–একটা মোমবাতি এ-ঘরে দেবে না? অমিত চেঁচিয়ে জিগ্যেস করে।
রান্নাঘর থেকে ইভার উত্তর আসে না! ইভা ও রকমই। আজকাল দু-তিনবার জিগ্যেস না করলে উত্তর দেয় না।
–কী গো? অমিত বলল ।
ইভা আস্তে বলে–মোমবাতি দিয়ে কী হবে? তোমরা তো বসেই থাকবে এখন!
–অন্ধকারে কি ভালো লাগে?
–না লাগলেও কিছু করার নেই। মোমবাতি একটাই ছিল।
–ওঃ। অমিত সিগারেট ধরাল।
অনিতার মাথাটা বুক থেকে লিত হয়ে কোলে নেমে গেল। তার দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ হয়। ঘুমিয়ে পড়বে মেয়েটা।
অমিত নীচু হয়ে ডাকল–অনি, ও অনি!
–উঁ। ক্ষীণ পাখি–গলায় সাড়া দেয় অনিতা।
–এখন ঘুমোয় না মা, ভাত খেয়ে ঘুমোবে।
–খাবো না।
–খাবে না কি? খেতে হয়। গল্পটা শোনো।
ঘুমগলাতেই অনিতা বলে–বলো তাহলে।
এইটুকু বয়সেই কি টনটনে উচ্চারণ মেয়েটার। পরিষ্কার কথা বলে, এতটুকু শিশুসুলভ আধো–কথার জড়তা নেই। অমিত মাঝে-মাঝে ইভাকে বলে–আমরা ছেলেবয়সে এত পাকা কথা বলতে পারতামই না। এখনকার ছেলেমেয়েরা কীরকম অল্প বয়সেই পাকা হয়ে যায়।
ঘুমন্ত মেয়েটাকে টেনে বসায় অমিত। মাথাটা আবার পাঁজরে লাগে। অনেকক্ষণ চুপচাপ ব্যাপারটা লক্ষ্য করে টুবলু বলে–আমি ঘুমোই না। ঘুমোই বাবা?
–না তো। তুমি লক্ষ্মী ছেলে।
ছেলেটার জন্য কত মায়া অমিতের, ভারী ভীতু ছেলে, ঘরকুনো। এ-বয়সে যেমন দুরন্ত হয়। বাচ্চারা, তেমন নয়। রোগা দুর্বল ন্যাতানো। স্টেশন রোড-এর এক বুড়ো হোমিওপ্যাথ গত বছরখানেক যাবৎ ওষুধ দিচ্ছে। কিন্তু ছেলেটার তেমন বাড়ন নেই। খেতে চায় না, কখনও ওর তেষ্টা পায় না, খেলে না। ইভার ইচ্ছে একজন চাইল্ড স্পেশালিস্টকে দেখায়। সেটা হয়তো ধারকর্জ করে দেখাতেও পারত অমিত। কিন্তু তার কলেজের একজন কলিগ ছেলেকে স্পেশালিস্ট দিয়ে দেখানোর পর যে খাওয়ার চার্ট আর ওষুধ বিষুধের ফিরিস্তি দিয়েছিল তাতে অমিত ভড়কে যায়। তাই গত একবছর যাবৎ ইভা বিস্তর অনুযোগ করা সত্বেও অমিত গা করেনি। যাক গে, কৃষ্ণের জীব, টিকটিক করে বেঁচে থাক। বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ছেলে বয়সে অমিতও তো কত ভুগেছে, মাসেক ধরে রক্ত আমাশা, চিকিৎসা ফিকিৎসা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। গ্যাঁদাল পাতা বাটা, থানকুনির ঝোল, পুরোনো আতপ চালের গলা ভাত, পাড়ার এল এম এফ ডাক্তারের দেওয়া ক্যাস্টর অয়েল ইমালশান, এই খেয়ে ফাঁড়া কাটিয়ে আজও বেঁচে আছে। তার ছেলেটাই বা তাহলে বাঁচবে না কেন?
সিগারেটের আগুন ফুলকি ছড়াচ্ছে। অন্ধকারে হাতড়ে অ্যাসট্রেটা ঠাহর করে অমিত। সাবধানে ছাই ঝাড়ে। বলে–একদিন একটা টিয়াপাখি উড়ে এল খরগোশের বাড়িতে, বলল –খরগোশ ভাই, আমি তোমার কাছে থাকব। খরগোশ–থাকবে তো। কিন্তু ঘর কোথায়! আমার তো ছোট্ট একটু খুপড়ি! টিয়াপাখি বলে–আমার বাসা পড়ে ভেঙে গেছে, এখন আমার ডিম পাড়বার সময়, তাহলে উপায়? তখন খরগোশটায় দয়া হল, একটা ছোট্ট খুপরি বানিয়ে দিল টিয়াপাখিটাকে। টিয়াপাখি থাকে, ডিম পাড়ে, তা দেয় মনে ভারী আনন্দ, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরুবে। কত আদর করবে বাচ্চাকে, উড়তে শেখাবে, খেতে শেখাবে, শিকার করতে শেখাবে। খরগোশ একদিন খাবার আনতে বাইরে গেছে, এমন সময়ে এক মস্ত ইঁদুর এসে হাজির। বলল –এই টিয়াপাখি, দে তোর দুটো ডিম। টিয়া বলল , কেন দেব? ডিম ফুটে আমার বাচ্চা হবে, কত আদর করব, তোকে দেব কেন? ইঁদুর বলল –দিবি না তো। তবে রে বলে দাঁত বের করে কামড়াতে গেল…অনি ও অনি।
–উঁ।
–আবার ঘুমোচ্ছিস? বলে অমিত গলা ছেড়ে বলে–ইভা, ভাত হয়েছে? অনি ঘুমিয়ে পড়ছে যে।
–বাবা, তারপর? জিগ্যেস করে টুবলু।
–বলছি দাঁড়া। দ্যাখ না বোন ঘুমিয়ে পড়ছে! ও অনি!
হঠাৎ অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো আসে ইভা। কথা বলে না। নড়া ধরে হিঁচড়ে টেনে নেয় মেয়েটাকে। ছেলেটাকে টানতে হয় না। ভীতু ছেলে। অন্ধকারেই টের পায় মা’র মেজাজ ভালো নেই। সে রোগা পায়ে লাফ দিয়ে নামে চৌকি থেকে। মার পিছু পিছু বাধ্য ছেলের মতো যায়।
দু-ঘরের মাঝখানে পরদা উড়ছে। ওপাশেরটা আসলে ঘর নয়। রান্নাঘর। সেখানে মোমের আলোর আভা। অন্ধকারে বসে অমিত সেই মৃদু আভার দিকে চেয়ে থাকে। মেয়েটা খেতে চাইছে না। ইভা তার হাতের চুড়ির শব্দ তুলে দুটো চড় কষাল। মেয়েটা কাঁদছে। ইভা চাপা স্বরে মেয়েকে বকছে এবং মেয়েকে বকতে–বকতেই বকার ঝাঁঝটা নিজের কপালের এবং ভাগ্যের প্রসঙ্গে বলে যাচ্ছে। অমিত চুপ করে বসে শোনে। ইচ্ছে করে উঠে গিয়ে একটা লাথিতে মেয়েমানুষটাকে চুপ করায়।
লাথি যে কখনও মারেনি অমিত তা নয়। লাথি বা চড় চাপড় কয়েকবারই মেরে দেখেছে। লাভ হয় না। সদ্য–সদ্য একটু ফল হয় বটে কিন্তু ইভা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
অবিকল ছাগলের মতো একটা লোক গলা পরিষ্কার করছে কোথায় যেন। ‘হ্যাঁ-ক’ ‘হ্যাঁ-ক’ শব্দটা শুনলে নিজেরও যেন বমি তুলতে ইচ্ছে করে।
কান্না থামিয়ে ছেলেমেয়েরা এখন খাচ্ছে। গুনগুন করে এখন আবার সোহাগের গলায় ওদের গল্প শোনাচ্ছে ইভা। ইভাকে নিয়েই দিনের অধিকাংশ সময় ভাবে অমিত। বিয়ে করে তারা সুখী
অসুখী তা ঠিক বুঝতে পারে না। কেউই বোধহয় পারে না। মেয়েমানুষ জাতটার মুখের সঙ্গে মনের মিল নেই। যখন তারা খুবই সুখে আছে তখনও পুরোনো দুঃখের কথা তুলে খোঁটা দেবেই।
