বিক্রমকে কথার মধ্যে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সেই ব্যোমবাহাদুর কি নেই এখন?
—তা বছর আষ্টেক হল। শেষ দিকে খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল। কিছুতেই মন ভরে না, সারাক্ষণ হম্বিতম্বি। তারপর তো বউ মরতে মাথাই খারাপ হয়ে গেল।
.
-মাথা খারাপ হয়ে গেল! ব্যোমবাহাদুরের!
–ওই আর কি! একা হয়ে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে ঘুম স্টেশনে গিয়ে বসে থাকত।
–কেন, ওর ছেলেপুলে ছিল না?
—কোথায়? ওর বউয়ের তো একটার পর একটা মিসক্যারেজই হল চিরকাল। সবাই বলত, ফের সাদি করা। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বোর্ডিংয়ে যত ছেলেপুলে আসত তাদেরই বানিয়ে ফেলতে নিজের বাচ্চা। তারপর একবার একটা বাচ্চাকে লোফালুফি করতে করতে ব্যালান্স হারিয়ে ফেলল। সে-বাচ্চা পড়ে গিয়ে পায়ে বেদম চোট পেল। তখন আবার বাবা নেই, আমি সবে কাজ দেখছি। কাস্টমার আমাকে এই মারে তো সেই মারে। শেষে ক্ষমা চেয়ে, বিল থেকে দুশো টাকা মাইনাস করে রেহাই। তারপর আই লস্ট মাই টেম্পার। ভুলে গেছি কী না কী বলেছিলাম ব্যোমবাহাদুরকে। অ্যাণ্ড মাই ফুট! হি সিম্পলি ওয়াকড আউট দ্য হোটেল অ্যাণ্ড নেভার কেম ব্যাক!
আমি সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করলাম, ডু ইউ মিস হিম?
বিক্রম আজকালকার পরিচিত স্টাইলে ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, নট রিয়েলি! ও একটা অন্য সময়ের লোক। খুব ভালো ছিল ও নিজের সময়ে। তবে এখন অচল। মোরওভার হি ওয়জ কোয়াইট ওল্ড। চোখেও ভালো দেখত না।
আমি হতাশ হয়ে বললাম, ওল্ড? ব্যোমবাহাদুর? তারপর নিজের মনে মনে বললাম, বাট আই মিস হিম!
বিকেলে ম্যালে গিয়ে ঘোড়ায় চড়াচ্ছিলাম মিশাকে। আর এক কোণে দাঁড়িয়ে পৃথাকে দেখাচ্ছিলাম আশপাশের লোকালয়। হর্সরাইড শেষ করে মিশা ছুটে এসে বায়না ধরল, বাবা কাল টয় ট্রেন চড়াবে? বললাম, নিশ্চয়ই। তার আগে আজকে এখানে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখো। ও বলল, সেটা কোথায়? আর আমিও দেখলাম, তাই তো! একটা বিরাট মেঘ এসে আকাশের একটা দিক অন্ধকার করে ফেলেছে। মেঘের থেকে ঠিকরে কিছুটা রোদের ছটা বেরুচ্ছে, কিন্তু হঠাৎ করে কীরকম সন্ধ্যে সন্ধ্যে ভাব চারদিকে।
আমার মনে পড়ল বাবা আর মা-র সঙ্গে ম্যালের সেই সন্ধ্যে। আমি মিশার চেয়ে আরেকটু বড়ো তখন। হঠাৎ বাবা বললেন, একটা কবিতা শোনাও তো সাহেব! আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম। বাবা বললেন, তা হলে আমার কবিতাটি শোনো। এ কবিতার নাম কালী দ্য মাদার’। লিখেছেন স্বামী বিবেকানন্দ।
বাবা যে কী বলছে গম্ভীর কণ্ঠে আমি তার কিছুই বুঝছি না। শুধু দেখছি মা কীরকম হাঁ হয়ে শুনছে। যেভাবে মা কখনো আমার কথা শোনে না। আমার খুব হিংসে হচ্ছে বাবার প্রতি। পৃথাকে বললাম, জানো তো, বাবা এখানে দাঁড়িয়ে কী কবিতা শুনিয়েছিলেন আমাদের? পৃথা বলল, না তো! আমি আর ভণিতা না বাড়িয়ে আবৃত্তি করতে লাগলাম
দ্যা স্টারস আর ব্লটেড আউট,
দ্য ক্লাউডস আর কাভারিং ক্লাউডস,
ইট ইজ ডার্কনেস ভাইব্রান্ট, সোন্যান্ট,
ইন দ্যা রোরিং, হোয়ার্লিং উইণ্ড…
আবৃত্তি শেষ হতে দেখি পৃথা মা-এর মতো সেই অবাক নেত্রে আমাকে দেখছে, হাঁ হয়ে দেখছে আমাকে মিশা। আর ওদের দুজনের মুখের উপর কমলা রঙের রোদ এসে পড়েছে। স্বামীজির কবিতা বলতে বলতে, মনে মনে বাবা সাজতে সাজতে খেয়ালই করিনি কখন যে মেঘ সরে আকাশ, পাহাড়, প্রকৃতি ফের ঝলমলিয়ে উঠেছে। একটা নেশাও চেপেছে মিশা আর পৃথাকে একটা নতুন কিছু দেখানোর। অথচ মনে কোথায় যেন একটা ব্যথা ব্যথা ভাব। বললাম, চলো, তোমাদের ঘুম দেখিয়ে আনি। সে দার্জিলিংয়ের থেকেও উঁচুতে। একটু ঘুমিয়ে থাকার জায়গা।
একটা ট্যাক্সি করে ঘুম স্টেশনে এসে পড়েছি। সেটা যে কীসের টানে তা এতক্ষণে খেয়ালে এল। আমার ভীষণ দরকার পড়েছে ব্যোমবাহাদুরকে। সে নাকি এই ঘুম স্টেশনেই বসে থাকে। ওকে পেলে ওর কোলে আমি মিশাকে ছুড়ে দেব। চাপিয়ে দেব পিঠে, বলব, যত পারো লোফালুফি করো। ও তোমার বাচ্চা।
কিন্তু মেঘে-জড়ানো ঘুম স্টেশন ঘুমিয়েই আছে। আর আমি পৃথা আর মিশাকে নিয়ে খুঁজছি। একটা স্মৃতির মানুষকে, যাকে প্রথম এবং শেষ দেখেছি চব্বিশ বছর আগে। কিন্তু জায়গা শুনশান, জনমানবহীন। আমি বউ, মেয়ে নিয়ে বসে পড়লাম স্টেশনের বেঞ্চিতে। মিশাকে বললাম, এখন আমরা ট্রেন দেখব। বলে পকেট হাতড়ে সিগারেট বার করে ধরালাম।
আর ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা ভারী, কেশো, বৃদ্ধ গলায়–বাবু, একটো সিকরেট হবে? মাথা ঘুরিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ নেপালি, জীর্ণ কোট আর কম্বলে জড়ানো, চোখে মোটা কাচের চশমা, কোনো মতে ডান তালুটা বার করে রেখেছে সিগারেটের আশায়। আমি একটা সিগারেট বার করে দিতে গিয়ে দেখলাম যে দুনিয়ার সমস্ত দুঃখ, করুণা নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার মেয়ের মুখের দিকে।
মোটা চশমার ওপারে ওর চোখের বিশেষ কিছুই আমি দেখতে পাচ্ছি না। শুধু মনে হচ্ছে ওর চাহনির মধ্যে একটা ব্যোমবাহাদুর ছেয়ে আছে। ওই ঘাড় হেলানো চাহনি আর মৃদু হাসি। আমি চট করে গোটা প্যাকেটটাই তুলে দিলাম ওর হাতে। বৃদ্ধ বলল, আগ, বাবু। আমি দেশলাই দিলাম। দিয়ে বললাম, তুমি ব্যোমবাহাদুর? বৃদ্ধ হ্যাঁ, ‘না’ কিছুই বলল না। আমি মিশাকে ডেকে ওর সামনে এনে বললাম, আমার মেয়ে।
বৃদ্ধ সেই সমানভাবে ঘাড় হেলিয়ে দেখে যাচ্ছে মিশাকে। কিন্তু স্পর্শ করছে না। এ কি সেই হাত থেকে বাচ্চা ফসকানোর ফল? কিন্তু ও মিশাকে কোলে না নিলে আমি জানব কী করে যে ও-ই ব্যোমবাহাদুর? যে বাচ্চা লোফে না সে কি ব্যোমবাহাদুর হয়? এদিকে বাল্যের স্মৃতিও বড়ো ঝাপসা, জটিল হয়ে উঠছে। ভাবছি ব্যোমবাহাদুরের হাইট কত ছিল? সে কি সত্যি সত্যি ঘাড় হেলিয়ে আমাকে দেখত? সে কি সিগারেট খেত? সে কি সিগারেট ধরাতে গিয়ে বার বার কাঠি নিভিয়ে ফেলত? সে কি নাম জিজ্ঞেস করলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত বৃদ্ধের মতো?
