আমি কিছু বললাম না। নিবারণের পিঠে হাত রাখলাম। নিবারণ নিজেই বলে চললেন, ‘কুসুম চলে গেলে আমার আঁকার কী হবে!’
‘আপনি আবার আঁকছেন?’
‘না।’ মাথা নাড়লেন নিবারণ, ‘আমার আঙুলগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।’ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, ‘কিন্তু কুসুমকে আপনারা ভয় পান কেন? আমি তো দেখছি কুসুম সার্কাসে যা করত তাও একটা খেলা। ছবি আঁকা যেমন খেলা, ঠিক তেমনি। কিন্তু মুশকিল–আমরা কেউই অভ্যাস ছাড়তে পারছি না।’ বলেই হঠাৎ হা হা করে হাসলেন নিবারণ ‘কয়েকদিন আগে আমি একটা পায়রা মারলাম। তারপর ঘাড় মটকে সেটার গলার নলীর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলাম।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘মুখ দিতে প্রবৃত্তি হল না। কিন্তু দেখবেন, চেষ্টার অসাধ্য কিছু নেই।’
কয়েকদিন পর নিবারণকে বাস্তবিক দেখা গেল বনডুবির মাঠে–একপাল ছেলেপুলে ঘিরে ধরেছে তাঁক, আর মাঝখানে নিবারণ একটা আধমরা কবুতরের পালক দু’হাতে পটপট করে ছিঁড়ছেন, কাঁচা মাংসের জঙ্গলে ব্যগ্র কামড় বসাচ্ছেন। তাঁর মুখের বিস্বাদ, বমনোদ্রেক সব কিছুই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
এরপর প্রায় সব কিছুই ভক্ষণ করবার জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়লেন নিবারণ। মাঝে মাঝে জ্যান্ত পাঁঠা–ছাগল কামড়ে ধরেন, কুকুরকে তাড়া করে ফেরেন। দু’বার গাঁয়ের লোক তাঁকে বাঁশ পেটা করে আধমরা করল। লোকে নিবারণের নামের আগে ‘পাগলা’ কথাটা জুড়ে দিল।
আমার মনে হয় নিবারণ ঠিক পাগল হয়ে যাননি। কে, নন্দী সার্কাসে যখন মুরগি এবং সাপ ভক্ষণ করতেন–তখন কেউ তাঁকে পাগল বলেনি, বরং অনেক দূর থেকে পয়সা খরচ করে দেখতে গেছে। নিবারণ সম্পর্কে আমার এই মনে হয় যে তিনি তাঁর শিল্পের অভ্যাস পরিবর্তিত করতে চাইছিলেন মাত্র। মনে হয়েছিল ছবি ছেড়ে বাস্তবিক তাঁর শিল্পগুলি এইবার তাঁকে আক্রমণ করতে শুরু করেছিল। তাই শিপান্তরে যেতে চাইছিলেন মাত্র।
এর কিছুদিন পরে একদল বেদে এল আমাদের গাঁয়ে। নানারকম খেলা দেখাল, ওষুধপত্র শিকড়বাকড় বিক্রি করল। তারপর একদিন ছাউনি গুটিয়ে চলে গেল।
দু-একদিন পর নিবারণ আমার কাছে এসে বললেন, ‘আমার স্ত্রী কুসুমকে আপনি চিনতেন?’
আমি মাথা নাড়ালাম–হ্যাঁ।
হঠাৎ খিকখিক করে হেসে উঠলেন নিবারণ, বললেন, ‘কুসুমের সার্কাসের খেলাগুলো কিন্তু তেমন সাংঘাতিক কিছু ছিল না। ওর চেয়ে সাংঘাতিক খেলা আমিই আপনাকে দেখাতে পারি।’
আমি নিবারণকে দেখছিলাম–আগেকার মতোই আছেন নিবারণ। লক্ষ করলাম তিনি আর। তাঁর ডানহাতের দিকে চাইছেন না এবং তাঁর বগলে মোড়কের মধ্যে কয়েকটা ছবি রয়েছে বলে মনে হল। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী ব্যাপার?’
খিকখিক করে হাসলেন নিবারণ ‘কুসুমের সেই খেলাটার কথা বলছিলাম। সেই খেলাগুলো আমিই কুসুমকে দেখাতে শুরু করলাম। কুসুম কিন্তু ভয় পেয়ে গেল। খেলা দেখাত কুসুম, কিন্তু ওই খেলা নিজে কখনও দেখেনি সে।’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার মতোই অবস্থা হল কুসুমের। তার শিল্পও তাকে আক্রমণ শুরু করল।’
আমি চেয়ে ছিলাম। খানিকটা আন্দাজ করে বিস্মিত না হয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কে. নন্দী কোথায়?’
‘ঠিক জানি না। একদল বেদে এসেছিল লক্ষ করেছেন?’ আমি বুঝলাম। চুপ করে থেকে হঠাৎ জিগ্যেস করলাম, ‘আপনার আঙুল?’
নিবারণ উত্তর দিলেন না। আস্তে-আস্তে ছবিগুলোর মোড়ক খুলে আমার সামনে পেতে দিলেন। প্রথম ছবিটাতে ছিল দুটো ভয়ঙ্কর কালসাপ পরস্পকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি আর ছবিগুলো দেখলাম না। দেখবার দরকারও ছিল না।
বুঝলাম, পটুয়া নিবারণকে এবার ঠেকানো মুশকিল হবে। কেন না, তিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁর অস্তিত্বের অপরাংশ তাঁর শিল্পকর্মের বিদ্রোহী যাবতীয় ভয়ঙ্করতা ও হিংস্রতাকে ভক্ষণ করতে সক্ষম।
পরপুরুষ
করালী গরু খুঁজতে বেরিয়েছিল। আর তারক বেরিয়েছিল বউ খুঁজতে।
কালীপুরের হাটে সাঁঝের বেলায় দুজনে দেখা।
বাঁ-চোখে ছানি এসেছে, ভালো ঠাহর হয় না। তবু তারককে চিনতে পেরে করালী বলল , তারক নাকি?
আর বলো কেন দাদা। মাগি সকালে থেকে হাওয়া।
ঝগড়া করেছিস?
সে আর কোনদিন না হচ্ছে! আজ আবার বাগান থেকে মস্ত মানকচুটা তুলে নিয়ে বেরিয়েছে। আমি ভাবলুম কচু বেচতে যদি হাটে এসে থাকে।
বাঁধা বউ, ঠিক ফিরে যাবে। আমার তো তা নয়। গরু বলে কথা, অবোলা জীব। হাটে যদি হাতবদল হয় তো মস্ত লোকসান।
গো–হাটা ঘুরে দেখেছ?
তা আর দেখিনি! পেলুম না।
ভেবোনা। গরুও ফিরবে। চল, পরানের দোকানে বসি।
পরাণ তাড়ির কলসি সাজিয়ে বসে, একখানা বারকোশে ভাঁড় আর কাঁচের গেলাস সাজানো। আশেপাশে খদ্দেররা সব উবু হয়ে বসে ঢকঢক গিলছে। দুজনে সেখানে সেঁটে গেল।
কালীপুরের হাট একখানা হাটের মতো হাটই বটে। দশটা গাঁ যেন ভেঙে পড়ে। জিনিস যেমন সরেস দামও মোলায়েম। এই সন্ধের পরও হ্যাজাক, কারবাইড, টেমি জ্বেলে বিকিকিনি চলছে রমরম করে। হাটেবাজারে এলে মনটা ভালো থাকে তারকের। পেটে তাড়ি টাড়ি গেলে তো আরও তর হয়ে যায়। তবে কিনা বউটা সকালবেলায় পালিয়ে যাওয়ায় আজ সারাদিন হরিমটর গেছে। রান্নাটা আসে না তারকের। ছেলেবেলায় এই কালীপুরের হাটেই এক জ্যোতিষী তার মাকে বলেছিল, বাপু, তোমার ছেলের কিন্তু অগ্নিভয় আছে। আগুন থেকে সাবধানে রেখো। তাই মা তাকে গা ছুঁইয়ে বাক্যি নিয়েছিল, আগুনের কাছে যাবে না। মায়ের কথা ভাবতেই চোখটা জ্বালা করল। মা মরে গিয়ে ইস্তক কিছু ফাঁকা হয়ে গেছে যেন। দুপুরে গড়াননা বেলায় মুকুন্দর দোকানে চারটি মুড়ি–বাতাসা চিবিয়েছিল। এখন খিদেটা চাগাড় মারছে।
