজারে এসে তারা অন্য জুটিকে দেখলেন না। অবশ্য বাজারে ওঁরা রোজ আসেন না, মাঝে মাঝে বৃন্দাবন আসে। তাকেই দেখলেন। তক্ষুণি দুজনের মধ্যে প্ল্যান হল। একটু ঘটা করেই বাজার সারলেন তারা। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ দুজনে বেড়াবার জন্য তৈরি হয়ে বাংলো থেকে বেরুলেন। সোজা রেল লাইনের দিকে অর্থাৎ গাঙ্গুলি বাড়ির দিকে চললেন। উদ্দেশ্য রাতে বাড়িতে ওঁদের ডিনারের নেমন্তন্ন করবেন। সকলে একসঙ্গে বেড়ানো সেরে ওঁদের সঙ্গে করে বাংলোয় ফিরবেন।
পৌঁছুলেন। সামনের ঘরের ভেজানো দরজা দুটো চার-ছ আঙুল ফাঁক। মোহিনী সরকার দরজা ঠেলতেই মেঝেতে তিনটে খাম চোখে পড়ল। ডাক-পিওন দরজার ফাঁক দিয়ে ফেলে দিয়ে গেছে। খাম তিনটে তিনি ম্যাট থেকে কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হবার ফাঁকে একটা খামের ওপরে চোখ পড়তেই থমকালেন একটু। তারপরেই বিমূঢ় কেমন। ভুরু কুঁচকে পরের খামটার নাম ঠিকানা দেখলেন। তার পরেরটারও। তারপর আকাশ থেকে পড়া মুখ করে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
স্বামীর এই আচরণ দেখে বিভা সরকারও কম অবাক নন। তিনি কিছু বলতে যেতেই একটা আঙুল ঠোঁটে ঠেকিয়ে মোহিনী সরকার তাঁকে কথা বলতে নিষেধ করলেন। তার পরে তিনটে খামেরই ওপরের নাম দেখালেন। ঠিকানার ওপরে প্রত্যেকটাতে নাম লেখা, মহাদেব গাঙ্গুলি।
বিভা সরকারও প্রথমে বিমূঢ় কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই বেশ বড় সড় ঝাঁকুনি খেলেন একটা। ওই খামের নামের ওপর দু চোখ ঠিকরে পড়ার দাখিল–দেখেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। নিজের অগোচরে গলা দিয়ে অস্ফুট একটা শব্দই বেরিয়ে এলো। সেটা আনন্দের থেকে ঢের বেশি বিস্ময়ের।
ভিতর থেকে খোকা গাঙ্গুলির গলা শোনা গেল, দেখ তো ওঁরা এলেন বোধ
সোমা গাঙ্গুলি এলেন। হেসে আপ্যায়ন জানাতে গিয়েও থমকালেন। বিশেষ করে বিভা সরকারের মুখ আর চাউনি কি রকম লাগল, বললেন, কি ব্যাপার, ওঁকে কি ছুটিয়ে নিয়ে এলেন নাকি?
মোহিনী সরকারের হাত দুটো পিছনে। জবাব দিলেন, না, এখানে এসে ছুটছেন। আপনার ভদ্রলোককে ডাকুন।
ডাকতে হল না। নিজেই এলেন। সেই চিরাচরিত গম্ভীর মুখ।–এই যে আসুন, আজ একটু সকাল সকাল মনে হচ্ছে…।
সে কথার জবাব না দিয়ে মোহিনী সরকার একটা খাম তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। –এই মেঝেতে পড়েছিল, দেখুন তো পিওনটা ভুল করে দিয়ে গেল নাকি!
খামটা হাতে নিয়ে চোখ বোলাবার সঙ্গে সঙ্গে মোহিনী সরকার এই প্রথম ভদ্রলোকের মুখে চকিত বিড়ম্বনার ছায়া দেখলেন একটু। অস্ফুট কথাও শুনলেন, তাই তো দেখছি…
-এটা? দ্বিতীয় খাম সামনে ধরলেন মোহিনী সরকার।
–এ-ও তো….
–আর এটা? কিছু বলার আগেই তৃতীয় খাম।
তৃতীয় খামটাও হাতে নেবার পর ভদ্রলোকের মুখে বিড়ম্বনার হাসি একটু। এ যে দেখি মহাদেব গাঙ্গুলির ট্রায়ো একেবারে।
সোমা গাঙ্গুলি দ্বিতীয় খাম দেখার পরেই ব্যাপার বুঝেছেন। হাসি চাপার চেষ্টায় মুখে আঁচল চাপা দিয়েছেন।
মোহিনী সরকার তার স্ত্রীর দিকে ফিরলেন। গম্ভীর আদেশের সুরে বললেন, চলো–
সোমা ব্যস্ত।-ও কি, বসুন!
-বসব! ওঁর নামে আমি ক্রিমিন্যাল কেস আনব–নাম ভাড়ানোর মজাখানা উনি টের পাবেন।
সোমা হেসে বললেন, বেশ আনবেন। এখন তো বসুন।
বিভা সরকারের মুখে রাগ-বিরাগের কোনো চিহ্নই নেই। দেখলে মনে হবে হঠাৎ যেন তিনি এক নতুন জগতে ঢুকে পড়েছেন। সেই উত্তেজনায় দাঁড়াতেও পারছেন না। একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। দ্বিতীয় চেয়ারের দিকে এগোতে এগোতে মোহিনী সরকার বললেন, হ্যাঁ মশাই এতগুলো দিন দিব্যি নিজেকে খোকা গাঙ্গুলি বলে চালিয়ে দিলেন?
মহাদেববাবুর শুধু ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি। জবাব দিলেন, মা গঙ্গার সেই আশীর্বাদে আমার অদৃষ্টখানা দেখুন–সত্যি বললেও সেটা মিথ্যে হয়ে যায়। ওই নামটাও মিথ্যে নয়, বাপ-মায়ের আদরের নাম।
-আমরা তো আপনার বাপ-মা নই, আমাদের কাছে ওই আদরের নাম চালানোর অর্থ কি?
ইজি-চেয়ারে শরীরটাকে আরো একটু শিথিল করে জবাব দিলেন, প্রাণের দায়ে মশাই, প্রাণের দায়ে। এখানে একটা কলেজ আছে জানি, আর এসে জানলাম বড় একটা পাবলিক লাইব্রেরি আছে–আর অন্যদিকে দেয়ালেরও কান আছে। তাই এখানে এসেই আমি খোকা গাঙ্গুলি।
