তবে সেই চুরি করে বিক্রির কিছু টাকা এখনো নফরের তোষকের তলায় লুকোনো আছে। সবসুদ্ধ গোটা ত্রিশ। মাঝে-মাঝে লুকিয়ে টাকাগুলো ছুঁয়ে আরাম পায় নফর। পৃথিবীতে মানুষ আপন না টাকা আপন তা এখনও সে স্থির করতে পারে না।
আজও সন্ধে পার করেই মোটা গিন্নি তাকে বসিয়ে দিল। এটা আদর নয়, এ হচ্ছে সাবধান হওয়া। নফর খেয়ে বিছানা নিলেই ভালোমন্দ রাঁধবে। খাবে দুজনে।
নফর কিছু বলল না। সেই ভাত আজ আর মুখে রুচছিল না তেমন। প্রাণটা লুচি-লুচি করে, মাংস-মাংস করে। তবু ভাতের দলা কোঁৎ-কোঁৎ করে চালান দিয়ে ঘরে এসে জাগতে বসে নফর। আজ জেগে থেকে কাণ্ডটা দেখবে।
দেখল। পাড়া মাত করে আজ সরষে ইলিশ রান্না হচ্ছে। গণেশ একটা চ্যাঙাড়ি হাতে ঘরে ফিরল আজ। পেটের ভিতরটায় খিদের সেঁতলান দিয়ে মুখে জল এসে গেলে নফরের। একটু রাত করে ওরা বসেছে। ভারী হাসি-ঠাট্টা হচ্ছে দুজনে। নফরের মশারির মধ্যে পনপন করে মশা ঢুকছে।
ওরা শুতে চলে গেল। নফর শুয়ে জেগে রইল একা। মশা কামড়াচ্ছে। কামড়াক। ন্যাড়া। মাথার লোকটাও মশারির মধ্যে সেঁধিয়ে এসে বলে—এলাম বুঝলে! দেনা-পাওনার কথাটা মিটিয়ে নিই।
তোষকের যে ধারে টাকাটা আছে সে ধারাটায় একটু চেপে শুয়ে নফর বলে রোজ তোমার এক কথা।
–বড় অনাদর করেছিলে যে। মেরে ফেললে।
—সে অত ধরলে হয় না।
—ধরছে কে? ধরলে তোমার ফাঁসি হয়।
—তবে?
–বলছি কী, যে জায়গায় মেরেছিলে সে জায়গায় একটু হাত বুলিয়ে দাও। এখনও জায়গাটা ব্যথা করে বড়।
-সত্যি?
—মাইরি। সে শরীরের ব্যথা নয়, অনাদরের ব্যথা। দেবে নাকি একটু হাত বুলিয়ে?
নফরের চোখে জল আসে। উঠে বসে বলে—দেখি।
মাথাটা এগিয়ে লোকটা দেখিয়ে দেয়—এইখানে।
—দেখেছি। ফুলে আছে। বড্ড লেগেছিল, না?
—তা লেগেছিল। তবে তোমার আর দোষ কী?
—দাঁড়াও, হাত বুলিয়ে দিই। বলে নফর হাত বোলাতে থাকে ফোলা জায়গাটায়। নাঃ, এভাবে মারা ঠিক হয়নি।
—আঃ। ব্যথাটা সেরে যাচ্ছে হেনফর। লোকটা বলে।
নফর তার কানে-কানে বলল–লুকোনো ত্রিশটা টাকা আছে আমার। কাল চলো দুজনে দোকানে বসে খুব লুচি মাংস খাই। খাবে?
—খুব খাব। লোকটা বলে।
শুনে নফরচন্দ্র অনেকদিন বাদে পাশ ফিরে আজ নিশ্চিন্তে ঘুমোল।
মশা, ভূত ও সুরবালা
আমার বাথরুমে একটি লোনলি মশা আছে। বুঝলেন মশাই, এরকম বুদ্ধিমান মশক আমি জীবনে আর দেখিনি। ধূর্ত, ফিজিক্যালি ফিট এবং ক্যারাটে বা কুংফুর ওস্তাদের মতো কূটকৌশলী। গত পনেরো দিনের চেষ্টায় আমি তাকে মারতে পারিনি। অথচ মশা মারায় আমার বেশ হাতযশ আছে।
ওই একটা ব্যাপারে অবশ্য আমি খুবই কাঁচা। কত চড়-চাপড় দিয়েও এ-যাবৎ যে-কয়টি মশা মারতে পেরেছি তা হাতে গোনা যায়। দু-হাতে তালি বাজিয়েই হয়তো মারলুম, মশাটা পড়লও তার মধ্যে, কিন্তু মরল না।
কেন মরল না মশাই? মরার-ই তো কথা।
.
কপাল, আমার হাতের তেলো তো ফাঁপা। ওই ফাঁপার মধ্যে পড়ে দিব্যি গা বাঁচিয়ে উড়ে চলে যায়। তবে আমার গিন্নি এ-ব্যাপারে খুবই নমস্যা মহিলা। মশার একেবারে যম। যেটাকে টার্গেট করবেন সেটারই কপাল পুড়ল।
আপনার স্ত্রীকে আমার নমস্কার জানাবেন। কৃতী মহিলাদের শ্রদ্ধা জানাতে আমি খুবই ভালোবাসি।
তা না-হয় জানালুম। কিন্তু মশাই আপনার বাথরুমে কি ওই একটিই মাত্র মশা?
আর মশা নেই? আজ্ঞে না। আমার সারাবাড়িতে একটিও মশা খুঁজে পাবেন না।
সে কী? এ কি ভূতুড়ে কান্ড নাকি মশাই? যতদূর শুনেছিলাম, আপনি একটা পুরোনো বাড়ি কিনেছেন। পুরোনো বাড়ির আনাচে-কানাচে তো প্রচুর মশা থাকার কথা!
বাড়ি নয় মশাই, বাড়ি নয়। আমি একাবোকো মানুষ, বাড়ি দিয়ে কী করব? একটা পুরোনো বাড়ির তিনতলায় একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। দুখানা শোয়ার ঘর, একখানা বেশ বড়োসড়ো খাওয়া আর বসার জায়গা। আমার তো বেশি জায়গা লাগে না। আসবাবপত্রও যৎসামান্য। বুড়ো বয়েসে কেউ হুড়ো না দেয়, সেইজন্যই কেনা। নইলে সম্পত্তি দিয়ে আমি কী করব বলুন?
আহা, বুড়ো বয়েসের চিন্তা এই কাঁচা বয়েসেই কেন? এখনও তো ওসব ভাববার বয়েস সামনে পড়ে আছে।
একটা আগাম প্ল্যানিং থাকা ভালো, বুঝলেন। ফ্ল্যাটটা কিনতে যে-লোনটা নিতে হয়েছে, সেটা শোধ করতে এখন বেশি গায়ে লাগছে না। কিন্তু বেশি বয়েসে লোন নিলে চাপে পড়ে যেতে হয়।
তা মশার কথাটা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। তিনতলায় কি মশার উৎপাত কিছু কম?
তা হতে পারে। কিন্তু আমার ফ্ল্যাটে ওই একটিই মশা। তার কোনো সঙ্গী-সাথিও নেই। সারাদিন সে আমার জন্যই অপেক্ষা করে। আমি যেই বাথরুমে ঢুকি অমনি শুরু হয় তার খেল। ওপরে উঠে, নীচুতে নেমে, শূন্যে পাকদন্ডী তৈরি করে কত কায়দায় সে যে আমাকে অ্যাটাক করতে থাকে তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না আপনার। তাকে মারবার সবরকম চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। মশা মারবার ওষুধ স্প্রে করলে নিশ্চয়ই মরবে। তবে তার ধূর্তামি দেখে আমারও জেদ চেপেছে তাকে আমি হাত দিয়েই মারব।
আচ্ছা, আপনার মশাটা কি ব্যাচেলার বলে আপনার মনে হয়?
আসলে মশাদের তো বিয়ে হয় না, অনেক গার্লফ্রেন্ড থাকতে পারে। সেই অর্থে সব মশাই ব্যাচেলার। যদিও ছেলেপুলে হতে বাধা নেই।
হ্যাঁ, সেটা অবশ্য ঠিক কথা। পশুপাখিরা তো লিভ টুগেদারই করে।
