দূর গঙ্গায় বেজে ওঠে জাহাজের ভোঁ। মাথার ওপরে উড়োজাহাজের বিষণ্ণ শব্দ। অন্যমনে সাড়া দিই–’যাই।’
রাতে হঠাৎ চমকে ঘুম ভেঙে উঠে বসলুম, ‘মা, ও মা, তুমি আমায় ডাকলে।’ মা জেগে উঠে অবাক গলায় বলল , ‘না তো।’ বিড়বিড় করে বীজমন্ত্র পড়ে বলল , ‘ঘুমো।’ চৌকির শব্দ করে পাশ ফিরল মা, বলল , ‘বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, না রে!’ আমি নিঃশব্দে হাসলুম, ‘না তো!’
তারপর অনেকক্ষণ জেগে থাকি। মা’রও ঘুম আসে না। বলে, ‘সারাদিন কী যে করিস। ঘুরে ঘুরে আত্মীয়স্বজনদের একটু খোঁজখবরও তো নিতে হয়! আমি মরলে আর কেউ তোকে চিনবেই না। দেখলেও ভাববে কে না কে!’ মা’র দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হয়, ‘বুঝতেও পারি না, কে বেঁচে আছে, আর কে মরে গেছে। একটু খোঁজ নিস।’ জবাব দিই, ‘কে কোথায় থাকে মা!’ মা আস্তে-আস্তে বলে যায়, ‘কেন, মাঝেরহাটে তোর রাঙা কাকিমা, কাঁচড়াপাড়ায় সোনা ভাই…’ শুনতে-শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি।
মনে পড়ে, ছুটির এক দুপুরে বসেছিলুম ছোট একটা চায়ের দোকানে। চারটে টেবিল, প্রতি টেবিলকে ঘিরে চারটে চেয়ার, আর সবুজ পরদাওয়ালা দুটো কেবিন খালি পড়ে আছে। মাছি ওড়ার শব্দ শোনা যায়। দেয়ালে ভয়ঙ্কর সব যুবতীদের ছবিওলা ক্যালেন্ডার! দুপুরের ঝিমঝিম ভাবের মধ্যে অনেকক্ষণ একা বসেছিলুম। এ সময়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন সাদা চাদর গায়ে বুড়ো এক ভ ভদ্রলোক। চোখে চোখ পড়তেই ভীষণ চমকে উঠেছিলুম। বড় দয়ালু ওঁর চোখ। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলুম উনি মনে-মনে বললেন, ‘এই যে, কী খবর?’ তটস্থ আমি তৎক্ষণাৎ মনে-মনে উত্তর দিলুম ‘এই যে, সব ভালো তো?’ পরমুহূর্তেই উনি চোখ সরিয়ে নিলেন, গিয়ে বসলেন কোণের একটা চেয়ারে, পত্রিকা খুলে মুখ আড়াল করে নিলেন। আমি টেবিলের কাছে আমার অন্ধকার ছায়ার দিকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলুম। সেই ভাবটুকু তারপর কেটে গিয়েছিল, যখন সদ্য ঘুম–থেকে–ওঠা বাচ্চা বয় খালি গায়ে হাই তুলতে-তুলতে এসে চা দিয়ে গেল।
একদিন স্কুলে এল টেলিফোন! ‘শিগগির বাড়িতে আসুন।’ শরীর হিম হয়ে গেল। রিসিভার নামিয়ে রাখলুম আস্তে-আস্তে। দীর্ঘদিন ধরে যেন এ রকম একটি আহ্বানেরই ভয় ছিল আমার। আমার সমস্ত শরীর জুড়ে ‘মা’ এই শব্দ বেজে উঠেছিল। অদ্ভুত ঘোররের মধ্যে আমি এসে দেখলুম ঘরে চার-পাঁচজন পাড়া পড়শি, বালিশে মার নিবন্ত মুখ, আধখোলা চোখ ভয়ঙ্কর লাল, ঠোঁট ফ্যাকাসে। ডাক্তার ব্লাডপ্রেসারের পারদের দিকে চেয়ে আছে। বলল –’তাড়াতাড়ি করুন।’ বুঝতে না পেরে আমি চারদিকে চেয়ে বললুম, ‘কী?’ আবার কে যেন বলল , ‘তাড়াতাড়ি করুন।’ আমি বুঝতে পারলুম না, বাচ্চা ছেলের মতো সামনের শূন্যতার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলুম, ‘কী?’ বাড়িওয়ালার বউ আমাকে একদিন টেনে নিয়ে বলল , ‘যা তারকেশ্বরে মানত করে আয়!’
পরদিন। আমি তারকেশ্বর থেকে ফিরছিলুম। ভিড়ের ট্রেন! আমি বসবার জায়গা পাইনি। ট্রেন থামছে। প্রতিবার আমি মফসসলের লোকের মতো নিজেকেই জিগ্যেস করছি, ‘এটা কি হাওড়া? এই কি হাওড়া?’ অনেক ঘাড়, অনেক মাথার জঙ্গল সামনে, আমি পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে বাইরেটা দেখবার চেষ্টা করছিলুম। হঠাৎ এক ঝলক তেতো জলে ভেসে গেল মুখ, কষ বেয়ে জামা–কাপড় ভাসিয়ে দিল, ‘এটা কি হাওড়া’ আবার এই প্রশ্ন করতে গিয়ে দেখি চোখের সামনে নড়ছে কালো–চাদর, ঝড়ের মতো ছুটছে ট্রেন, অথচ যেন বাতাস লাগছে না। পড়ে যাচ্ছি, কয়েকটা হাত আমাকে ধরল। টের পেলুম, আস্তে-আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে পৃথিবীর সব শব্দ যেন আমি আবার মায়ের কোলের সেই শিশু রম–এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়ব। তবু সেই আধ–চেতনার মধ্যে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, ‘আপনারা সবাই শুনুন। আমি রমেন। আমার মায়ের বড় অসুখ। দুদিন আমি তাই কিছুই খাইনি।’ আমি বলতে চাইছিলুম, ‘আমি দীর্ঘকাল ধরে আপনাদের সকলের কাছে অপরাধী।’ আমার প্রাণপণে বলবার ইচ্ছে হয়েছিল, ‘আমি আজ আপনাদের ইচ্ছাশক্তিগুলি ভিক্ষা চাই। আপনাদের আশীর্বাদগুলি ভিক্ষা চাই।’ ট্রেনের মেঝেয় ঘোর অন্ধকারের ভিতরে দুটো সাদা পা। যেন চেনা! মুখ দেখা যায় না, তবু বুঝলুম সেই বুড়ো ভ ভদ্রলোক। আজও তার চোখ কথা বলছিল। ‘আমি তোমার জন্যই এসেছি রমেন। তুমি ভাগ্যবান। চলে এসো।’ আমি কাঁদছিলুম, ‘আমার মা’র বড় অসুখ। আমার বাবা বিদেশে পড়ে আছে।’ সহজে উত্তর দিল না তার চোখ, বলল , ‘জীবন ও মৃত্যুই কিছু লোকের দেখাশোনা করে; কিছু লোককে দেখে ভাগ্য; কিছু লোককে ধর্ম এসে নিয়ে যায়।’
ভালো হয়ে গেলে মা একদিন চিহ্নিত মুখে বলল , ‘চোখে ভালো দেখি না। কিন্তু মনে হচ্ছে তুই বড় রোগা হয়ে গেছিস!’ হাসলুম, ‘কই!’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মা বলল , আর কর্তার সার্টিফিকেটটা? সেটা পেলি না!’
৯.
তখন বিকেল। পাকিস্তানি হাই কমিশনারের অফিস থেকে বেরিয়ে গড়িয়াহাটার দিকে যাব, এমন সময় হঠাৎ দেখি–তুমি! শিকড়সুদ্ধ আমার ডালপালা নাড়া খেয়ে গেল।
বলতে কি, স্কুটারের পিছনের সিটে তোমাকে মানায় না। এত খোলামেলা আর এত ভিড়ের মধ্যে।
দেখলুম সবুজ রুমালে ঘিরেছ মুখ, আজ নীল শাড়ি পরেছিলে, স্কুটারের পিছনের সিটে তুমি জড়সড়ো, টালমাটাল। চওড়া পুরুষের কাঁধ আঁকড়ে ধরে হাসছিলে ভয় পাওয়া হাসি-’পড়ে গেলু–উ–উম!’
