ঝড়ের গর্জনে ঘরের ভেতরকার কথাবার্তাও চাপা পড়ে গেল। কানে তালা ধরিয়ে বাজ পড়ল কোথাও। খুব কাছেই।
বদরীর অবশ্য ভয় নেই। প্রতিবারই খোলা মাঠে এই ঝড়ের সঙ্গে তার দু-চারবার দেখা হয়। ঘরে বসে সে শুধু শব্দটা শুনে তান্ডবটা কীরকম তা আন্দাজ করছিল। বেশি বাড়াবাড়ি হলে ট্রেনটা পিছলে যাবে।
আচমকাই ফের মনের ভুল? নাকি চোখের বিভ্রম! পরিষ্কার দেখল সে, একটা নয়, দুটো নয়, তিন তিনটে চোখ অন্ধকারে তিনটে পিদিমের শিখার মতো জ্বলছে। স্থির।
নাঃ, আজ তার মাথাটাই গেছে। কোথায় কী? ঘর যেমন কে তেমন অন্ধকার। তার মধ্যেই পুলিন টর্চ জ্বালাল। পাত্রীর চেয়ার ফাঁকা। উঠে গেছে কোন ফাঁকে। ঘরের ভিড়ও পাতলা হয়ে গেছে। সেই বুড়ো, জাঁদরেল মহিলা আর কদম দাস দাঁড়িয়ে।
পুলিন বলল, এ তো মুশকিল হল রে! যাবি কী করে?
পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি তো আয়ু নয়। থেমে যাবে। বদরী বলল।
সে যাবে। কিন্তু রাস্তাটার কী অবস্থা হবে জানিস?
একটু হাসল বদরী। সে হেলে চাষা, জলকাদা ভেঙে চাষ। এসব বাবু-ঘেঁষা কথা শুনলে মায়া হয়।
ঝড়ের তাড়স বাড়ল। বৃষ্টিটা এখনও শুরু হয়নি।
কদম দাস বলল, আমের বউলগুলো সব গেল।
পুলিন বলল, যায় যাক, তবু ঠাণ্ডা হোক। চাষবাস লাটে উঠতে বসেছিল।
তা বটে।
চালের টিন ধরে টানাটানি করছে ঝড় বাবাজীবন। ওপড়ায় আর কি!
কদম দাস উধ্বমুখে চেয়েছিল। চালের নীচে কাঠের পাটাতন। পাটাতনে রাজ্যের জিনিস।
এ-ঘরের না হলেও অন্য কোনো ঘরের টিন মড়াৎ করে উলটে গেল বটে। বিকট শব্দে সেটা আছড়ে পড়ল কোথাও। দুটো গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ হল পর পর।
সুপুরি আর জামগাছটা গেল। কদম দাস মুখ শুকনো করে বলল।
পুলিন টর্চটা নিবিয়ে বলল, অ বদরী।
বদরী বলল, ঘড়িটা দ্যাখো পুলিনদা।
ছ-টা বত্রিশ। টাইম দেখে হবেটা কী? ঝড় না থামলে তো নড়ার উপায় নেই।
এরপর খানিকক্ষণ কথাবার্তা বন্ধ। তারপর-ই বৃষ্টিটা এল। প্রথম চড়বড়ে কয়েকটা ফোঁটা। তারপর তুমুল। তারপর মুষলধারে।
বদরী চুপ করে বসে রইল। বাইরের ঝড়বৃষ্টি বা মেয়ের চিন্তা, শেষ ট্রেন কোনোটার কথাই ভাবছে না সে। ভাবছে, ভুল দেখল। কী দেখল সে? কাত্যায়নীর গপ্পো তো গপ্পোই। ওর কম অনেক রটনা হয়। তাহলে এরকমধারা হচ্ছে কেন?
বুড়ো মানুষটি হঠাৎ বলল, সুলক্ষণ।
পুলিন বলে, কীসের সুলক্ষণ?
এই কালবোশেখির কথাই বলছি।
অ।
কদম একটা শ্বাস ফেলে বলল, যাক, ফাঁড়াটা কেটেছে। গোয়ালঘরের একটা টিন গেছে। তা যাক।
বদরী বসে আছে চুপচাপ। তার যেন আর তাড়া নেই। গেলেও হয়, না গেলেও হয়।
তাড়াটা এল পুলিনের দিক থেকেই, ওরে ওঠ, সাতটা বাজে যে।
ঝড় থেমেছে। বৃষ্টিটাও ধরে এল। টিনের চালে এখন শুধু মিঠে রিমঝিম। বদরী উঠল।
কদম দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, চললেন তাহলে। কষ্ট পেয়ে গেলেন একটু। যেতেও কষ্ট আছে। জলকাদা। বদরী বলল, ও কিছু নয়।
দাওয়ায় পা দিয়েই বুঝল, সামনের অন্ধকারে মেলা লন্ডভন্ড কান্ড হয়ে আছে। গাছ পড়েছে, ডাল ভেঙেছে, মেলা চাল উড়ে গেছে। লোকজনের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে খুব। আতঙ্কের গলা। টর্চ জ্বেলে হাঁটতে হাঁটতে মাঠ পেরোচ্ছে দুজন। চারদিকে বিশাল অন্ধকার মাঠ। ভেজা বাতাস বইছে। জলে-কাদায় পিছল পথ।
ও বদরী, কিছু বল।
কী বলব?
পছন্দ হল?
বদরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, পছন্দ না হয়ে উপায় আছে!
তিন নম্বর বেঞ্চ
আচ্ছা, এটাই তো পূর্ব দিক থেকে তিন নম্বর বেঞ্চ? তাই-না?
হ্যাঁ। এটাই তিন নম্বর বেঞ্চ।
আর আপনিই কি মধু রায়?
হ্যাঁ।
তাহলে আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি। আমার নাম নব চৌধুরী।
আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। তবে আসাটা উচিত হয়নি।
কেন বলুন তো? আমি আজ সকালেই আপনার এস এম এস পেয়েছি। আপনি আমাকে এই জায়গায় দেখা করতে বলেছেন।
আপনি কি আমাকে চেনেন?
না।
তাহলে? কোন সাহসে একজন অচেনা লোকের এস এম এস পেয়ে আপনি বিনা দ্বিধায় তার কথামতো চলে এলেন?
বিনা দ্বিধায় এসেছি, এ-কথা বলা যায় না। এস এম এস-টা পেয়ে আমি অনেক দুশ্চিন্তা করেছি। অজানা নানারকম আশঙ্কাও হয়েছে। এবং তারপর বেশ ভয়ে ভয়েই এসেছি।
এ যুগে ভয় পাওয়াটাই স্বাস্থ্যের লক্ষণ। যত ভয় পাবেন ততই সুরক্ষিত থাকবেন। আসল কথা হল, আপনি একজন অবিমৃশ্যকারী এবং হঠকারী মানুষ।
আপনি কি আমাকে বকাঝকা করছেন?
করাই তো উচিত। একজন অজ্ঞাতকুলশীলের রহস্যময় বার্তা পেয়ে লেকের ধারে এই শীতের রাতে সাড়ে ন-টায় দেখা করতে আসাটা কি অবিমৃশ্যকারিতা নয়? আমি একজন গুণ্ডা, অপহরণকারী, ব্ল্যাকমেলার বা খুনিও তো হতে পারি।
তা তো বটেই। তবে কিনা কৌতূহল বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। চেনা ছকের বাইরে এই যে একটা বেশ অ্যাডভেঞ্চার বা রহস্যময় অ্যাপয়েন্টমেন্টের থ্রিলটাও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আপনি কি সত্যিই গুণ্ডা বা অপহরণকারী বা ব্ল্যাকমেলার বা খুনির কোনো একটা?
হলে কী করবেন? পালাবেন, না লড়বেন?
অবস্থা বুঝে ভাবতে হবে।
বসুন।
বসলাম। কিন্তু শুনেছি রাতের দিকে পুলিশ লেকে খোঁজ নেয়। আমাদের এত রাতে বসে থাকতে দেখলে ধরে নিয়ে যেতে পারে।
আপনার চেয়ে পুলিশকে আমি একটু বেশি চিনি। আমি অনেকদিন জেল খেটেছি।
ও বাবা। আপনার অপরাধটা কী?
সেটা বলতে গেলে মহাভারত। তবে ভয় নেই, পুলিশ আসবে না। আপনি কি পুলিশকে ভয় পান?
