ইতোমধ্যে আমার চতুর্দিকে একটা মিনি মাসির মধ্যিখানের মিডি সাইজের ভিড় জমে গিয়েছে। ফ্রি এনটারটেনমেন্ট। আমার সোক্রোতেসপারা, কিংবা দ্রৌপদী যে রকম রাজসভায় আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন সেই ধরনের যুক্তিজাল বিস্তার এদের হৃদয়-মনে যেন মলয়বাতাসের হিল্লোল, দে দোল দোল খেলিয়ে গেল। এদের বেশিরভাগই আমার বেদনাটা সহানুভূতিসহ প্রকাশ করেছে। য়া য়া, উই উই, সি সি যাবতীয় ভাষায় আমাকে মিডিসমর্থন জানাচ্ছে। আমি ফের তেড়ে এগুতে যাচ্ছি এমন সময়
এমন সময় সর্বনাশ! একটি কুড়ি-একুশ বয়সের কিশোরী, আমি যাকে কেছে মুছে ইস্ত্রি মেরে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকাতে যাচ্ছি, কাউন্টারের পিছনের কুঠরি থেকে বেরিয়ে এসে তাকে বললে, আপনার টেলিফোন। তনুহূর্তেই সেই মহাপ্রভু তিলব্যাজ না করে, যেন সসেমিরে দে ছুট দে ছুট। লোকটা নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের আমারে ডাক দিল কে ভিতর পানে গানটি জানে। কিশোরী একগাল হেসে আমাকে শুধোলে, আপনার জন্য কী করতে পারি স্যার? দুত্তোর ছাই। আধ-ফোঁটা এই চিংড়ির সঙ্গে কী লড়াই দেব আমি! নাথিং বাট ইয়োর লড। বলে দুমদুম করে লাউঞ্জের সুদূরতম প্রান্তে আসন নিলুম।
.
সোফাটা মোলায়েম। সামনে ছোট্ট একটি টেবিল।
বেজার মুখে বসে আছি। এমন সময় দেখি একজন বয়স্ক ভদ্রলোক দু হাতে দুটি ভর্তি ওয়াইনগ্লাস নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঠিক যতখানি নিচু হয়ে অপরিচিত জনকে বাও করাটা কেতাদুরস্ত তাই করে শুধোলেন, ভুপেরমেতে, মসিয়ো–অর্থাৎ আপনার অনুমতি আছে স্যার? নিশ্চয়, নিশ্চয়। যদিও সোফাটির যা সাইজ তাতে পাঁচজন কিংকিং অনায়াসে বসতে পারে তবু ভদ্রতা দেখাবার জন্য ইঞ্চিটাক সরে বসলুম। ভদ্রলোক ফের কায়দামাফিক বললেন, ন ভূ পেঁরাজে পা, জ ভু প্রি। এর বাংলা অনুবাদ ঠিক কী যে হবে, অতখানি ফরাসি জানিনে, বাংলাও না। মোটামুটি না, না, ব্যস্ত হবেন না। ঠিক আছে, ঠিক আছে। উর্দুতে বরঞ্চ খানিকটে বলা যায় তকলুফ কিজিয়ে ওই ধরনের কিছু একটা। তকলু কথাটা তকলিফ (বাংলায় কিছুটা চালু) অর্থাৎ কষ্ট! মোদ্দা: আপনাকে কোনও কষ্ট দিতে চাইনে।
সেই দুটো গ্লাস টেবিলে রেখে একটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আরেকটা নিজে তুলে নিয়ে বললেন, আপনার স্বাস্থ্যের মঙ্গলের জন্য।
চেনাশোনা কিছুই নেই। খোদার খামোখা এ লোকটা একটা ড্রিংক দিচ্ছে কেন? তবে কি লোকটা কনফিডেন্স ট্রিকস্টার? আমাদের হাওড়া-শ্যালদাতে যার অভাব নেই। ভাবসাব (কনফিডেন্স) জমিয়ে বলবে দাদা, তা হলে আপনি টিকিট দুটো কিনে আনুন। এই নিন আমার লিলুয়ার পয়সা, আমি মালগুলো সামলাই।… টিকিট কেটে ফিরে এসে দেখলেন, ভো ভো। আপনার মালপত্র হাওয়া।
কিন্তু এ লোকটা আমার নেবে কী? সুকুমার রায় (?) একদা একটি ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন। বিরাট ভূড়িওলা জমিদার টিঙটিঙে দারওয়ানকে শাসিয়ে শুধোচ্ছেন, চোর ভাগা কিও? দারওয়ান বললে, মেরা এক হাতমে তলওয়ার দুসরেমে ঢাল। পকড়ে কৈসে? আমার এক হাতে তলওয়ার, অন্য হাতে ঢাল। ধরি কী করে?
আমার এক পাশে আমার মিত্রের দেওয়া এটাচি, অন্যদিকে অ্যার ইন্ডিয়ার দেওয়া ছোট্ট একটি বাকসো। দুটোই তো বগলদাবা করে বসে আছি। লোকটাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না, ও স্বৰ্গত পিসি সরকার (এ স্থলে বলে রাখা ভালো সরকার কখনও এহেন অপকর্ম করতেন না) যে আমার দুটি বাক্স সরিয়ে ফেলবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এ রকম রুচিসম্মত পোশাক-আশাক আমি একমাত্র ডিউক অব উইন্ডসরকে (উচ্চারণ নাকি উইনজার) পরতে দেখেছি– জীবনে একবার। ডিউকের জীবনে একবার নয়, আমার জীবনে একবার। সে বেশের বর্ণনা অন্যত্র দেব।
একখানা কার্ড এগিয়ে দিলেন। তাঁর নাম আঁদ্রে দ্যুপোঁ। তার পর একগাল হেসে শুধোলেন, যদি অপরাধ না নেন তবে একটি প্রশ্ন শুধোই, আপনি কি কটিঙে বিশেষজ্ঞ?
আমি থতমত খেয়ে শুধোলুম, কটিঙে? সে আবার কী?
ভুদ্রলোক আরও থতমত খেয়ে কিন্তু চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, সে কী মশাই! এই মাত্র আপনার অনবদ্য লেকচারটি শুনলুম, আপনি ক হাজার টাকা ঝেড়ে কলকাতা থেকে এ দেশে আসার রিটরন টিকিট কেটেছেন, এবং কনেকশন না পেয়ে তিন ঘণ্টাতে আপনার কী পরিমাণ অর্থক্ষয় হল তার পুরোধাক্কা, করেট টু দি লাস্ট সাতিম, ব্যালানস শিট। একেই তো বলে কটিঙ। আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করি। ওই নিয়ে নিত্যি নিত্যি আমার ভাবনা-চিন্তার অন্ত নেই। কিন্তু সে কথা থাক। আমি আপনার কাছে এসেছি একটি প্রস্তাব নিয়ে। আপনার যখন তিন ঘণ্টা বরবাদ যাচ্ছে তখন এক কাজ করুন না! মিনিট পনেরো পরে এখান থেকে একটা প্লেন যাচ্ছে জিনিভা : আমার সামান্য একটি বাড়ি আছে সেখানে। আপনার খুব একটা অসুবিধে হবে না। বেডরুম, বাথরুম, ডাইনিংরুম, স্টাডি সব নিজস্ব পাবেন। (আমি মনে মনে মনকে শুধালাম, একেই কি বলে সামান্য একটি বাড়ি?) আমাদের সঙ্গে আহারাদি, দুদণ্ড রসালাপ করে জিরিয়ে নেবেন। তার পর আপনাকে আপনার মোকাম, কলোনগামী প্লেনে তুলে দেব। তার পর একটু ইতিউতি করে বললেন, কিছু মনে করবেন না। আমি এ প্রস্তাবটা নিজের স্বার্থেই পাড়ছি। আমার একটি ছেলে আর দুটি মেয়ে। ষোল, চোদ্দ, দশ। আপনার সঙ্গে আলাপচারী করে তারা সত্যই উপকৃত হবে। এদেশে চট করে একজন ইন্ডিয়ান পাওয়া যায় না। পেলেও তিনি ফরাসি জানেন না। আর আমার বিবি বাসা রাঁধতে পারেন—
