কথাটা বলার সময় শূন্যে এক অদৃশ্য আঁতোয়ান সুককে জড়িয়ে ধরার ভান করল ডরোথি। অরুণের মনে হল কোনো বাস্তব দৃশ্য নয়, সিনেমারই যেন এক নাটকীয় দৃশ্য দেখছে ও।
ঠিক তখন একটা ট্রে-তে করে এক পাঁইট রাম, দুটো গেলাস আর এক বোতল সোডা এনে রাখল সেন্টার টেবিলে এক তরুণী কাজের মেয়ে। কত বয়স হবে মেয়েটার? — ছাব্বিশ-আটাশ? তা যখন দরজায় এত এত নক করল অরুণ সাড়া দিতে পারল না?
ভেতরে ভেতরে একটু বিরক্তিই হচ্ছিল অরুণের, যখন ডরোথি বলল, ও বিন্দিয়া, ও-ই আমার সব দেখাশোনা করে…
অরুণ রাগটা আর চাপতে পারল না—দেখাটা করে হয়তো, কিন্তু শোনাটা? আজ অতবার নক করে…
ওর কথার মধ্যে ডরোথি বলল, ও বোবা-কালা। ওর বর ওকে বিহার থেকে এনে ফেলে যাচ্ছিল রিপন স্ট্রিটের ব্রথেলে।
হঠাৎ ভয়ানক লজ্জিত বোধ করে আমরা আমতা করে অরুণ বলল, ত-ত-তো?
—ওর প্রথম খদ্দের জুটেছিল ডিকি। যে ওর কান্নাকাটি শুনে প্রথম রাতে ওকে তুলে এনে আমার এখানে ফেলে।
ওকে নিয়েই যে আলাপ চলছে তা বিন্দিয়ার বোঝার কথা নয়, ও দিব্যি একমনে মেমসাহেব আর সাহেবের ড্রিঙ্ক বানিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অরুণের অস্বস্তি কাটেনি, ও বিন্দিয়া প্রসঙ্গ থেকে কথা ঘোরাতে বলল, কিন্তু ডর, তুমি আজও এখনও বলোনি কেন টোনি চলে গেল।
এরপর এক অদ্ভুত নীরবতা ভর করল ঘরটাকে। সেই নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে একটু-আধটু ভাঙল গেলাস, বোতলের ঠোকাঠুকিতে যখন নতুন করে ড্রিঙ্ক সাজাল ডরোথি। এর মধ্যে বিন্দিয়া দু-প্লেট কাবাবও রেখে গেছে টেবিলে। সম্ভবত তৃতীয় পেগের শেষে কি চতুর্থ পেগের গোড়ায় ডরোথি জিজ্ঞেস করল, সেই যে তোমরা চলে গেলে তারপর আর শমির সঙ্গে দেখা হয়নি। কোথায় আছে ও? কেমন আছে?
শমি মানে শর্মিলা। অরুণের দিদি। খুব বন্ধু ছিল ডরোথির।
অরুণ বলল, ভালো আছে। জামশেদপুরে আছে। কর্তার চাকরি টাটায়।
—ও। ছেলেপুলে ক-টি?
—দুটি ছেলে। বড়োজন সবে ডাক্তারি পড়া শুরু করেছে, ছোটোজন সিনিয়র কেমব্রিজ দেবে বলে তৈরি হচ্ছে। ওরা পিঠোপিঠি।
—শমি সুখী তাহলে?
অরুণ এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে সোফাতে শরীরটা ভালোরকম এগিয়ে দিল। বলল, সুখ মাপার কি থার্মোমিটার আছে, ডর? যে জিভের তলায় কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রেখে বলে দেব কে কতটা সুখী কি অসুখী। তবে বাইরে থেকে দেখে যেটুকু যা বুঝি…ওয়েল শি সিমজ টু বি হ্যাপি।
ডরোথি ওর ড্রিঙ্কে একটা চুমুক দিয়ে বলল, গড ব্লেস! এটা শুনে বড্ড ভালো লাগল। ওর মতো মেয়ের জীবনে সুখী হওয়া উচিত। টোনির মতো পাগলের পাল্লায় পড়ে উচ্ছন্নে যাওয়া উচিত না।
একটা ফোর-ফর্টি ভোল্টের শক লাগল যেন অরুণের পায়ের পাতায়। ও তড়াক করে সোফায় সোজা হয়ে বসে আর্তনাদের সুরে বলল, হোয়-ট! হোেয়ট ডু ইউ মিন, ডর! দে ওয়্যার ইনভলভড? ওরা…ওরা জড়িয়ে পড়েছিল?
ডরোথি ফের সিগারেটে একটা টান দিতে দিতে নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। আরেকটু পর মুখে বলল, হ্যাঁ! ওই অবধি আমি সব সহ্য করেছি টোনির পাগলামি। কিন্তু শমির প্রেমপত্রগুলো যেদিন আবিষ্কার করলাম ওর অফিস ব্যাগে আর দুপুরবেলার ওই দৃশ্য চোখে পড়ল…না, না, ওই দৃশ্য আমি বর্ণনাও করব না… আমি মাছ কাটার বঁটি দেখিয়ে টোনিকে বলেছিলাম ঢের হয়েছে। এই মেয়েটার যদি কোনো ক্ষতি হতে দেখি তাহলে এই বঁটির কোপ পড়বে তোমার গলায়। তুমি দেখে নিয়ো। অরুণ আকাশ থেকে পড়েছে যেন। বলল, এসব ঘটল কখন? আমি তো বোজই আসতাম, আমারও চোখের আড়ালে?
ডরোথি বলল, আমি সব সময়েই একটা কথায় বিশ্বাস করেছি—সম্পর্ক, অ্যাফেয়ার, মাখামাখি, বদমায়েসি…এসব চোখে পড়ে। সত্যিকারের প্রেম, সত্যিকারের ভালোবাসা অদৃশ্য! ইনভিজিবল!
অরুণ জিজ্ঞেস করল, তার মানে…?
ডরোথি ঘাড় নাড়ল, টোনি সত্যিই শমির প্রেমে পড়েছিল, হয়তো জীবনে ওই প্রথম বার। আমি বুঝতে পারছিলাম। অতগুলো বছর ধরে ওকে দেখেছিলাম তো। যা খুশি করে বসতে পারত ও। হয়তো শমিকে নিয়ে পালিয়েই যেত। আমি চাইনি তোমার দিদিটার অত বড়ো ক্ষতি হয়ে যাক। যেকোনো মূল্যেই সেটা রদ করতে চেয়েছিলাম। বলতে পারো নিজের জীবন ও সুখের মূল্যেই।
অরুণের বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি, জিজ্ঞেস করল, কেন, তোমাকে ভালবাসেনি টোনি?
–কে জানে! ভালো হয়তো বেসেছে। নিজের একান্ত নারীদের যেমন ভালোবেসে থাকে পুরুষরা। সেক্স, প্যাশন কিছুরই অভাব ছিল না। তবে কীরকম যেন শরীর-শরীর, সারাক্ষণ…
—আর শমির ক্ষেত্রে?
—ওহ! ও তো শমিকে পুজো করত। শমির চিঠিগুলো পড়ে বুঝেছিলাম ওর সেটা খুব ভালো লেগেছিল। মেয়েটাও একটু একটু পাগল হচ্ছিল।
হঠাৎ অরুণের মনে পড়ল ওর হোস্টেলে চলে যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে শমি সন্ধ্যে নামলে ছাদে একা একা ঘুরত। একদিন কী করছিস এখানে? জিজ্ঞেস করায় অরুণকে মুখ ঝামটা দিয়েছিল, তোর কী দরকার! যা, নীচে যা! সেই সন্ধ্যের সঙ্গে কোথায় যেন একটা সম্পর্ক আঁতোয়ান সুকের শিস দিতে দিতে রাতে বাড়ি ফেরা, প্রভূত রাম গিলে চিৎকার করে গান, তারপর একসময় ডরোথির সঙ্গে গালিগালাজ, মারপিট…
অরুণ কী মনে করে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ডরোথি, থ্যাঙ্কস ফর এভরিথিং। আজ আমি টোনির ডায়েরিগুলো নিয়ে যাব। আমায় সত্যিই পড়তে হবে সব কিছু। তারপর ভাবব কী করা যায়।
