মায়া তো যায় না। রোজ তাই বাইরে থেকে একবার কি দুবার খোঁজ নিয়ে যায় সে ডাক্তারের।
সারাদিন ওইটুকুরই অপেক্ষায় থাকে ডাক্তার। এই একা ফাঁকা বিশ্ব–সংসারে ওই কমললতা ছাড়া আর কেউ বন্ধু নেই।
মাছিটা উড়ে–উড়ে এসে জ্বতে বসছে। সুড়সুড়ি পায়ে নাক বেয়ে নেমে আসে। উড়িয়ে দেয় ডাক্তার। আবার টক করে এসে নাকের ডগায় বসে। নড়ে চড়ে হাঁটে। সকাল বেলাটা কেমন আঁধার–আঁধার মতো লাগে। নিঃশব্দ ঘরে শ্বাস পড়ে শ্বাস ওঠে। ভগবান।
হরিচরণ মাড়োয়ারি ফার্মে কাজ করে। সকালে যেতে হয়। দেরি হয়ে গিয়েছিল। এই সময়টায় মেজবউ নারায়ণী কখনও কাছে যদি থাকে ঠিক পালিয়ে বেড়াবে। নিজেকে দুর্লভ করার ওই হচ্ছে তার কলাকৌশল। পুরুষমানুষকে জ্বালাতন করে না খেলে আর মেয়েছেলের কাছা হয় না? দুবার তিনবার ‘ক–উ ক–উ’ ডাক ডাকল সে। এই ডাকে দুটো কাজ হয়। বউকে জানান দেওয়া হয়, আবার বড় বউকে জ্বালানোও হয়। ডালশুখো আর কাঁচা পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে ফ্যানসা ভাত খেতে টকচা ঢেকুর তুলে হরিচরণ বিরক্ত হয়ে বসে থাকে। মুখখানা না দেখে বেরোই কী করে। দিনটাই খারাপ হয়ে যাবে। কুমু আর রাখু দাদার দুই ছেলেমেয়ে হল্লা চিল্লা করছে পাশের ঘরে। বিরক্তি। মেজাজ খারাপ থাকলে শব্দ সহ্য হয় না। ‘অ্যা–ই’ বলে একটা ধমক দিল এঘর থেকে লেখাপড়া ফেলে হচ্ছেটা কী? শব্দটা বন্ধ হলে আবার ‘কু-উ’ ডাক ছাড়ে সে।
বড় বউ বোধহয় শুনতে পায়। বেঁকিয়ে ওঠে সুধাকে তোমার আক্কেল দেখে মরে যাই। ইস্টিলের বাসন কেউ ছাই দিয়ে মাজে? দ্যাখো তো দাগ ধরে গেল কেমন?
হরিচরণ একটু হাসে। বড় বউয়ের মেজাজ ভালো নেই। ডালশুখোটা আজ মেখেছিল নারায়ণী! একটু হিঙের গুঁড়ো দিয়ে তেলে উলটেপালটে বাসি ডালটার দিব্যি তার করেছিল। বড়বউ খাওয়ার সময়ে জিগ্যেস করল কেমন ডালশুখো খাচ্ছ গো, মেজদা?
–বেশ।
–তার আর কথা কী! কথাতেই বলে–বউ বেঁধেছে মুলো, খেলে লাগে তুলো–তুলো।
আসলে নারায়ণী নিজের হাতে বরের ডালশুখখা করেছে বলে রাগ। হিন্দমোটরের মেকানিক বিষ্ণুচরণ যখন সাঁঝের ঘোরে এসে আজ পেটাবে তখন কেঁদে–কেটে রাগ পড়বে।
কিন্তু বউটা যে কোথায় গেল?
মেজবউ শাকের খেতে সাপ দেখেছিল। শুষনি শাক অযত্নে হয়ে আছে। এ সময়টায় জিভের স্বাদের কোনও ঠিক থাকে না। ফোঁটা ভাতের গন্ধে বমি আসে, আবার চামড়া পোড়া গন্ধ পেলে বুক ভরে দম নিতে ইচ্ছে করে। এই শীত আসি–আসি শরৎকালটা বড্ড ভালো। আকাশ কেমন। নীলাম্বরী হয়ে আছে। গাছপালার রং ধোয়ামোছা ঝকঝকে! রোদ এখন ওম লাগে।
শীত–রোদে নিশ্চিন্তে দক্ষিণের বাগানে শুষনি শাক তুলছিল মেজবউ, লোকটা এখন বেরোবে। ফুসছে। তবু এখন কাছে যাবে না সে। অত বউমুখো মেনিমুখো কেন যে লোকটা। বড় লজ্জা করে নারায়ণীর। বিয়ের পর যেমন তেমন ছিল, কিন্তু পেটে বাচ্চা আসার পর এখন চক্ষুলজ্জা বলে বস্তু নেই। দিনরাত পারলে হামলায়।
এইসব ভাবতে-ভাবতে ঘাসজমি, আগাছার মধ্যে শুষনির পাতা ডাঁটা টুকুস–টুকুস করে ছিঁড়ছিল। মাঝে-মাঝে চোখ তুলে দেখছিল চারিধারে। অনেকখানি দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আকাশ যেন নীল! গাছ যেমন সবুজ। দুটো চারটে ঘুড়ি উড়ছে আকাশে ওই উঁচুতে চিল। ছাতারে উড়ে যায় একটা। কালচে একটা কুবো পাখি কালকাসুরে ডালে হাঁটছে। ‘বুক বুক বুক বুক’ করে একটা মন খারাপ–করা ডাক ডাকছিল একটু আগেই।
একটা টসটসে ডগা ছিড়তে হাত বাড়িয়েই মেজবউ ঘাসের মধ্যে চকরাবকরা দেখতে পায়। প্রথমটায় যেন গা নড়ে না, পা চলে না। সারা গায়ে শিরশিরানি। রোঁয়া দাঁড়িয়ে আছে। লকলকে শরীরটা এঁকেবেঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লম্বা ঘাসে হারিয়ে আবার জেগে উঠছে।
সাপ! সাপ! বলে চেঁচিয়ে বাগানের ফটক পরে হয়ে গিয়ে আঁচল আটকে পড়ে গেল মেজবউ। পড়ে কিছু টের পায় না। কোনও ব্যথা না, জ্বালা না। কেবল বুকটা হাহাকারে ভরে দিয়ে যায় এক আতঙ্ক। ছ’মাসের বাচ্চা যে পেটে! কী হবে ভগবান!
কেঁদে ওঠে মেজবউ।
বড় বউ স্তম্ভিত হয়ে যায়। নড়ে না। দাঁড়িয়ে আবার থরথর করে বসে পড়তে থাকে ভীতু, বউ–সর্বস্ব হরিচরণ। কলতলায় একটা বাসন আছড়ে ছুটে আসে সুধা। আর আসে কমু রাখু!
বাঙালিয়া দুধ দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। বালতিটা রেখে এসে প্রথম ধরে নারায়ণীকে। বলে ক্যা হুয়া? সাপ কাটা হ্যায় কিয়া!
বাঙালিয়ার বেশি বুদ্ধি নেই। সে মেজবউকে ছুঁয়েই বুঝতে পারে, রূপের আগুনে তার হাত পুড়ে গেল বুঝি। কী ফরসা, কী নরম, কী সুন্দর! এরকমই হয় বটে বাবুদের বাড়ির মেয়েরা। নাকি বাঙালি বলেই নরম। নরম শনিচারী কিছু কম নয়। কিন্তু এ তো তুলল। তার ওপর নাক মুখ-চোখ আর ফরসা রঙের কী বাহার।
মেজবউ তার হাত ছাড়িয়ে নিল। বোকার মতো দাঁড়িয়েই থাকে তবু বাঙালিয়া। খাসজমিতে যেন পুজোর ফুল কে একরাশ ঢেলে দিয়ে গেছে। বউটিকে কতবার দেখেছে সে। ছোঁয়নি। ছোঁয়ার পর সে যেন সব আলাদারকম দেখে। হাতটা মেখে আছে নরম স্পর্শে।
হরিচরণ আসে। বড়বউ এসে ধরে তোলে নারায়ণীকে। সুধা এসে মাজাটা ওর মধ্যেই একটু ডলে দেয়, বলে–ভালো করো, ভালো করো, ভালো করো ভগবান।
আশপাশের বাড়ি থেকে দু-চারজন এসে জুটে যায়।
সাপের দাঁতের দাগ অবশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
