খেয়ে–দেয়ে ওরা এল। ইভা মশারি টাঙাল। ওরা গল্পের বাকি অর্ধেকটা না শুনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
কারেন্ট এখনও আসেনি। পৃথিবীজোড়া অন্ধকার।
মোমবাতিটা মাঝখানে রেখে দু-ধারে নিঃশব্দে খেতে বসে ইভা আর অমিত, সম্পর্কটা সহজ নেই যেন। একধারে ছেলেমেয়েদের এঁটো থালা পড়ে আছে। তাতে ডাল–ঝোল মাখা কিছু ভাত। অমিত আড়চোখে চেয়ে দেখল। এখন দু-টাকা আশি কেজি যাচ্ছে চাল! তাদের রেশন কার্ড নেই। বলল –ভাত নষ্ট করো কেন!
–কী করব? শেষ কয়েকটা গরাস খেল না।
–কম করে নেবে। গুচ্ছের গেলাতে চাইলেই কি হয়। ওদের পেটে জায়গা কত।
–দুটো ভাতই তো, আর কী ভালোমন্দ খায়! ঘি মাখন মাছ–মাংস কি যায় ওদের পেটে?
–গরিবের সন্তান, যা জোটে তাই খেয়ে বাঁচবে।
–মুরোদ না থাকলেই ওসব কথা বলে লোকে।
–চালের দাম জানো?
–জানতে চাই না।
মেয়েমানুষটা ঝগড়া পাকিয়ে তুলছে। রোগা, দুর্বল, রক্তহীন। তবু গলা এতটুকু ক্ষীণ নয়। সবচেয়ে আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি ইভার। বিয়ের সাত বছর ধরে প্রতিদিন অমিত যত অন্যায় করেছে, যত অবহেলা, যত অপমান সব হুবহু মুখস্থ বলে যায়। মেজাজ ভালো থাকলে মাঝে-মাঝে বলে -এরকম মেমারি নিয়ে লেখাপড়া করলে না ইভা, কেবল স্কুল ফাইনাল পাস করে বসে রইলে।
জ্বলন্ত মোমবাতির ওপর দিয়ে বাঘের চোখে ইভার দিকে চেয়ে থাকে অমিত। ইভাও চেয়ে থাকে বনবেড়ালের মতো। একটুও ভয় পায় না। ভিতরটা হতাশায় ভরে যায় অমিতের। কীরকম করলে কীভাবে তাকালে সেও একটু ভয় পাবে। একটু সমীহ করবে তাকে। অমিত আবার পাতের ওপর মুখ নামায়। লাল রুটিগুলো দেখে এবং ভাবতে থাকে সে হিপনোটিজম শিখবে। কিংবা আরও রাগি হয়ে যাবে! কিংবা একদিন কিছু না বলে কয়ে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।
নিরুদ্দেশও একবার হয়েছিল অমিত এক রাতের জন্য। পরদিন ফিরে দেখে ইভার কি করুণ অবস্থা। পাড়াসুদ্ধ মেয়েপুরুষে ঘর ভরতি, মাঝখানে পাথর হয়ে ইভা বসে, দু-চোখে অবিরল ধারা। তাকে দেখে সাতজন্মের হারানো ধন ফিরে পাওয়ার মতো উড়ে এসেছিল। তারপরই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। সেই দৃশ্য মনে পড়লে আজও বুকে ব্যথা করে। ইভার ভালোবাসাও তো নিখাদ। অমিতও কি বাসে না? বাসে। ভীষণ। তেরাত্রি ইভাকে ছেড়ে থাকলে নিজেকে অনাথ বালকের মতো লাগে। সেই জন্যই ইভা বহুকাল বাপের বাড়ি যায় না। অমিতের জন্য।
.
চালওয়ালা দুঃখিত মুখখানি তুলল। ভ্রাম্যমাণ পুরুত কপালে চন্দনের আর সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে গেছে, কানে গোঁজা বিল্বপত্র। শ্বাস ফেলে বলে–তিন টাকা দশ।
–বলো কী? অমিত চমকায়। তার মাস মাইনে একশো আশি প্লাস কলেজ ডি–এ। রেশন কার্ড নেই।
করুণ একটু হাসে চালওয়ালা–আজ তো এই দর। কাল আবার কী হবে কে জানে।
–গত সপ্তাহে দু’টাকা আশি করে নিয়েছি।
–গত সপ্তাহে! সে তো বাবু গত সপ্তাহ। বলে পাল্লা তুলে বলে–কতটা দেব?
দশ কেজি নেওয়ার কথা বলে দিয়েছিল ইভা। কিন্তু সাহস পেল না অমিত। বলল –চার কেজি।
–গত সপ্তাহে আপনাকে বলেছিলাম, কিছু বেশি করে নিয়ে রাখুন। এ সময়টায় দর চড়ে। চাল ওজন করতে-করতে চালওয়ালা বলে। তারপর বিড়বিড় করতে থাকে। রাম…রাম…দুই…দুই . তিন…তিন…
ক’বছর আগেও চাল কিনলে এক আঁজলা কি এক মুঠো ফাউ দিত। এখন আঙুলের ডগায় গোনাগুনতি দশ কি বারোটা চাল বাড়তি দিল।
ঘামে পিছলে নেমে এসেছিল চশমাটা। অমিত ঠেলে সেটা সেট করল। ইভাকে ধমক দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের পাতে যেন আর ভাত নষ্ট না হয়। আর, এবার থেকে ইভা আর অমিতের মতো ওরাও রাতে রুটি খাবে। পেটে সহ্য হয় না বললে চলবে না। সকলের ছেলেমেয়ে রুটি খায় ওদের ছেলেমেয়ে খাবে না কেন? খেতে-খেতে অভ্যাস হয়ে যাবে। ইভা হয়তো ঝগড়া করবে, তেড়ে আসবে, তবু বলতে ছাড়বে না অমিত।
বাজার আর চালের বোঝা দু-হাতে নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে অমিত ইভা কী বলবে এবং সে তার কী উত্তর দেবে তা ভাবতে-ভাবতে যায়। এবং মনে-মনে সে ঝগড়া করতে থাকে। প্রচণ্ড ঝগড়া। রাগে ফেটে পড়ে। ইভাকে লাথি মারে, চুলের ঝুঁটি ধরে হিঁচড়ে টেনে বের করে দেয় ঘর থেকে, বলেইঃনবাবের মেয়ে।
কিন্তু সবই ঘটে মনে-মনে। একটু অন্যমনস্কভাবে সে রাস্তার দূরত্ব অতিক্রম করতে থাকে। আজকাল ইভার কথা ভাবলেই তার মাথা আগুন হয়ে ওঠে। মনে-মনে সে যে কত গাল দেয়। ইভাকে। ভালোও কি বাসে না? বাসে। ভীষণ। এবং এই দুটি অনুভূতিই তাকে দু-ভাগে ভাগ করে খেয়ে নিচ্ছে।
ইভা রাগ করল না। মন দিয়ে অমিতের কাছে চালের দর, দেশের দুর্দিনের কথা শুনল। তারপর সংক্ষেপে বলে–দেখি।
–হ্যাঁ। দ্যাখো। গাঁয়ে মাস্টারি করতাম, সে বরং ভালো ছিল। শহরে নতুন প্রফেসারি নিয়ে এসে ফেঁসে গেছি। চেনাজানা লোকও তেমন নেই যে টপ করে হাত ধরব, দোকানেও ধারবাকি আনার মতো চেনা হয়নি। বুঝলে?
ইভা বুঝেছে। মাথা নাড়ল। এবং একটু পরে এক কাপ অপ্রত্যাশিত চা–ও করে দিল। ইকনমিক্স-এর সাহা বেঁটে এবং কালো, মুখখানা সবসময়েই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সহজেই উত্তেজিত হয় লোকটা, সহজেই আনন্দিত হয়। তার সঙ্গে মোটামুটি ভালোই ভাব হয়ে গেছে অমিতের। দ্বিতীয় পিরিয়ডের পর দেখা হতেই লোকটা খুব উত্তেজিতভাবে বলল –এ হচ্ছে অঘোষিত দুর্ভিক্ষ। ফেমিন ইন ফুল ফর্ম।
–তাহলে সেটা ওরা ডিক্লেয়ার করুক।
