মাধব ওদিকে বিছানা হইতে পরিহাস করিয়া কহিলেন, শখ মিটল বৌঠান?
অন্নপূর্ণা বলিলেন, আমি শখ করিনি ভাই, উনিই নিজ়ে মারের ভয়ে ওখানে গিয়ে ঢুকেছিলেন। তবে আমারও শিক্ষা হ’ল বটে। আর কি ঘেন্নার কথা ঠাকুরপো, আমাকে বলে কিনা তোমার কাছে শুতে লজ্জা করে।
তিনজনেই হাসিয়া উঠিল। অন্নপূর্ণা বলিলেন, আর না, যাই একটু ঘুমোই গে, বলিয়া চলিয়া গেলেন।
দিন-দশেক পরে বিন্দুর বাপ-মা তীর্থযাত্রার সঙ্কল্প করিয়া মেয়েকে একবার দেখিবার জন্য পালকি পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। বিন্দু বড় জায়ের অনুমতি লইয়া দু-তিন দিনের জন্য অমূল্যকে লুকাইয়া বাপের বাড়ি যাইবার জন্য উদ্যোগ করিতেছিল, এমন সময় বই বগলে করিয়া ইস্কুলের জন্য প্রস্তুত হইয়া অমূল্য আসিয়া উপস্থিত হইল।
অনতিপূর্বে সে বাহিরে পথের ধারে একটা পালকি দেখিয়া আসিয়াছিল; এখন হঠাৎ পায়ের দিকে নজর পড়িতেই সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়া বলিল, পায়ে আলতা পরেচ কেন ছোটমা?
অন্নপূর্ণা উপস্থিত ছিলেন, হাসিয়া ফেলিলেন।
বিন্দু বলিল, আজ পরতে হয়।
অমূল্য বার বার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, গায়ে এত গয়না কেন?
অন্নপূর্ণা মুখে আঁচল দিয়া বাহির হইয়া গেলেন।
বিন্দু হাসি চাপিয়া বলিল, কবে তোর বৌ এসে পরবে বলে আমাদের কাউকে কিছু পরতে নেই রে! যা, ইস্কুলে যা।
অমূল্য সে কথা কানে না তুলিয়া বলিল, দিদি অত হাসচে কেন? আমি ত আর ইস্কুলে যাব না—তুমি কোথায় যাবে
বিন্দু বলিল, তাই যদি যাই, তোর হুকুম নিতে হবে নাকি?
আমিও যাব, বলিয়া সে বই লইয়া বাহিরে চলিয়া গেল।
অন্নপূর্ণা ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন, ও যে অত সহজে ইস্কুলে যাবে, মনে করিনি। কিন্তু কি সেয়ানা দেখেছিস, বলে আলতা পরেচ কেন? গায়ে অত গয়না কেন? কিন্তু আমি বলি নিয়ে যা—নইলে ফিরে এসে তোকে দেখতে না পেলে ভারি হাঙ্গামা করবে।
বিন্দু বলিল, তুমি কি মনে করেচ দিদি, সে ইস্কুলে গেছে? কক্ষণো না। কোথায় লুকিয়ে বসে আছে, দেখো, ঠিক সময়ে হাজির হবে।
ঠিক তাহাই হইল। সে লুকাইয়া ছিল, বিন্দু অন্নর্পূণার পায়ের ধূলা লইয়া পালকিতে উঠিবার সময় কোথা হইতে বাহির হইয়া তাহার আঁচল ধরিয়া দাঁড়াইল। দুই জায়েই হাসিয়া উঠিলেন।
অন্নর্পূণা বলিলেন, যাবার সময় আর মারধর করিস্ নে, নিয়ে যা।
বিন্দু বলিল, তা যেন গেলুম দিদি, কিন্তু কোথাও যে আমার এক-পা নড়বার জো নাই, এ ত বড় বিপদের কথা!
অন্নর্পূণা বলিলেন, যেমন করেচিস, তেমনি হবে তো! অমূল্য, থাক না তুই দু’দিন আমার কাছে।
অমূল্য মাথা নাড়িয়া বলিল, না না, তোমার কাছে থাকতে পারব না। বলিয়া আগেই সে পালকিতে গিয়া বসিল।
.
ছয়
বিন্দু বাপের বাড়ি হইতে ফিরিয়া আসিবার দিন-দশেক পরে একদিন মধ্যাহ্নে অন্নর্পূণা তাহার ঘরে ঢুকিতে ঢুকিতে বলিলেন, ছোটবৌ?
ছোটবৌ একরাশ ময়লা কাপড়-জামার সুমুখে স্তব্ধ হইয়া বসিয়া ছিল।
অন্নর্পূণা বলিলেন, ধোপা এসেছে?
ছোটবৌ কথা কহিল না। অন্নর্পূণা এইবার তাহার মুখের ভাব লক্ষ্য করিয়া ভয় পাইলেন। উদ্বিগ্ন হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কি হয়েছে রে?
বিন্দু আঙুল দিয়া ছোট ছোট দুই টুকরো পোড়া সিগারেট দেখাইয়া দিয়া বলিল, অমূল্যর জামার পকেট থেকে বেরুল।
অন্নর্পূণা নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।
বিন্দু সহসা কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল, তোমার দুটি পায়ে পড়ি দিদি, ওদের বিদেয় কর, না হয়, আমাদের কোথায় পাঠিয়ে দাও।
অন্নর্পূণা জবাব দিতে পারিলেন না। আরও কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া থাকিয়া চলিয়া গেলেন।
অপরাহ্নে অমূল্য ইস্কুল হইতে ফিরিয়া খাবার খাইয়া খেলা করিতে গেল। বিন্দু একটি কথাও বলিল না। ভৈরব চাকর নালিশ করিতে আসিল, নরেনবাবু বিনা দোষে তাহাকে চপেটাঘাত করিয়াছে।
বিন্দু বিরক্ত হইয়া বলিল, দিদিকে বল গে।
আদালত হইতে ফিরিয়া আসিয়া মাধব কাপড় ছাড়িতে ছাড়িতে কি একটা ক্ষুদ্র পরিহাস করিতে গিয়া ধমক খাইয়া চুপ করিল। অদৃশ্যে যে কতবড় ঝড় ঘনাইয়া উঠিতেছে, বাড়ির মধ্যে তাহা কেবল অন্নপূর্ণাই টের পাইলেন। উৎকন্ঠায় সমস্ত সন্ধ্যাটা ছটফট করিয়া, এক সময়ে নির্জনে পাইয়া তিনি ছোটবৌয়ের হাতখানি ধরিয়া ফেলিয়া মিনতির স্বরে বলিলেন, হাজার হোক, সে তোরই ছেলে, এইবারটি মাপ কর।বরং আড়ালে ডেকে ধমক দে।
বিন্দু বলিল, আমার ছেলে নয়, সে কথা আমিও জানি, তুমিও জান। মিছামিছি কতকগুলো কথা বাড়িয়ে দরকার কি, দিদি?
অন্নপূর্ণা বলিলেন, আমি নয়, তুই তার মা—আমি তোকেই ত দিয়েচি!
যখন ছোট ছিল, খাইয়েছি পরিয়েছি। এখন বড় হয়েচে, তোমাদের ছেলে তোমরা নাও—আমাকে রেহাই দাও, বলিয়া বিন্দু চলিয়া গেল।
রাত্রে কাঁদ-কাঁদ মুখে অমূল্য অন্নপূর্ণার কাছে শুইতে আসিল।
অন্নপূর্ণা ব্যাপার বুঝিয়া বিরক্ত হইয়া বলিলেন, এখানে কেন? যা এখান থেকে—যা বলচি।
অমূল্য ফিরিয়া দেখিল, তাহার পিতা ঘুমাইতেছেন, সে কোন কথাটি না বলিয়া আস্তে আস্তে চলিয়া গেল।
সকালবেলা কদম রান্নাঘরে এঁটো বাসন তুলিতে আসিয়া দেখিল, বারান্দার এক কোণে কতগুলো কাঠ-ঘুঁটের উপর অমূল্য পড়িয়া ঘুমাইতেছে। সে ছুটিয়া গিয়া বিন্দুকে তুলিয়া আনিল। অন্নপূর্ণাও ঘুম ভাঙ্গিয়া বাহিরে আসিয়াছিলেন, কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন।
বিন্দু তীক্ষ্ণভাবে বলিল, রাত্রে বড়গিণ্ণী বুঝি তাড়িয়ে দিয়েছিলে? ও থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত হয়, না?
