করবে না কেন? দুনিয়ায় কে কার জন্য বসে থাকে?
জুঁই মাথা নেড়ে ভালো মানুষের মতো বলে, সে অবশ্য ঠিক কথা।
দিগম্বর উঁকি দিয়ে দেখল বহু মানুষ বাঁশের সাঁকো পেরোতে লাইন দিয়েছে। ভিড়ে ভিড়াক্কার। তার মধ্যে খগেনবাবু বা সেই ফরসা মেয়েছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
খানিকটা সময় ছাড় দিয়ে ধীরে ধীরে দিগম্বর আর জুঁই এগোয়। দেরি হয়ে গেছে। ওপারের বাসে আর বসার জায়গা পাবে না তারা। কিন্তু সে কথা কেউ ভাবছে না।
সাঁকোটা নড়বড় করে দোলে। মেলা লোকের পায়ের চাপে মড়মড় শব্দ উঠছে। কখন ভাঙে তার ঠিক নেই। খুব সাবধানে জুঁই আগে আগে, দিগম্বর তার পিছু পিছু সাঁকোতে ওঠে। নীচে ভরা বর্ষার খাল গোঁ–গোঁ করে বয়ে যাচ্ছে। স্রোতের টানে সাঁকো থরথর করে কাঁপে। সবটাই ভালোয় ভালোয় পেরিয়ে একেবারে জমিতে পা দেওয়ার মুখে জুঁইয়ের পা ফসকাল।
উরে বাবাঃ। বলে টাল্লা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল সামনের দিকে, কিন্তু গায়ে গায়ে মেলাই লোক, পড়বে কোথায়। তাই পড়ল না জুঁই। একজনে পিঠে ধাক্কা খেয়ে সেই পিঠেই হাতের ভর দিয়ে সোজা হয়ে উঠল।
একটা খোকা কেঁদে উঠল, হঠাৎ। লোকটা মুখ ফিরিয়ে বিরক্ত গলায় বলল , দেখেশুনে চলবে তো মেয়ে! আর একটু হলেই ছেলেটা ছিটকে পড়ত।
জুঁই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দিগম্বরের বুক হিম হয়ে যায়। লোকটা খগেনবাবু। কোত্থেকে যে উদয় হল হঠাৎ।
দুজনেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকবে তার সাধ্য কী? সাঁকোর সরু মুখে ঠেলাঠেলি দৌড়াদৌড়ি। কে আগে যাবে। তাই দুজনকেই এগোতে হল।
সামনেই খগেনবাবু যাচ্ছে। কোলের খোকাটা চুপ করে চেয়ে দেখছে পিছন বাগে।
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে দিগম্বরের। চাপা স্বরে বলে, চিনতে পারেনি।
জুঁই ফিরে চায়। তেমনি ভ্যাবলা আনমনা মুখ। চোখের দৃষ্টিতে যেন সর পড়ছে। কিছু দেখছে না যেন।
কিছু বলছ?
বললাম, কপালাটা ভালো। আমাদের চিনতে পারেনি।
বউটাকে দেখলে ভালো করে?
ও আর দেখব কী? রংটাই যা ফরসা।
জুঁই মাথা নাড়ে, না মুখটাও সুন্দর।
থ্যাবড়া মুখ। তোমার মতো বড়-বড় চোখ নয়।
তুমি তো ভয়ে চামচিকে হয়ে আছ, দেখলে কখন?
দেখেছি।
ছাই দেখেছে। বউটা সুন্দরীই।
আমার চোখে লাগল না।
জুঁই হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, ওমা। দ্যাখো ওরা মাঠের মধ্যে নেমে যাচ্ছে।
দুজনেই দাঁড়িয়ে যায়। কাঁচা সরু রাস্তায় লোকের ঠেলাঠেলি। বাসটা সামনেই দক্ষিণমুখো দাঁড়িয়ে। তার গায়ে লোকে গিয়ে পিঁপড়ের মতো জমাট বাঁধছে।
পথ ছেড়ে দুজনে ঘাস জমিতে সরে দাঁড়ায়। দেখে খগেনবাবু কোলে বাচ্চা আর পিছনে বউ নিয়ে মাঠের পথে ধরে পুবমুখো যাচ্ছে।
দিগম্বর বলল , এ জায়গা হল দীঘরে। পুবে গামছাড়োবা। গামছাডোবাতেই যাচ্ছে তাহলে।
জুঁই তেমনি আচ্ছন্ন ঘোর ঘোর চোখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ আস্তে করে বলল , বেশ দেখাচ্ছে না?
বউ বাচ্চা নিয়ে খগেনবাবু মেঘলা আকাশের নীচে মাঠ পেরিয়ে গামছাডোবায় যাচ্ছে তাতে সুন্দর দেখানোর কী আছে বোঝে না দিগম্বর।
দেরি করলে চলবে না। বাস ছাড়বে এখুনি। নলতাপুরে জুঁইয়ের দেড় বছরের মেয়েটা বড় বউয়ের জিম্মায় আছে। বড় বউ আবার বেশিক্ষণ বাচ্চা রাখতে হলে চেঁচামেচি করে। তার নিজেরই তিনটে।
দিগম্বর তাড়া দেয়, চলো চলো। দেরি হচ্ছে।
আঃ, দাঁড়াও না।
দাঁড়াব! বলো কী? এরপর সেই সাড়ে সাতটায় লাস্ট বাস।
হোকগে।
তার মানে?
জুঁই কথাটা শুনতে পায় না। সামনে আদিগন্ত খোলা হা–হা করা মাঠে মেঘলা আলোর মধ্যে খগেনবাবু অনেকটা এগিয়ে গেছে। সাবধানে আল পেরোচ্ছে। বউয়ের হাতে একটা চামড়ার ছোট স্যুটকেস।
কন্ডাক্টর হাঁকাহাঁকি করছে জোর গলায়, নলতাপুর…নলতাপুর…চরণগঙ্গা।
দিগম্বর চেয়ে দেখে, বাসের বাইরে আর লোক পড়ে নেই। যে যেখানে পেরেছে উঠে পড়েছে। ছাদে পর্যন্ত।
জুঁইফুল! কী হচ্ছে শুনি। দিগম্বর একটু আদর মিশিয়ে ডাকে।
জুঁই জবাব দেয় না। তবে বড়-বড় চোখে তাকায়। এরকম তাকানো কোনও কালে দ্যাখেনি দিগম্বর। আজই কেমনধারা একটু অন্যরকম দেখছে। ভূতে পেলে বোধহয় এমন হয়।
কিছু বলছ? আবার জিগ্যেস করে জুঁই। কিন্তু জবাব শোনার আগেই আবার মাঠের দিকে চেয়ে দেখে। ফিসফিস করে বলে, সত্যি বলছ চিনতে পারেনি?
বরাতজোর আর কাকে বলে। চিনলে রক্ষে ছিল না। একসময়ে তো খগেনবাবুর চামচাগিরি করতাম।
কিন্তু চিনল না কেন বলো তো।
ভুলে গেছে। মুখটা ভুলে গেছে।
তা কি হয়! আমি তো ভুলিনি। তবে কর্তা ভোলে কী করে?
দেখেনি ভালো করে।
ধমকাল কিন্তু। মেয়ে বলে ডাকল।
শুনেছি তো।
এত কাছে থেকে দেখেও না চেনারা কথা তো নয়।
তুমিই বা বেছে–বেছে ওর ঘাড়ে পড়তে গেলে কেন?
সে কি ইচ্ছে করে? পড়লাম, উঠে বুঝলাম একেবারে কর্তার পিঠের ওপর…ওঃ, গায়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দ্যাখো! কতকাল পর…
কী কতকাল পর?
সে তুমি বুঝবে না। কিন্তু এই বলে দিচ্ছি তোমায় মেয়েমানুষটা যত ফরসাই হোক, কর্তার চোখে ও রং ধরবে না।
তাই বা বলছ কী করে?
বলছি, জানি বলেই। কর্তার পছন্দ মাজা রং।
বিরক্ত হয়ে দিগম্বর বলে, না হয় তাই হল। এবার চলো না। বাস ভেঁপু দিচ্ছে। কন্ডাক্টর ওই হাতছানি দিয়ে ডাকতে লেগেছে, দ্যাখো চেয়ে।
দাঁড়াও না। এ বাসটা ছেড়ে দাও। পরের বাসে যাব।
উরে ব্বাস! বলো কী। সাড়ে সাতটা পর্যন্ত থাকব কোথায়? জল এলে দীঘরেতে মাথা বাঁচানোর জায়গা নেই!
