জুঁইয়ের জ্ঞান ফেরে। ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকা দেয়। তারপর কুঁজো হয়ে দিগম্বরকে বলে, দেখেছি।
দিগম্বর কটমট করে তাকায়। বলে, উদ্ধার করেছ। তোমাকে দেখেছে?
না। এদিকে তাকাচ্ছে না। সঙ্গে কারা আছে মনে হল। তারা বসে আছে বলে দেখা গেল না। আবছা যেন মনে হয়, বউ মতো কেউ। তার সঙ্গে কথা বলছে আর সিগারেট খাচ্ছে। বলেই ছুঁই। আবার সোজা হয় এবং ফের অবাধ্য হয়ে সামনের দিকে টালুকটলুক চেয়ে থাকে।
বাসের মাথায় ধমাধম মাল চাপানোর শব্দ হচ্ছে। বিস্তর চেঁচামেচি। কাতারে লোক উঠছে ভিতরে। অনেক ধমক চমক অপমান সয়েও দিগম্বর বসেই থাকে। সামনে বাঁশগেড়ের খাল। পুরোনো পোল দু-বছর আগের বানে ভেসে গেছে। নতুন পোল তৈরি হচ্ছে সবে। ফলে বাস ওপারে যায় না। যাত্রীরা একটা বাঁশের সাঁকো পায়ে হেঁটে পেরিয়ে ওপাশে বাস ধরে। বাঁশগেড়েতে বাস থেকে নামলে কী হবে তাই ভাবে দিগম্বর, আর বিরক্ত চোখে জুঁইয়ের কাণ্ড দেখে! নতুন-নতুন যেমন তাকে অপলক চোখে দেখত, এখন ঠিক সেই চোখে সামনের দিকে চেয়ে খগেনবাবুকে দেখছে! মেয়েছেলেদের কি ভয়ভীতি নেই?
ভিড়টা আবার চেপে আসার পর বুকে আটকানো দম ছাড়ে দিগম্বর। জুঁই এখনও দেখছে। বিরক্তি কেটে এবারে একটু মায়া হল দিগম্বরের। জুঁইকে দোষ দেওয়া যায় না। একসময়ে তো খগেনবাবুরই বিয়ে করা বউ ছিল জুঁই। চার-পাঁচ বছর সুখে দুঃখে টানা ঘরও করেছে। তারপর না হয় পালিয়ে এসেছে দিগম্বরের সঙ্গে। তা বলে তো আর সব কিছুই ভুলে যাওয়া যায় না। দিগম্বরের সঙ্গে আছে মাত্র চার বছর, ভুলে যাওয়ার পক্ষে সময়টাও বেশি যায়নি। বাচ্চা কাচ্চা হয়নি ভাগ্যিস! হলে এতক্ষণে বোধহয় গিয়ে হামলে পড়ত।
জুঁই হঠাৎ আবার নীচু হল। বলল , সঙ্গের জন মেয়েছেলেই বটে, বুঝলে।
হোক না, দিগম্বর তেতো মুখে বলে।
মুখটা দেখতে পাচ্ছি না অবশ্য। নীল রঙের শাড়ি, জরির পাড়।
তোমাকে দেখেনি তো!
না। দুজনে খুব কথা হচ্ছে!
হোক। তুমি মুখ ঘুরিয়ে থাকো!
পান খেল এইমাত্র। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পিক ফেলতে দেখলাম। মেয়েছেলেটাই পান দিল।
দিকগে। অত দেখোনা, ধরা পড়ে যাবে।
জুঁই ভ্রূ কুঁচকে বলে, মেয়েছেলেটা কে বলো তো! বউ নাকি?
কে বলবে! তুমিও যা জান, আমিও তাই।
খুব বলত, আমি মরে গেলে নাকি আর বিয়ে করবে না।
আহা, তুমি তো আর মরে যাওনি!
মরার চেয়ে কম কী? মেয়েমানুষের কতরকম মরণ আছে, জানো?
জুঁই আবার সোজা হয়।
বাঁশগেড়ে এসে গেল বলে। বসে থেকেও বুঝতে পারে দিগম্বর। এইবার নামতে হবে। ভাবতে শরীর হিম হয়ে আসে। মাঝখানে শুধু পাথরগড়ে একটুখানি থামবে। তা সে পাথরগড়েই থামল বোধহয়। কারা যেন নামল সামনের দরজায়। এখানে বেশি লোক নামেও না, ওঠেও না। তাই নামবার তেমন হইচই নেই। তবু বোঝা গেল কারা যেন নামছে। খগেনবাবুই কি?
জুঁইয়ের শাড়ি ধরে আবার একটু টান মারে দিগম্বর। জুঁই নীচু হয়।
কী বলছ?
কারা নামল?
কী করে জানব? কত লোক নামছে উঠছে! কেন?
ওরা কি না?
জুঁই ফিক করে এই বিপদের সময়ে একটু হাসেও। বলে, না। কর্তা বসার জায়গা পেয়েছেন। এদিকে পিছন ফেরানো! ভয় নেই। মেয়েমানুষটাকে কিছুতেই দেখতে পাচ্ছি না।
দেখতে চাইছে কেন?
দেখি না কীরকম।
ভালোই হবে। খগেনবাবুর মেলা পয়সা। ভালো মেয়েছেলেই পাবে। তুমি তো খারাপ ছিলে না।
আমি তো কালো।
রংটাই কি সব?
জুঁই মুখ গোমড়া করে বলে, কর্তা অবশ্য কোনওদিন কালো বলেনি। বরং বলত, মাজা রংই আমার পছন্দ।
এদিকে কোথায় যাচ্ছে বলো তো। দিগম্বর জিগ্যেস করে।
কী জানি।
আত্মীয় স্বজন কেউ নেই তো।
না। তবে শ্বশুরবাড়ি হতে পারে।
দূর। এদিকে বিয়ে হলে সে খবর আমি ঠিক পেতাম।
জুঁইয়ের কথা বলায় মন নেই। আবার সোজা হয়ে বসে দেখছে। মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছে প্রায়।
এই করতে-করতে বাসটা থেমে এল। কন্ডাক্টর ছোঁকরা তেজি গলায় চেঁচাল বাঁশগেড়ে, বাঁশগেড়ে। বাস আর যাবে না।
ঘচাং করে বাসটা থামতেই হুড়ুম হুড়ুম লোক নামতে থাকে। জুঁই দাঁড়িয়ে পড়েছিল, দিগম্বর হাত ধরে টেনে বলল , দেখেশুনে! দেখেশুনে!
জুঁই হাঁ করে চাইল দিগম্বরের দিকে, যেন চিনতেই পারছে না। চেয়ে থেকে–থেকে হঠাৎ যেন চেতন হয়ে বলে উঠল, ফরসা। খুব ফরসা। বুঝলে!
কে?
বউটা।
হোক না। তাতে তোমার কী?
জুঁই মাথা নেড়ে বলে, কিছুনা। বললাম আর কি!
সাবধানে মাথা তোলে দিগম্বর। ভিড়ের প্রথম চোটটা নেমে গেছে। ধীরে সুস্থে খগেনবাবু। উঠল। ফরসা মেয়েছেলেটাও। খগেনবাবু মেয়েছেলেটার কোল থেকে একটা বছর খানেকের খোকাকে নিজের কোলে নিলে। বলল , সাবধানে নেমো।
জুঁই প্রায় চেঁচিয়েই বলে উঠল, খোকাটা দেখেছ! কী সুন্দর নাদুস–নুদুস।
আর একটু হলেই খগেনবাবু ফিরে তাকাত। ধুতির খুঁটটা সিটের কোণে আটকে যাওয়ায় সেটা ছাড়াচ্ছিল বলে তাকিয়েও তাকাল না। সেই ফাঁকে পিছদের দরজা দিয়ে জুঁইয়ের হাত ধরে টেনে নেমে পড়ে দিগম্বর। বাসের পিছনে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে খিঁচিয়ে ওঠে, তোমার মতলবখানা কী বলো তো! বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেল নাকি?
জুঁই হাঁ করে দিগম্বরের দিকে তাকায়। মেঘলা আকাশের ফ্যাকাশে আলোয় ওর মুখখানা দেখায় যেন ঘোরের মধ্যে আছে। চিনতে পারছে না দিগম্বরকে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে চিনতে পারল যেন। বলল , বিয়েই করেছে তাহলে।
