আমি বললাম, বিশেষ কারণটা কি?
চুমুর দীর্ঘতম রেকর্ডটা ভাঙতে চাই। গিনিস বুকে নামটা যেন ওঠে।
আমি বেনের মুখে দিকে তাকিয়ে রইলাম। বলে কি এই ছেলে?
আমি বললাম, টার্ম ফাইনালের পরে চেষ্টা করলে কেমন হয়? তখন নিশ্চিন্তু মনে চালিয়ে যেতে পারবে। টার্ম ফাইন্যাল পেপার জমা না দিলে তো এই কোর্সটায় কোনো নম্বর পাবে না।
বেন বিরস মুখে চলে গেল। দু’দিন পর পেপার জমা দিয়ে দিল। আমি ভাবলাম মাথা থেকে ভূত নেমে গেছে। কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। যন্ত্রণা বাড়িয়ে লাভ নেই।
ভূত কিন্তু নামল না। আমেরিকানদের ঘাড়ের ভূত খুব সহজে নামে না। ভূতগুলিও আমেরিকানদের মতোই পাগলা। কাজেই এক বৃহস্পতিবার রাতে অর্থাৎ উইক-এন্ড শুরু হবার আগে আগে বেন রেকর্ড ভাঙার জন্য নেমে পড়ল। সঙ্গে স্বাস্থ্যবর্তী এক তরুণী–যার পোশাক খুবই উগ্র ধরনের। এই পোশাক না থাকলেই বরং উগ্ৰাতটা কম মনে হত।
চুমুর ব্যাপারটা হচ্ছে মেমোরিয়াল ইউনিয়নের তিন তলায়। যথারীতি পোস্টার পড়েছে ম্যারাথন চুমু। দীর্ঘতম চুম্বনের বিশ্ব রেকর্ড স্থাপিত হতে যাচ্ছে.. ইত্যাদি ইত্যাদি।
দেখলাম ব্যাপারটায় আয়োজনও প্রচুর। দুজন আছে রেকর্ড-কিপার, স্টপ ওয়াচ হাতে সময়ের হিসাব রাখছে। একজন আছেন নোটারি পাবলিক। যিনি সার্টিফিকেট দেবেন যে, দীর্ঘতম চুম্বনে কোনো কারচুপি হয়নি। এই নোটারি পাবলিক সারাক্ষণই থাকবেন কিনা বুঝতে পারলাম না। এদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এরকম একটা ফালতু জিনিস নিয়ে কী করে সময় নষ্ট করে বুঝতে পারলাম না।
বেন এবং মেয়েটিকে নাইলনের দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কেউ সে বেষ্টনীর ভেতর যেতে পারছে না। বাজনা বাজছে। সবই নাচের বাজনা ওয়াল্টজ। বাজনার তালে তালে এরা দুজন নাচছে।
আমি মিনিট দশেক এই দৃশ্য দেখে চলে এলাম। এই জাতীয় পাগলামির কোনো মানে হয়?
পরদিন ভোরে আবার গেলাম। ম্যারাথন চুমু তখনো চলছে। তবে পাত্র-পাত্রী দুজন এখন সোফায় শুয়ে আছে। ঠোঁটে ঠোঁট লাগানো। বাজনা বাজছে। সেই বাজনার তালে তালে সমবেত দর্শকদের অনেকেই সঙ্গী অথবা সঙ্গিনী নিয়ে খানিকক্ষণ নাচছে। রীতিমতো উৎসব।
আমি আমার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটিকে বললাম, ক্ষিধে পেলে ওরা করবে কী? ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে খাওয়া-দাওয়া তো করা যাবে না।
তরল খাবার খাবে স্ট্র দিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই স্যুপ খেয়েছে।
আমি ইতস্তত করে বললাম বাথরুমে যাবার প্রয়োজন যখন হয় তখন কী করবে?
জানি না। বাথরুমের জন্যে কিছু সময় বোধ হয় অফ পাওয়া যায়। কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে। ওদের জিজ্ঞেস কর।
আমার আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করল না। ততক্ষণে ফ্লোরে উদ্দাম নৃত্য শুরু হয়ে গেছে। এক জোড়া বুড়োবুড়ি উদ্দাম নৃত্যে মেতেছে। ভয়াবহ লাফ-ঝাপ। তালে তালে হাত তালি পড়ছে। জমজমাট অবস্থা।
জানতে পারলাম এই বুড়োবুড়ি হচ্ছে বেন ওয়ালির বাবা এবং মা। তারা সুদূর মিনেসোটা থেকে ছুটে এসেছেন ছেলেকে উৎসাহ দেবার জন্যে। ছেলের গর্বে তাদের চোখমুখ উজ্জ্বল।
বেন ওয়ালি দীর্ঘতম চুম্বনের বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে পারেনি। তবে সে খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
স্বপ্নলোকের চাবি
পারুল আপা নেই, কাজেই স্কুলের দুঃসহ দুঘণ্টা কোনোক্রমে পার করে দেবার পরের সময়টা মহানন্দের। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা। সাজানো-গোছানো সুন্দর বাড়ি দেখলেই হট করে ঢুকে পড়ি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তৎক্ষণাৎ বের করে দেয়া হয়। এর মধ্যে একটি বাড়িতে ভিন্ন ব্যাপার হল। এই বাড়িটিও মীরাবাজারেই। আমাদের বাসার কাছে। বিশাল কম্পাউন্ড, গাছগাছালিতে ছাওয়া ধবধবে সাদা রঙের বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। এই বাড়িতে কে থাকেন তাও আমরা জানি, সিলেট এম. সি. কলেজের অধ্যাপক। আমাদের কাছে তার পরিচয় হচ্ছে প্রফেসর সাব, অতি অতি অতি জ্ঞানী লোক-যাঁকে দূর থেকে দেখলেই পুণ্য হয়। তবে এই প্রফেসর সাহেব নাকি পাকিস্তানে থাকবেন না, দেশ ছেড়ে কলকাতা চলে যাবেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নাকি চাকরিও হয়েছে। তিনি চেষ্টা করছেন বাড়ি বিক্রির।
এক দুপুরে গেট খোলা পেয়ে হুট করে সেই বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লাম। গাছপালার কী শান্ত-শান্ত ভাব। মনে হয় ভুল করে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এক বাড়ি, বাগানে ঢুকে পড়েছি। আনন্দে মন ভরে গেল। একা একা অনেকক্ষণ হাঁটলাম। হঠাৎ দেখি কোনার দিকের একটি গাছের নিচে পাটি পেতে একটি মেয়ে উপড় হয়ে শুয়ে আছে। তার হাতে একটা বই। সে বই পড়ছে না—তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি আমার জীবনে এত সুন্দর মেয়ে আর দেখিনি। মনে হল তার শরীর সাদা মোমের তৈরি। পিঠভরতি ঘন কালো চুল। যোলো-সতেরো বছর বয়স। দৈত্যের হাতে বন্দিনী রাজকন্যারাও এত সুন্দর হয় না। মেয়েটি হাত-ইশারায় ডাকল। প্রথমে ভাবলাম দৌড়ে পালিয়ে যাই। পরমুহূর্তেই সেই ভাবনা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে গেলাম।
কী নাম তোমার খোকা?
কাজল।
কী সুন্দর নাম! কাজল। তোমাকে মাখতে হয় চোখে। তা-ই না?
কিছু না-বুঝেই আমি মাথা নাড়লাম।
অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি, তুমি একা একা হাঁটছ। কী ব্যাপার?
আমি চুপ করে রইলাম।
কীজন্যে এসেছ এ-বাড়িতে?
বেড়াতে।
ও আচ্ছা-বেড়াতে? তুমি তা হলে অতিথি। অতিথি নারায়ণ। তা-ই না?
