মশা কিন্তু পশুপাখির মধ্যে পড়ে না।
তাহলে?
মশা কীটপতঙ্গের গ্রুপে।
তাই তো! ঠিক কথাই তো! তাহলে মশাটা বেশ প্রবলেম ক্রিয়েট করছে বলুন।
তা বলতে পারেন। তবে আজকাল মাঝে-মধ্যে মনে হচ্ছে মশার সঙ্গে আমার যে-লড়াইটা চলছে সেটা অনেকটা খেলাধুলোর মতোই ব্যাপার। সময়টাও কাটছে ভালোই। আজকাল বাথরুমে মশাটার সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি করতে গিয়ে বেশ অনেকটা সময় কেটে যায়। বাথরুমটা বলতে নেই, বেশ বড়োই। পালিয়ে যাওয়ার অনেক জায়গা।
আহা, শুনেও ভালো লাগে। আমাদের মোটে একখানা, তা সেটাও এমন ছোটো যে মাজা ঘোরানোর জায়গা নেই। বাথরুম জিনিসটা পুরুষদের কাছে, বিশেষ করে চিন্তাশীল পুরুষদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আর্কিমিডিস তো ওই বাথরুমেই কী যেন একটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। তা ছাড়া অনেক দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ তাঁরা সব ওই বাথরুমেই চিন্তাটিন্তা করেন বলে শুনেছি। তাই ভাবি, একখানা ভালো বাথরুম থাকলে হয়তো আমার মাথাটাও ভালো খেলত। কিন্তু সে আর হওয়ার জো নেই। পাঁচটা মিনিট বাথরুম বন্ধ থাকলেই বাড়িতে হইচই পড়ে যায়। আপনার বাথরুম ক-টা?
দুটো।
আহা, কান জুড়িয়ে গেল। আপনি একা মানুষ, দু-দুটো বাথরুম। আর আমরা পাঁচজন, বাথরুম মোটে একখানা। বড়ো একটেরে একখানা বাথরুম পেলে আমি তো মশাই গলাও সেধে ফেলতুম। আমার বন্ধু বঙ্কা তো বাথরুমে গলা সেধেই নামকরা গায়ক হয়ে গেল। বাথরুম জিনিসটার গুরুত্ব যে কী সাংঘাতিক তা বলে বোঝানো যায় না।
তা বটে। বাথরুম সম্পর্কে আমিও কিছু ভালো ভালো কথা শুনেছি বটে। ভালো বাথরুম পেলে নাকি সুপ্ত প্রতিভা জেগে ওঠে।
অতি সত্য কথা। ছেলেবেলায় মশাই, আমার অঙ্কে বেশ মাথা ছিল। গানের গলা ছিল। দু-চার লাইন কবিতাও লিখে ফেলতুম। ওই বাথরুমের জন্যই বেগ চেপে চেপে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে গেল। আর তাইতেই প্রতিভাটাও গেল ঘোলাটে হয়ে।
খুবই দুঃখের কথা।
তার ওপর আবার মশাহীন বাথরুম! ভাবাই যায় না।
মশাহীন! না মশাহীন হতে যাবে কেন ওই যে বললুম একটা লোনলি মশা আছে।
আহা, মশাদের আর কতদিন আয়ু বলুন। ঠিক জানা নেই বটে, তবে মাসছয়েকের বেশি কী আর হবে? না হয় বছরখানেকই ধরে নিচ্ছি। ততদিনে তার ন্যাচারাল ডেথ হয়ে গেলেই তা আপনি নিষ্কণ্টক।
মুশকিল কী জানেন? কয়েকদিন আগে অবধি মশাটাকে আমি শত্রু বলে ভাবতাম বটে, কিন্তু হঠাৎ দিনকয়েক হল আমার মনে হচ্ছে, বজ্জাত হোক যাই হোক, মশাটা তো আমাকে সঙ্গও দিচ্ছে। এই যে আমি বাথরুমে গেলেই সে তার খেল শুরু করে, এতে আমার একাকিত্ব ভাবটা কেটেও তো যায় এবং বেশ একটা ফুর্তির ভাব আসে।
কথাটা কিন্তু মন্দ বলেননি। কুকুর, বেড়াল, পাখি পুষলেও কিন্তু ওরকমধারা হয়। মশা অবশ্য পোষ মানার পাত্র নয়।
পোষ মানলে মজাটাও থাকবে না।
আপনি বেশ বিজ্ঞ মানুষ। হবে-না? যার দু-দুটো বাথরুম তার বিজ্ঞ না হয়ে উপায় নেই কিনা। আচ্ছা মশাই, আপনার দ্বিতীয় বাথরুমটার কথা তো কিছুই বললেন না!
ওঃ! ওটা সম্পর্কে যত কম বলা যায়, ততই ভালো।
কেন মশাই, কেন? সেটা কি ব্যবহারযোগ্য নয়?
না, এমনিতে সেটা খুবই ভালো বাথরুম। বিশাল বড়ো। সেটাতে আবার শ্বেতপাথরের একটা পেল্লায় বাথটাব। আছে, বিরাট আয়না, রাজকীয় কমোড এবং বেশ দামি দামি সব ফিটিংস।
তা হলে সেটা ব্যবহার করেন না কেন?
একটু অসুবিধে আছে।
কী অসুবিধে মশাই?
আজ্ঞে, বললে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না।
কেন মশাই, বিশ্বাস করব না কেন?
ওই বাথরুমটা আর একজন ব্যবহার করেন।
ও, তা বিশ্বাস না করার কী আছেন বলুন? আর একজন তো ব্যবহার করতেই পারে।
তা, তো বটেই! কিন্তু আমার ফ্ল্যাটে আমি ছাড়া দৃশ্যত আর কেউ থাকে না।
অ্যাঁ। তা হলে এই আর একজনটা এল কোত্থেকে?
সেটাই তো আমারও প্রশ্ন। ফ্ল্যাটে আর কেউ থাকে না, অথচ ওই বাথরুমটা আর কেউ ব্যবহার করছে এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
বাইরে থেকে কেউ আসে না তো?
আজ্ঞে না।
তবে কি ভূতটুত কিছু?
আমি ভূতে বিশ্বাস করতাম না, এখনও করতে চাইছি না, তবে ব্যাপারটা ওরকমই।
একটু খুলে বলুন-না মশাই, শুনে শরীর রোমাঞ্চিত হচ্ছে যে!
বলার তেমন কিছু নেই। আমি ওই বাথরুমে গেলেই বাথরুমটা যেন খুশি হয় না।
আহা, বাথরুমের আবার খুশি-অখুশি কী?
আছে মশাই, আছে। বাথরুমটা আমাকে তার যোগ্য ব্যবহারকারী বলে মনেই করে না। প্রথম দিন গিয়ে কমোডে বসতে না বসতেহ, ফ্লাশটা আপনা থেকেই অন হয়ে হুড়মুড় করে জল নেমে এল সিস্টার্ন থেকে। শাওয়ার থেকে জল পড়তে লাগল অকারণে। বাথটাবের কলটা কে খুলে দিল। দরজাটা দুম করে খুলে গেল। আমি তো পালিয়ে বাঁচি না।
এ তো পরিষ্কার ভূতুড়ে কান্ড মশাই।
তা বলতে পারেন। অন্যের কাছে ব্যাপারটা ভূতুড়ে বলেই মনে হবে হয়তো। আমার ব্যাখ্যাটা অন্যরকম।
কীরকম মশাই?
কোনো নাক-উঁচু লোক ওটা ব্যবহার করত। খুব শৌখিন লোক। আর বাথরুমটাও সেইজন্য একটু উন্নাসিক। এলেবেলে লোক তাকে ব্যবহার করুক এটা সে চায় না। তাই আমি ঢুকলেই বাথরুমটা নানা কায়দায় তার প্রতিবাদ জানায়।
কিন্তু আপনি যে বললেন, ওটা আর কেউ ব্যবহার করে।
হ্যাঁ, তাও করে। নিশুত রাতে বাথরুম থেকে খুব সুরেলা শিস শুনতে পাই, কখনো গুনগুন করে গান। দামি ওডিকোলোনের গন্ধ আসে, শাওয়ার খুলে কেউ স্নান করে টের পাই।
