ডাক্তার রাস্তার দিকে চেয়েছিল অপলক। মাছিটা বড় জ্বালাচ্ছে। ভোরবেলাটা কেন আঁধার আঁধার লাগছে আজ? ডাক্তার একটা চিৎকার শুনতে পায়, ‘সাপ-সাপ! চেয়ারে শরীরটা বাঁ-ধার থেকে ডান ধরে মুচড়ে বসে ডাক্তার। পা দুটো তুলে হাঁটু জড়ো করে বুকের কাছে। বাতাসে একটু শীতভাব। সময়টা ভালো না। কে চেঁচাল ‘ডাক্তার ডাক্তার’ বলে? না, ডাক্তার বলে নয়, ‘সাপ সাপ’ বলে। মেয়েছেলের গলা। কমল নয় তো।
মাথাটা ভালো লাগে না ডাক্তারের।
পেছনে জোর করে শব্দ উঠে যেন। ডাক্তার ভয় খায় নাতি রাখুকে। মিষ্টি ওষুধের লোভে প্রায়ই এসে চুরি করে শিশিকে শিশি ফাঁক করে দেয়। অ্যাকেসিসের মাদার টিংচার একবার শিশিসুদ্ধ খেতে গিয়েছিল।
ডাক্তার পিছু ফিরে দেখে। বেড়ালটা হুশ–হুশ করে শব্দ করে। বেড়ালটা সবজে চোখ মেলে তার দিকে চায়। ক্ষীণ একটা শব্দ করে। কমল এদের পালত পুষত। দুটো কমলের সঙ্গে গেছে, আর দুটো রয়ে গেছে। কেউ পারে না, পোষে না, আদর করে না। এরা এমনি থাকে।
বাবা! একটা বুকফাটা চিৎকার করে কে ঘরে ঢোকে।
ডাক্তার চমকে ওঠে। মাথার মধ্যে একটা আলো যেন ঝলসে উঠেই নিভে যায়। মাছিটা ঠিক বসে আছে জ্বর মাঝখানে নড়ছে হাঁটছে।
বাবা, শিগগির আসুন।
ডাক্তার বিরক্ত হয়ে মুখ ফেরায়–কে?
–আমি হরি।
–ও! চেঁচিও না।
–চেঁচাব না কী। আপনার বউমার কী হয়েছে দেখে যান।
–তোমরা দ্যাখো গে। হরিচরণ স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে থাকে। তারপর এই চরিত্রহীন অপদার্থ নাম ডোবানো বুড়োটার প্রতি তীব্র হিংস্র একটা আক্রোশ বোধ করে সে। দু-হাতে যতীনের কাঁধ ধরে একটা ঝাঁকুনি দেয় সে।
–কী বলছেন?
–ওঃ! যতীন নাড়া খেয়ে ভারী ভয় পেয়ে যায়। মাথার মধ্যে লাল আলো নিভে একটা সাদা আলো জ্বলে। আবার সাদাটাও নিভে যায়।
–শিগগির আসুন।
–কোথায়?
–আপনার বউমাকে সাপে কামড়েছে।
ভিতরে একটা হুলুস্থূলের শব্দ হচ্ছে! সেই শব্দ থেকেই বড় বউ গলা তুলে বলে–সাপে কামড়াল কোথায়! কামড়ায়নি! পড়ে গেছে বাপু।
হরিচরণ বাবাকে একটা খোঁচা দেয়–পড়ে গেছে। বাচ্চাটা নষ্ট হতে পারে। আসুন।
–পড়ে গেছে। যতীন বড়-বড় চোখ করে চারিদিকে চায়। শালার মাছিটা। ঠিক বসে আছে এখন নাকের ডগায়। ছাড়ছে না। যতীন বলে–কী করব!
–একটু দেখুন।
–ডাক্তার ডাক।
–ডাকতে পাঠিয়েছি। সে তো দু-মাইল দূর থেকে আসতে যেতে তিন ঘণ্টা। তার মধ্যে কিছু যদি হয়ে যায়।
ডাক্তার ভাবে ওষুধের নাম কিছুই মনেই পড়ে না। অনেক ভেবে বলে—থুজা টু হানড্রেড।
–কী বলছেন?
–উঁহু। ডানদিকে ব্যথা তো? লাইকোপোডিয়াম দেওয়াই ঠিক হবে।
–ডানদিকে না কোনদিকে কে জানে। আপনি আসুন।
ছেলের দিকে ভীত চোখে চেয়ে থাকে ডাক্তার। বলে–আমি কিছু জানি না বাপু, আমার কিছু মনে পড়ছে না।
তার হাত ধরে একটা হেঁচকা টান দিয়ে হরিচরণ বলে–তা বলে একবার চোখে এসে দেখবেন না। আপনারই তো ছেলের বউ।
বিড়বিড় করে ডাক্তার বলে ছেলে না ইয়ে। তোমরা আমার কেউ না। বলতে-বলতেও ডাক্তার সঙ্গে-সঙ্গে যায়। হ্যাঁচকা টানে বুকের বাঁ-দিকে একটা খিচ ব্যথা ওঠে। মাথাটা দুটো টাল খায়। আলোটা দপ করে জ্বলে ফুস করে নিভে যায়।
ভিতরের ঘরে লোকজন জুটেছে মন্দ নয়। মেজবউ শুয়ে আছে খাটে। কোঁকাচ্ছে। শ্বাসকষ্টের কোঁকানি, চোখের তারা স্থির। মুখে গাঁজলার মতো কষ গড়াচ্ছে।
বিড়বিড় করে যতীন ডাক্তার বলে–নাক্স ভমিকা টু হানড্রেড! শিগগির।
হরিচরণ ছুটে যাচ্ছিল ডিসপেনসারিতে ওষুধ আনতে।
ডাক্তার মাথা নেড়ে বলে–না। ভুল।
–তবে?
–সালফার থার্টি।
–কী সব বলছেন?
–ভুলে যাই যে বাবা।
হরিচরণ কী করবে ভেবে পায় না। হাঁ করে চেয়ে থাকে অপদার্থ বাপের দিকে। যতীন ডাক্তার বিড়বিড় করে বলে–পুত্র আর মূত্র একই পথ দিয়ে আসে। বুঝলে? পুত্র যদি পুত্রের কাজ না করে সে তো মূত্র। নাকী?
কথাটা অবশ্য হরিচরণের কানে যায় না। কিন্তু সে লক্ষ করে এই দুঃসময়েও তার বাবা বিড়বিড় করে বকছে। এরকম কখনও করত না তো বুড়ো! পেগলে গেল নাকি!
বাঙালিয়া বাঁ-হাতে খৈনির গুঁড়োর ওপর ডান হাতে একটা আনন্দিত চাপড় মারে। কনুইয়ের ভাঁজ থেকে দুধের খালি বালতি ঝুলছে, মনে অনেক আশ্চর্য আলো এসে পড়েছে আজ। ভারী অন্যমনস্ক সে। একটা দেশওয়ালি গান গুনগুন করে গায় সে। হাতে একটা নরম স্পর্শ লেগে আছে এখনও।
কমললতার সঙ্গে দেখা।
–ক্যায়া হো কমলদিদি।
–ও বাড়িতে কী হয়েছে রে বাঙালু?
–সাপু কাটা নেহি। গিরে পড়ল।
–কে?
–বহুজী। যান না, দেখিয়ে আসন।
বিপদে বারণ নেই। কমললতা তাই এদিক-ওদিক একটু দেখে নেয়। ভয় করে। পঁচিশ বছর কাটিয়েও ভয়। তবু সে ঢুকে পড়ে।
–কী হয়েছে?
বলে সে সোজা ঘরে ঢুকে যায়। কেউ কিছু বলে না, বারণ করে না। সাহস পেয়ে কমললতা বিছানার কাছে উপুড় হয়ে দেখে নারায়ণীকে। মুখটা তুলে বলে–বড়বউমা একটু গরম জল করো, আর মালসায় একটু আগুন। এ কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।
কেউ কিছু বুদ্ধি খুঁজে পাচ্ছিল না। কমললতার কথায় যেন বিশ্বাস খুঁজে পায় সবাই। বড় বউ ধেয়ে যায় রান্নাঘরে। চোখের জল মুছে, উনুন থেকে হাঁড়ি নামিয়ে জল চাপায়।
কমললতা সাহস পেয়ে মেজবউয়ের মাথা কোলে নিয়ে বসে হাওয়া করে। বহুকাল বাদে নিজের হারানো জায়গাটা যেন পেয়ে গেছে কমললতা। হরিচরণকে ডেকে বলে–তোর বাপের ঘর থেকে অ্যালকোহল দশ ফোঁটা একটু গরম দুধে দিয়ে নিয়ে আয়।
