কিন্তু আমার কী প্রগলভতা যে আমি তাঁর জীবনীর সংক্ষিপ্ততম ইতিহাসও লিখতে পারি। দেশ পত্রিকার প্রিয়তম লেখক শ্ৰীযুত ফাদার দ্যুতিয়েন যদি বাংলায় তার জীবনী লেখেন তবে গৌড়জন তাহা আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।
কুমারী ফ্রিডির কথা পুনরায় লিখব। কনটিনেন্ট সেরে, দেশে ফেরার পথে, লুৎসের্নে শ্রীমতীর বাড়িতে সপ্তাহাধিককাল ছিলুম সেই সুবাদে। উপস্থিত ফ্রিডি লিখেছেন, তিনি আমার (অ্যারইন্ডিয়া মারফত) টেলে পেলেন কাল রাত্রে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জুরিচের অ্যারপোর্টে ট্রাংককল করে জানালেন, আমি জুরিচে নেবেই যেন তাঁকে ট্রাংককল করি। বরাবর তিনি বাড়িতেই থাকবেন।
মনে হয় কত সোজা। কিন্তু যারা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে চান তাদের উপকারার্থে এ স্থলে কিঞ্চিৎ নিবেদন করে রাখি।
প্রথমত আপনাকে টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করতে হবে। সে বুথ আবার সন্ ব্রাহ্মণ। আপন দেশজ খাদ্য ভিন্ন অন্য খাদ্য খান না। অর্থাৎ তার বাসে আপনাকে ছাড়তে হবে এদেশের আপন সুইস মুদ্রা। অতএব গো-খোঁজা করুন, সে সাহারাতে, কোথায় সে পুণ্যভূমি যেখানে আপনার ডলার বা পৌন্ডের বদলে সুইস মুদ্রা দেবে। সবাই তো ইংরেজি বোঝে না। ভুল বুঝে অনেকেই। তারা কেউ বলে ওই তো হোথায়, কেউ বলবে তার জন্য তো শহরে যেতে হবে। শেষটায় পেলেন সেই কাউন্টার পুণ্যভূমি আমি অতি, অতি সংক্ষেপে সারছি। পেলেন সুইস বস্তু। তখন আবার ভুল করে যেন শুধু কাগজের নোট না নেন। কারণ ফোন বুথ কাগজাৰ্থশী নন; তিনি চান মুদ্রা। সেই মুদ্রা আবার ওই সাইজের হওয়া চাই। ঠ্যাঙস ঠ্যাঙস করে চলুন ফের ওই পুণ্যভূমিতে আরও বহুবিধ ফাড়াগৰ্দিশ আছে। বাদ দিচ্ছি।
আহ্! কী আনন্দ!! কী আনন্দ!!!
কে বলছেন? আমি ফ্রিডি।
আমি সৈয়দ।
ওই য যা! ট্রাঙ্ক লাইন কেটে গেল। পাবলিক বুথ থেকে ট্রাঙ্ক-কল করা এক গব্বন্তনা। আমি যে দুটি মুদ্রা মেশিনে ফেলে লুৎসের্ন পেয়েছিলুম, তার ম্যাদ ফুরিয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আর দুটো না ফেলার দরুন লাইন কাট অফফ। ফের ঢালো কড়ি।
অতি অবশ্য সত্য ফোন যন্ত্রের বাকসে সুইটজারল্যান্ডে প্রচলিত তিন-তিনটি ভাষা– ফরাসি, জর্মন এবং ইতালীয় লেখা আছে কোন গুহ্য সরল পদ্ধতিতে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে হয়। লেখা তো অনেক কিছুই থাকে। ধর্মগ্রন্থে তো অনেক কিছুই লেখা থাকে। সেগুলো পড়লেই বুঝি মোক্ষ লাভ হয়! জিমনাস্টিকের কেতাব পড়লেই বুঝি কিড় সিঙ-এর মতো মাসল গজায়। প্র্যাকটিস করতে হয়। এবং তার জন্য খেসারতিও দিতে হয়। উপযুক্ত শুরু বিনা যোগাভ্যাস করতে গিয়ে বিস্তর লোক পাগল হয়ে যায়। আমি ইতোমধ্যে প্রায় দেড় টাকার মতো খেসারতি দিয়ে হ্যালো হ্যালো করছি। আর, এ খেসারতির কোনও আন্তর্জাতিক মূল্য নেই। কারণ জনি, ফ্রান্স, ইংলন্ড প্রায় প্রত্যেক দেশই আপন আপন কায়দায় আপন আপন মেশিন চালায়। আর সেখানেই কি শেষ? তিন মাস পরে যখন ফের সুইটজারল্যান্ড আসব, তখন দেখব, বাবুরা এ ব্যবস্থা পালটে দিয়েছেন। নতুন কোনও এক আবিষ্কারের ফলে যন্ত্রটার ব্যবহার নাকি সরলতর করেছেন। সরলতর না কচু! তাই যারা এসব ব্যাপারে ওয়াফিহাল নন, যারা এই হয়তো পয়লা বারের মতো কন্টিনেন্ট যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমার সরলতম উপদেশ, বিশুরু এসব যন্ত্রপাতি ঘাটাতে যাবেন না। অবশ্য গুরু পাওয়া সর্বত্রই কঠিন; এখানে আরও কঠিন। যে যার ধান্দা নিয়ে উধ্বশ্বাসে হন্তদন্ত। কে আপনাকে নিয়ে যাবে সেই বুথ-গুহায়, শিখিয়ে দেবে সে গুহায় নিহিতং ধর্মস্য তত্ত্বং।
যাক। ফের পাওয়া গিয়েছে লাইন।
তুমি লুৎসের্নে কখন আসছ?
অপরাধ নিয়ো না। আমি উপস্থিত যাচ্ছি কলোন। তার পর হামবুর্গ ইত্যাদি। তার পর লন্ডন, নাটিংহাম। সেখান থেকে ফেরার পথে লুৎসের্ন। তুমি খেদিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তোমার বাড়িতে।
দ্যৎ। কিন্তু তদ্দিন এখানে যে বড্ড শীত জমে যাবে। গরম জামাকাপড় এনেছ তো? মা নিস্ (নেভার মাইন্ড- আসে-যায় না), আমার কাছে আছে।
তুমি এখনও ফ্রানসিস আসিসিরই শিষ্যা রয়ে গিয়েছ– কী করে কাতর জনকে মদৎ করতে হয়, সে-ই তোমার প্রধান চিন্তা। আমি কি তোমার স্কার্ট-ব্লাউজ পরে রাস্তায় বেরুব? সে কথা থাক। আমাকে অ্যারপোর্টে আরও তিন ঘণ্টাটাক বসে থাকতে হবে। চলে এসো না এখানে। আজ তো রোববার। তোমাকে অফিস-দফতর করতে হবে না।
রোববার। সেই তো বিপদ। বাড়ি থেকে যেতে হবে লুৎসের্ন স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেনে করে জুরিচ। পঁয়ত্রিশ মাইল। সেখান থেকে বাস-এ করে তোমার অ্যারপোর্টে। রোববার বলে আজ ঢের কম সার্ভিস। সব কটা উঠতি-নাবতিতে টায় টায়, কোথায় পাব কনেকশন-
আমি মনে মনে বললুম হুঁ : ফের সেই কনেকশন। ইলামবাজার রামপুরহাট।
ফ্রিডি বললে, আচ্ছা দেখি।
আমি বললাম, কতকাল তোমাকে দেখিনি।
ফ্রিডি যদি এখানে আসেই তবে তার বাস দাঁড়ায় কোথায়? আমি বসে আছি ট্রানজিট প্যাসেঞ্জারের খোয়াড়ে। এখানে তো ফ্রিডির প্রবেশ নিষেধ। অবশ্য সে দেশের রীতিমতো সম্মানিতা নাগরিকা (সংস্কৃত অর্থে নয়) সিটুজেন। কাজেই সে স্পেশাল পারমিট যোগাড় করতে পারবে। তবে সেটা যোগাড় করতে কতক্ষণ লাগবে, কে জানে? আম আনতে দুধ না ফুরিয়ে যায়। ততক্ষণে হয়তো আমার কলোনগামী প্লেনের সময় হয়ে যাবে।
