মারা গেছেন! তোমার পিসিমা?
তিনিও নেই। তিনি বাবার পূর্বেই গেছেন।
সুলোচনা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, দেখছি শুধু আমিই আছি। তোমার মা যখন মারা যান, তখন তুমি সাত বছরেরটি। তার পর পৈতে না হওয়া পর্যন্ত আমার কাছেই তুমি মানুষ হয়েছিলে। হাঁ, গুণী, তোর সইমাকে মনে পড়ে না রে?
গুণেন্দ্র তৎক্ষণাৎ মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলি মাথায় তুলিয়া লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিয়া উঠিল,—হাঁ, মা! তুমি?
সুলোচনা হাত বাড়াইয়া তাহার চিবুক স্পর্শ করিয়া নিজের অঙ্গুলির প্রান্তভাগ চুম্বন করিয়া বলিলেন, হাঁ বাবা, আমিই।
গুণেন্দ্র একখানা চৌকি কাছে টানিয়া আনিয়া বলিল, ব’সো মা।
সুলোচনা হাসিয়া বলিলেন, যখন তোর আশ্রয়ে এসেছি তখন বসব বৈ কি! হাঁ রে, তুই এখনো বিয়ে করিস নি?
এবার গুণেন্দ্র হাসিয়া বলিল, এখনো ত সময় হয়ে ওঠেনি।
সুলোচনা বলিলেন, এইবারে হবে। বাড়িতে কি কেউ মেয়েমানুষ নেই?
না।
রাঁধে কে?
একজন বামুন আছে।
সুলোচনা বলিলেন, বামুনের আর দরকার নেই, এখন থেকে আমি রাঁধব। আচ্ছা, সে কথা পরে হবে। আমার আরো দু-চারটে কথা আছে, সেইগুলো বলে নি। আমার স্বামীর এখানকার কাজ যাবার পরে আমরা বাড়ি চলে যাই। হাতে কিছু টাকা তখন ছিল, দেশেও কিছু জমিজমা ছিল। এতেই একরকম স্বচ্ছন্দে দিন কাটছিল। তার পর গত বৎসর তাঁকে যক্ষ্মারোগে ধরে। চিকিৎসার খরচে, হাওয়া বদলানর খরচে, একেবারে সর্বস্বান্ত করে তিনি মাস-খানেক পূর্বে স্বর্গে গেছেন। এখন অনাথাকে দুটি খেতে দিবি, এই প্রার্থনা।
তাঁর চোখ দিয়া টপটপ করিয়া জল ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। গুণেন্দ্রের চোখও ছলছল করিয়া উঠিল। সে কাতর হইয়া বলিল, মাকে মানুষে খেতে দেয় না, তুমি কি এই কথা মনে ভেবে এখানে এসেছ মা?
সুলোচনা আঁচল দিয়া চোখের জল মুছিয়া বলিলেন, না বাবা, সে কথা মনে ভেবে আসিনি। তা হলে এত দুঃখেও বোধ করি আসতাম না। তোকে ছোটটি দেখে গেছি, আজ বারো বছর পরে দুঃখের দিনে যখনি মনে পড়েছে, কোন শঙ্কা না করেই চলে এসেছি। তা ছাড়া আরো একটি কথা আছে। আমার মেয়ে হেমনলিনী—সে তোরই বোন—সে আবার আমার চেয়েও অনাথা। বিয়ের বয়েস হয়েছে, কিন্তু বিয়ে দিতে পারিনি। তার উপায় তোকেই করে দিতে হবে।
গুণেন্দ্র বলিল, তাকে কেন সঙ্গে আননি মা?
সুলোচনা বলিলেন, এনেছি। কিন্তু সে বড় অভিমানিনী। পাছে এ-সব কথা শুনতে পায়, তাই তাকে নীচে বসিয়ে রেখে আমি একলাই ওপরে এসেছি।
গুণেন্দ্র ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া চাকরটাকে চিৎকার করিয়া ডাক দিয়া বলিল, ও নন্দা, নীচে হেম বসে আছে, যা শিগগির ডেকে নিয়ে আয়।
সুলোচনা বলিলেন, তাকে উদ্ধার করতে তোর খরচ হবে—সে ঋণ আমি কোনদিন—
গুণেন্দ্র বাধা দিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, তবে মা, আমি বাইরে যাই, তোমার যা মুখে আসে বল। কিন্তু আমার মা মরে যাবার পর তুমি যা করেছিলে, সে-সব ঋণের কথা যদি আমি তুলি, তা হলে বলে রাখছি মা, তোমাকেও লজ্জায় বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তার চেয়ে কাজ নেই—তুমিও চুপ কর, আমিও করি।
সুলোচনা হাসিয়া বলিলেন, তাই ভাল। তবে মেয়েটা আসচে, তার সামনে আর বলা হবে না—তাই এইবেলা আর একটা কথা বলে রাখি। মনে করিস নি গুণী, আমি মায়ের চোখ নিয়ে এ কথা বলচি, কিন্তু হেম এলে দেখতে পাবি, তোর বোন রূপে গুণে কোন মানুষেরই অযোগ্যা হবে না। তার বাপ তাকে অনেক লেখাপড়া শিখিয়েচেন—শেষ কয়েক বছর এইটিই তাঁর একমাত্র কাজ ছিল। আমি বলচি, ও মেয়ে যার ঘরে যাবে, তার ঘরই আলো হবে। ও হেম, এই দিকে আয় মা, ইনি তোর গুণীদাদা—প্রণাম কর্।
হেম ঘরে ঢুকিয়া গুণেন্দ্রকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া নতমুখে দাঁড়াইল। তাহার পথশ্রমে ক্লান্ত মুখের দিকে চাহিয়া গুণেন্দ্র বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। সুলোচনা বোধ করি সে ভাব লক্ষ্য করিয়াই বলিলেন, গুণী, হেমকে তোর হাতেই দিতাম, যদি না দেশাচারে নিষেধ থাকত। আমি ম’লে হেমের দশ দিন অশৌচ হবে, তোকেও তিন দিন অশৌচ মানতে হবে, তাই ধর্মতঃ ও তোর বোন হয়।
গুণেন্দ্র এবার নিজেকে সংবরণ করিয়া লইয়া হেমকে উদ্দেশ করিয়া বলিল, হেম, শুনলে ত—আমাদের একই মা। মায়ের বাড়িতে আমিও যেমন, তুমিও তেমন। চল, তোমাদের খাবার যোগাড় করে দি।
৯৬৮
সুলোচনা হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, গুণী, তোর গলায় পৈতে দেখচি না যে!
গুণেন্দ্র খালিগায়ে ছিল, সে নিজের গলার দিকে একবার চাহিয়া দেখিয়া হাসিয়া বলিল, আমরা ব্রাহ্ম।
ব্রাহ্ম! ছি বাবা, কাজটা ভাল করনি। যাই হোক, প্রায়শ্চিত্ত করে পৈতে নাও।
গুণেন্দ্র বলিল, কাজটা যদিও ঠিক আমার করা নয়, বাবা নিজেই করে গেছেন, কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত করারও কোন আবশ্যক দেখিনে মা। ব্রাহ্ম-মতটা মন্দ বলে মনে করি না।
সুলোচনা মনে মনে যেন শক্ত আঘাত পাইয়া বসিয়া পড়িলেন। খানিক পরে নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, জানিনে কেন মানুষের এ-সব দুর্বুদ্ধি হয়।
গুণেন্দ্র হাসিয়া বলিল, দুর্বুদ্ধির কথা অন্য সময়েও হতে পারবে মা, এখন রান্নাঘরের দিকে চল।
.
তিন
পথিক যেমন গাছতলায় রাঁধিয়া খাইয়া হাঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া চলিয়া যায় এবং তখন যেমন চাহিয়া দেখে না হাঁড়িটা ভাঙ্গিল কি বাঁচিল, সংসারে শতকরা নব্বই জন লোক ঠিক এমনি করিয়াই সরস্বতীর কাছ হইতে কাজ আদায় করিয়া মা-লক্ষীর রাজপথের ধারে নির্মমভাবে তাঁহাকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়—একবার ফিরিয়াও দেখে না, তিনি ভাঙ্গিলেন কি বাঁচিলেন। গুণেন্দ্র সেইরূপ করে নাই। সে চিরদিন যেভাবে শ্রদ্ধা করিয়া সেবা করিয়া আসিয়াছিল, উকিল হইয়াও ঠিক তেমনি করিয়াই সরস্বতীর সেবা করিতে লাগিল। তাহার পড়িবার ঘর পুস্তকে ভরিয়া উঠিয়াছিল; সেই ঘরের মধ্যে হেমনলিনী ভারী আশ্রয় পাইল। গুণেন্দ্র গুছান প্রকৃতির লোক ছিল না বলিয়া তাহার যে পুস্তক একবার আলমারির বাহিরে আসিত, তাহা শীঘ্র আর ভিতরে প্রবেশ করিতে পাইত না। টেবিল, চেয়ার, অবশেষে নীচের গালিচার উপর পড়িয়া সুদীর্ঘকাল পরে যদি কোনগতিকে নন্দার সাহায্যে ভিতরে প্রবেশ করিত, আবশ্যক হইলে আর বাহির হইত না—এমনি মিশিয়া যাইত। একটা পুস্তকের তালিকাও তাহার ছিল বটে, কিন্তু সেটাকে কাজে লাগাইবার কিছুমাত্র উপায় ছিল না।
