চপলাকান্ত টের পেলেন দাদার ভিতর একটা আগ্নেয়গিরি সবে জ্বালামুখ ভেদ করে অগ্নিবর্ষণে মাতব মাতব করছে। তাই কথা না বাড়িয়ে পর পর কিছু জটিল চালে খেলাটাকে অন্য বাঁকে নিয়ে ফেললেন। তবে এতে সহসা উদবিগ্ন হওয়ার মানুষ বরদাকান্ত নন। বর্তমান খেলাটিতে তিনি ওঁর প্রিয়তম দাবাড় রাউল কাপাব্লাঙ্কার উদ্ভাবিত ভেরিয়শনের সুযোগ দিলেন। তিনিও আর কথার মধ্যে না গিয়ে খেলাটিকে কবজা করার মতো চাল ঠুকতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ নীরবে খেলা চলল দু-ভাইয়ে। চপলাকান্ত একটা বিশ্রী ভুল চাল দিয়ে ফেলেছিলেন, বরদাকান্ত খিঁচিয়ে উঠলেন, ওটা কী চাল হল চপলা। রাজাকে এক্সপোজ করে ওটা কোন ধ্যাষ্টামি। তা হলে তো আর ছটা চালে কাত হয়ে পড়বি।
চপলাকান্ত লজ্জায় জিভ কেটে দাদার ঘোড়া ফেরত করে নিজের নৌকা বাঁচালেন। তাতে রাজাকে পাহারা দেওয়া ক্যাসলটা রক্ষা পেল, খেলাটারও পরমায়ু বৃদ্ধি হল।
বরদাকান্ত নতুন এক শ্রেণির চাল ভাবতে ভাবতে বললেন, ন্যাপা বউ নিয়ে কী করবে?
-সে তো আমিও বুঝে পাচ্ছি না।
সুমিত্রার ওখানে তো ঘর হওয়ার নয়। ফ্ল্যাট তো কোথাও নিতেই হবে। তবে পাশের বাড়ি ওকে ছাড়তে হবে।
—সে তো একশো বার। তুমি কী বলো দাদা?
বরদাকান্ত একটা জটিল কিস্তির বন্দোবস্ত করতে করতে বললেন, দ্যাখ চপলা, ন্যাপার জন্য কিছু টাকা স্পেয়ার করতে আমায় আপত্তি নেই। হাজার হোক, আমার বাড়িতেই তো এতদিন বড়ো হয়েছে। কিন্তু এখন যেখানে গিয়ে ও দাঁড়িয়েছে সেই পরিস্থিতিতে ওর প্রতি কোনো সমর্থনই আমার নেই। টাকা যা দেওয়ার আমি দিয়ে দেব, বাট হি মাস্ট ভ্যানিস আউট অব সাইট। চোখের সামনে বায়োস্কোপের নায়িকা নিয়ে নেচে বেড়াবে, এ আমি সহ্য করব না।
এবার আস্তে আস্তে ফের মুখ খুললেন চপলাকান্ত—আমিও ঠিক এই কথাটাই ওকে বলেছি।
বরদাকান্তের দু-চোখের দুটো ভুরুই লাফিয়ে উঠল, ওকে বলেছি মানে। রাসকেলটার সঙ্গে তোর কথা হয়েছে?
—হ্যাঁ, জানতে গিয়েছিলাম কালকের ঘটনাটা কী ছিল।
–কী বলল আহাম্মকটা?
–বলল খুব ভুল করে ফেলেছে। দূরে কোথাও ফ্ল্যাট জোগাড় করতে পারেনি, তাই…
-বাঃ! বাঃ! অপূর্ব! একটা জলজ্যান্ত মেয়েমানুষ জোগাড় হয়ে গেল, কিন্তু একটা ঘর পেলেন না বাবু!
কিস্তির মুখে পড়ে চপলা ফের নীরব হয়ে গেলেন। ছকে ভাইয়ের করুণ দশা দেখে দাদা বললেন, তোরও নড়ার মতো ঘর দেখতে পাচ্ছিনে। রিজাইন কর আর ভিতরে গিয়ে বড়োঠাকুরকে বল দু-কাপ কফি বানাতে।
চপলাকান্ত একটা চাল দিলেন বটে, কিন্তু ফের এক কিস্তির মুখে পড়লেন অচিরে। বরদাকান্ত একটা সিগারেট ধরিয়ে আরামের সঙ্গে টান দিতে দিতে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। মাত হওয়া এড়ানো যাচ্ছে না দেখে ফরাস ছেড়ে উঠে চপলাকান্ত ভিতরে গেলেন কফির অর্ডার দিতে।
আর ঠিক তক্ষুণি ঘরে ঢুকল ন্যাপা। বরদাকান্ত তখনও চোখ বুজে থ্রি ক্যাসলসের দম নিচ্ছিলেন, পায়ে একটা হাতের ছোঁয়া পেয়ে চোখ খুলে ন্যাপাকে দেখলেন। আর দেখামাত্র মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বললেন, কী চাই?
ন্যাপা বলল, শুধু প্রণাম করতে এয়েচি আপনাকে।
নিষ্কম্প কণ্ঠে বরদাকান্ত জিজ্ঞেস করলেন, প্রণাম? কোন ফন্দিতে?
—বড়োমামা, আপনাকে প্রণাম করতে কি কারণ দরকার হয়?
—কারণ বলিনি। বলেছি ফন্দি।
ন্যাপা চুপ মেরে রইল। একটু পরে বরদাকান্ত বললেন, তুমি আসতে পারো।
ন্যাপা সেই আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বরদাকান্ত ওর দিকে একবারটি চেয়েই ভিতরে ভিতরে জ্বলে উঠলেন। সারাদেহে ছোকরার বিশ্রী কাপ্তেনির ছাপ। গিলে-করা ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি, সঙ্গে চুনোট করা ধুতি। পাঞ্জাবিতে সোনার বোতাম, তার তলা থেকে ফুটে বেরুচ্ছে দামি জালি গেঞ্জি। ছোকরার আঙুলেও খান তিনেক আংটি। চোখে ক্রুকসের নীল শেডের চশমা। ছেলেটা যে বেকার কে বলবে! এর উপর সংসারে একটা বউ চাপিয়েছে। বরদাকান্ত ভিতরে ভিতরে প্রবল অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। মুখে বললেন, এর পর কী করবে ঠিক করেছ কিছু?
ন্যাপা আমতা আমতা করে বললে, কালই ওই ফ্ল্যাট ছেড়ে উঠে যাচ্ছি আমরা। বরদাকান্ত শুধু একটা আওয়াজ করলেন, হুম! তারপর প্রশ্ন করলেন, কোথায় যাবে ভাবছ?
ন্যাপা কাঁপা কাঁপা গলায় বললে, এখনও ঠিক জানি না।
আর অমনি সারাদিনের চেপে চেপে রাখা রাগটা বারুদের মতো ফাটল—আহাম্মক! স্কাউন্ট্রেল। বিয়ে করে একটা মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। মামার মুখে আরও চুনকালি ঘষবে? কাল সকালে গিয়ে যেখানে পারো ঘর খুঁজে এসো। যা টাকা লাগে চপলাকে এসে জানিয়ে যেও। পরে একসময় নিয়ে যেও। আর এখন চোখের সামনে থেকে যাও।
তবু নড়ে না ন্যাপা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বরদাকান্ত মুখ তুলে বললেন, নৃপেন তোমাকে আমি চলে যেতে বলেছি। তুমি শুনতে পাওনি?
ন্যাপা হঠাৎ ফরাসে বসে পড়ে বড়োমামার পা চেপে ধরল, মামা, আমি আপনার টাকা চাই না। শুধু এই ভুলটা ক্ষমা করুন।
মাথায় রক্ত চড়ে গেল বরদাকান্তর, টাকা চায় না মানে কী? একটা ফুটো কড়ি আয় নেই আর মুখে এত বড়ো কথা! তিনি লাফ দিয়ে ফরাস থেকে নেমে নিজের এক পার্টি খড়ম তুলে দমাদ্দম কয়েক ঘা বসালেন ন্যাপার পিঠে–বেরোও আমার সামনে থেকে, আহাম্মক কোথাকার।
