কে না পায়?
আপনার ভয়ডর কিছু কম বলেই আমার ধারণা।
না, না, কী যে, বলেন। আমি তো ভীতুই।
কথাটা প্রশংসাসূচকভাবে বলিনি। আমি মিন করেছি, আপনি একজন আহাম্মক। আহাম্মকদের অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা থাকে না। সময়মতো, পরিস্থিতি বুঝে ভয় পাওয়াটাও বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণের লক্ষণ। শুধু বুক ফুলিয়ে যেখানে-সেখানে হাজির হয়ে যাওয়া কাজের কথা নয়।
কী মুশকিল! আপনিই তো আসতে বলেছেন, এলাম বলে উলটে রাগারাগিও করছেন। তাহলে কি আমি চলে যাব?
না। এসে যখন পড়েছেন তখন বসুন। তবে সাবধান করে দিচ্ছি, ভবিষ্যতে কখনো কোনো অচেনা লোকের এস এম এস পেয়ে বোকার মতো কোনো অজানা ফাঁদে পা দেবেন না! বুঝেছেন? আমি উগ্রবাদী ভাড়াটে খুনি হলে কী করতেন শুনি?
ভেবে দেখিনি।
তার মানে এই নয় যে, আমি ভালো লোক বা আমার উদ্দেশ্য মহৎ।
বুঝলাম। কিন্তু উদ্দেশ্যটা কী?
উদ্দেশ্য? উদ্দেশ্যটা যে ঠিক কী তা আমিও গুছিয়ে ভেবে আসিনি। বোধহয় আপনাকে একটু মেপে নেওয়াই আমার উদ্দেশ্য ছিল।
আমাকে মেপে নেবেন? কিন্তু কেন? মেপে নেওয়া তো মস্তানদের ধর্ম।
তা তো বটেই। আমি তো বলিনি যে, আমি মস্তান নই।
তা বলেননি। কিন্তু আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, প্রত্যেকটি মানুষেরই অস্তিত্বের একটা তরঙ্গ আছে?
আছে নাকি?
অবশ্যই আছে। লোকটা বদরাগি, মারমুখো, খ্যাপাটে, কিংবা খুব নরম-সরম, ভীতু, ম্যাদাটেমারা কি না তা কাছাকাছি এলে একটু-আধটু টের পাওয়া যায়। মস্তানদের একটা ওইরকম কিছু আছে, কাছাকাছি হলে টের পাওয়ার কথা। কিন্তু আপনার পাশে বসে সেরকম কিছু পাচ্ছি না।
নিজের বোধ-বিবেচনা আর অনুভূতির ওপর আপনি বেশ আস্থাশীল। কিন্তু আমি কোমর থেকে এখন একটা ভোজালি বা পিস্তল বের করলেই আপনার আস্থা ভেঙে যাবে।
তা হয়তো যাবে। কিন্তু আমার অনুমান, আপনার কাছে ওসব নেই।
না থাকলেই বা কী? নিজের স্ত্রীকে খুন করার দায়ে আমি যে, এক বছর জেল খেটেছি সেটা ভুলে যাবেন।
ভোলার কথা উঠছে কেন? আপনি যে স্ত্রীকে খুন করেছেন তা তো আমি জানিই না। তা ছাড়া আপনার সঙ্গে এই তো আমার প্রথম দেখা হল।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাও তো বটে। আসলে আমার সব সময়ে মনে হয় আমি যে একজন খুনি এবং নিজের বউকে মেরেছি এটা বোধহয় বিশ্বসংসারের কারো অবিদিত নেই।
নিজের স্ত্রীকে খুন করেছিলেন নাকি?
লোকে তো তাই বলে। আদালতের রায়েও তাই বলা হয়েছিল।
সেক্ষেত্রে যতদূর জানি, আপনার যাবজ্জীবন বা ফাঁসিটাসি হওয়ার কথা। মাত্র এক বছরের জেল হওয়ার তো কথা নয়।
যাবজ্জীবনই হয়েছিল।
তাহলে কি আপনি জেল থেকে পালিয়ে এসেছেন?
না। তবে চেষ্টা করেছিলাম। খুব চেষ্টা করেছিলাম জেল ভেঙে পালানোর। দু-বারই ধরা পড়ে যাই। আমার ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে। বন্ধ জায়গায় থাকতে পারি না। দমবন্ধ হয়ে আসে, মাথা পাগল-পাগল লাগে। দ্বিতীয় কথা, আমার মেয়েটা আন-অ্যাটেণ্ডেড ছিল, তার জন্যও জেল থেকে পালিয়ে আসা খুব জরুরি ছিল আমার।
আপনাকে কি সরকার-বাহাদুর দয়া করে ছেড়ে দিয়েছে?
হাসালেন মশাই। দুনিয়ার কোনো দেশে কি দয়ালু সরকার বলে কিছু আছে? সব দেশেরই সরকার হল অন্ধ, কালা, বোবা এবং হৃদয়হীন। মানুষের জন্য তারা আজ অবধি কিছুই করেনি। সরকার মানেই হচ্ছে একটা সিস্টেম। আর সেই সিস্টেমটা যারা চালায় তাদের অধিকাংশ হল, এই সিস্টেমের যন্ত্রাংশের মতো। সিস্টেমটা যা। বলায় এবং করায়, তারাও তাই বলে এবং করে। কিন্তু এসব কথা একটু কচকচির মতো হয়ে যাচ্ছে।
বুঝেছি। আপনি বরং জেল থেকে কী করে মাত্র এক বছর পর ছাড়া পেলেন সেইটে বলুন।
আমি জেলে যাওয়ার ছয়মাস বাদে আমার মেয়েটা কথা কয়ে উঠল যে!
সে কী? আপনার মেয়ে কি তার আগে বোবা ছিল?
না। কিন্তু নিজের চোখের সামনে মাকে খুন হতে দেখেই সম্ভবত মানসিক ধাক্কায় তার সাময়িক বিকার ঘটে। ফলে সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সাড়াশব্দহীন, বিভ্রান্ত এবং বোবা। চোখের চাউনিও ভ্যাকান্ট। ছয়মাস সে চুপ করে বসে থাকত। চলাফেরা ছিল অসংলগ্ন, আচরণ ছন্নছাড়া, আলো দেখলে ভয় পেত, জোরালো শব্দ শুনলে চমকে উঠত।
কে তাকে দেখে রাখত?
আমি একটু একা মানুষ। মা-বাপের একমাত্র সন্তান। মা-বাবা দুজনেই একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। মা বুকে আগলে রেখেছিলেন বলেই শিশু আমি বেঁচে যাই। তারপর বিপত্নীক দাদু পেলেপুষে খানিক বড়ো করে দিয়ে গত হলেন। এক জ্যাঠা ছিলেন। তিনি পাঁড়মাতাল, জেঠিমা চিররুগণা। তাঁদের ঘাড়ে ভর করে কিছুদিন কাটে। কিন্তু জ্যাঠতুতো তিন দাদাই ছিল যন্ডা-গুণ্ডা এবং বখা ছেলে। সেখানে টিকতে পারিনি বেশিদিন। মাত্র ষোলো বছর বয়স থেকেই আমি টিউশনি করে পেট চালাতে থাকি। বাবার চাকরির সুবাদে কিছু টাকা পাওয়া গিয়েছিল। কষ্টেসৃষ্টে সিএ পাশ করে যাই।
সি এ? ওরে বাবা! আপনি তো রীতিমতো—
দুনিয়ায় কয়েক লক্ষ সি এ আছে। উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। এটা দারিদ্র বা দারিদ্রমোচনের গল্প নয়।
তাহলে বললেন যে!
আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার জেল খাটার সময় আমার মেয়েকে কে দেখে রাখত! সেটা বলার জন্য এই পটভূমি দরকার ছিল।
হ্যাঁ হ্যাঁ, ব্যাকগ্রাউণ্ড বলেও একটা ব্যাপার আছে।
আমি জানতে চাই, আমি কি আমার অটোবায়োগ্রাফিটা যথেষ্ট সংক্ষেপে বলতে পেরেছি?
