অনিমেষ আমার দিকে চেয়ে চকমকে চোখে হাসল, মীরা এসেছিল দু-দিন পর। দরজা খুললুম না। বাইরে থেকেই বলল , ‘অফিসে তোমাকে ফোন করে পাইনি। তুমি এত খারাপ বাংলা লেখো, জানতুম না। এ চিঠি তুমি লিখেছ?’ শান্তভাবে বললুম, হ্যাঁ। জিগ্যেস করল, কেন? বললুম—
‘কী বললি!’
ধপ করে বালিশ মাথা থেকে ফেলে অনিমেষ মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়ল, ‘দূর শালা! সে অনেক কথা। ছেড়ে দে। তোর কাছে যে ক’টা সিগারেট আছে দিয়ে যা।’
আমার সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বালিশের পাশে রাখল, মীরার কথা এখন আর ভাবছিই। ভাবছি ওই চারটে লোকের কথা। কী আত্মবিশ্বাস! আমাকে দিয়ে ওই চিঠি লিখিয়ে নিল, আর ঘরে ঢুকে মেরে গেল আমাকে, বুঝিয়ে দিয়ে গেল আমার জোর কতখানি। আমি শালা হারামির বাচ্ছা এতদিন ভ ভদ্রলোক…’
রাতে বেড়াল খুঁজতে গিয়ে মা পড়ে গিয়েছিল উনুনের ধারে। হাঁটুতে চোট। একটা আঙুল সামান্য পুড়েছে। ডাক্তার বলে গেল–হাই প্রেসার, সাবধানে রাখবেন। খুব বিশ্রাম। আর নুন। বারণ।
পায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললুম, ‘কেন মা, এত কাজকর্ম করতে যাও?’
মা মিনমিন করে বলল , ‘বউ আন।’
স্বপ্ন দেখলুম।
আমার চোখের সামনে দেয়ালের পর দেয়ালের সারি। আর সেই অসংখ্য দেয়ালের গায়ে কে যেন অবিশ্রাম চক দিয়ে লিখে যাচ্ছে–গোপাল আর নাই। গোপাল আর নাই। গোপাল আর নাই। কোথাও লেখা–’হায় গোপাল!’ কোথাও বা–’গোপাল আর নাই কেন?’ আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিয়ের ‘স্বাগতম’ লিখবার লাল শালুতে উড়ছে কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপন, বসন্ত টিকা নিন। বিপদ–টিকা নিন। ভয়–টিকা নিন।
৭.
দেখলুম স্টিয়ারিং হুইলে তোমার দুই অসহায় হাত, অহঙ্কারে একটু উঁচু তোমার মাথা। কপালের ওপর নেমে এসে দুলছে চুলের একটা ঘুরলি। দাঁতে ঠোঁটে চেপে হাসছ। তোমার কপালে ঘাম। তোমার মুখ লাল। পাশে খাকি শার্ট পরা নিকেলের চশমা চোখে বুড়ো সেই ড্রাইভার। একটু ডান দিকে হেলে সে তার একখানি সাবধানী হাত বাড়িয়ে রেখেছে স্টিয়ারিং হুইলের ওপর তোমার হাতের দিকে।
বড় ভালোবাসার তোমাকে আগলে নিয়ে গেল তোমাদের পুরোনো মভ রঙের গাড়ি। মোড়ের বেঁটে মোটা লাল ডাকবাক্সটা তার কালো টুপি পরা মাথা নেড়ে নিঃশব্দে চিৎকার করে বলল , ‘হ্যাপি মোটরিং মাদমোয়াজেল, হ্যাপি মোটরিং।’ বাড়ির চূড়া থেকে শ্বেতপাথরের পরিটা পুব থেকে পশ্চিম মাথা ঘুরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত একবার দেখে নিল কোনও বিপদ আছে কি না। যত দূরেই যাও, সে তোমাকে ঠিক চোখে চোখ রাখে।
যদিও একটু টাল খাচ্ছিল তোমার গাড়ি, তবু বলি, তুমি অনেকটা শিখে গেছ। আর কদিন পরেই তুমি তোমার গাড়ি একা চালিয়ে নিয়ে যাবে।
চোখ বুজে দেখলুম, দূরে রাসবিহারীর জংশনে ট্রাফিকের লাল আলোয় থেমে আছ তুমি।
থেমেছিলে? নাকি অপেক্ষা করেছিলে? দেখো একদিন আমি ঠিক রাস্তার মাঝখানে দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দাঁড়াব তোমাদের ওই মভ রঙের মোটর গাড়িটার মুখোমুখি। চেঁচিয়ে হয়তো বলব, ‘বাঁচাও’, কিংবা হয়তো বলব, ‘মারো আমাকে।’ কুয়াশায় বা ঝড়ে বা বৃষ্টিপাতে কোনওদিন সেই সুসময় দেখা দিলে, তখন আর ওই দুই শব্দের আলাদা মানে নেই।
৮.
ফেব্রুয়ারি। কলকাতায় এবারের শীত শেষ হয়ে এল। বাতাসে চোরা গরম। রাস্তায় খুব ধুলো উড়ছে। চারদিকেই রাগী ও বিরক্ত মানুষের মুখ।
বিদায়ী শীতের সম্মানে একদিন স্কুল কামাই করা গেল। ‘ম্যাটিনি’তে বেলেল্লা একটা হিন্দি ছবি দেখলুম। আমি আর তুলসী। বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি। লবিতে দাঁড়িয়ে তুলসী হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির জল ধরছিল। বললুম, ‘তোর জমবে না কিছুই। তোর হাতে জল দাঁড়ায় না।’ অসময়ে বৃষ্টি, তবু রাস্তায় জল জমে গেল। ট্রাম বাস বন্ধ। হাতে স্যান্ডেল, কাপড় গুটিয়ে দুজনে ছপ করে জলে নামলুম। হঠাৎ অকারণে খুশি গলায় তুলসী বলল , ‘পৃথিবী জায়গাটা মন্দ নয়, কী বলিস!’
পাড়ার চেনা ডাক্তার ধরে একদিন টি এ বি সি দিয়ে দিল। দু-দিন জ্বরে পড়ে রইলুম। মা কাছাকাছি ঘুরঘুর করে গেল বারবার। এমন ভাব কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস, হতভাগা ছেলে, এবার পেয়েছি তোকে। তৃতীয় দিনে গা–ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলুম। সকালেই দেখি, মা বাক্স। খুলে কবেকার পুরোনো লালপেড়ে গরদের শাড়িটা বের করে পরেছে। ‘কী ব্যাপার?’ মা অপ্রস্তুত মুখে একটু হাসল ‘কাল রাতে একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখেছি।’ মুখ ফিরিয়ে বলল , ‘তোর জ্বরটাও সারল। কালীঘাটে একটু পুজো দিয়ে আসি।’
আমি আর গিরিজা হালদার স্কুল থেকে একসঙ্গে বেরোলুম একদিন। হালদার গলা নামিয়ে বলল , ‘আমার জীবনে একটা ট্র্যাজেডি আছে মশাই। আপনাকে বলব একদিন।’ পরমুহূর্তেই রুমাল বের করে বলল , ‘গরম পড়ে গেল।’ রেস্টুরেন্টে বসলুম দুজনে, গিরিজা হালদার কাটলেট খেল না, আঙুল দেখিয়ে বলল , ‘দুটো টোস্ট। আমার মশাই নিরামিষ। দেখেন না হিন্দুর বিধবারা কতদিন বাঁচে।’ হালদার প্রাণায়াম–টানায়াম করে। দম বন্ধ করে এক গ্লাস জল খেয়ে মুখ মুছে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল , ‘লক্ষ করেছেন কলকাতায় অনেকদিন কিছুই ঘটছে না! না লাঠিচার্জ, না গোলাগুলি, না কারফিউ। তেমন বড়সড় একটা মিছিলও দেখছি না বহুকাল। লোকগুলো মরে গেছে, কি বলেন!’ অন্যমনস্কভাবে বললুম, ‘হু।’ হালদার টেবিলে আঙুল বাজিয়ে। গুন গুন করল, ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে…’
