‘কে কুসুম?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘কুসুম মানে–’হতচকিত হয়ে উত্তর দিলেন নিবারণ–’আমার স্ত্রী।’
‘কে. নন্দী?’
‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়লেন নিবারণ, ‘আমার সন্দেহ ছিল কাঁচা মুরগি ও সাপের মাথা খাওয়ার ভিতর কোনও শিল্প নেই; আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এখন আমার মনে হয় ধারণাটা ভুল।’
আমি কিছু না বুঝে চুপ করে রইলাম।
নিবারণ বললেন, সার্কাসে আপনারা কুসুমকে দেখেছেন, আমি দেখিনি। আমি ওর কথা শুনেছিলাম, ওকে বলা হত পিশাচ–মহিলা।’ আবার ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন নিবারণ, ‘কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন?’
‘কী?’
হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিবারণ। আর কোনও কথা বললেন না। দেখলাম উনি স্থির দৃষ্টিতে নিজের ডান হাতের দিকে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ বললেন, ‘আমি কুসুমকে বুঝবার চেষ্টা করছি।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, ‘হয়তো একটা জীবন–সময় অনেক কিছুর জন্যই যথেষ্ট নয়।’
নিবারণ কর্মকার সামান্য পটুয়া–তাঁর চিন্তায় কিছু উদ্ভট ব্যাপার ছিল–এইটুকুই আমরা জানতাম। সব মিলিয়ে মানুষটা আমাদের কাছে ছিল মজার। কিন্তু এখন কেমন সন্দেহ হল–নিবারণের গলার স্বরে, চোখের চাউনিতে অন্যরকম কিছু প্রকাশ পাচ্ছে। হঠাৎ উঠে গেলেন নিবারণ, দরজার বাইরে মুখ বার করে কী দেখে নিলেন, ফিরে এসে নিজের ডান হাতের দিকে পূর্ববৎ চেয়ে থেকে নীচু গলায় বললেন, ‘কিছুদিন আগে এক দুপুরবেলা দেখি কুসুম ছাঁচবেড়ার ওপর এসে বসা একটা মোরগের দিকে স্থির চোখে চেয়ে আছে। আমি ওকে ডাকলাম, সাড়া দিল না।’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনার কী মনে হয়?
আমি মাথা নাড়লাম–জানি না।
নিবারণ বললেন, ‘আমার মনে হয় স্বাভাবিক মানুষ যা খায়–তা খেয়ে কুসুমের তৃপ্তি হয় না। এ ব্যাপারে আপনি কিছু বলতে পারেন?
আমি আবার মাথা নাড়লাম–না। আমার গা শিউরে উঠছিল।
নিবারণ বললেন, ‘একদিন আমি ওর খেলা দেখতে চাইলাম। ও প্রথমে রাজি হল না। বলল –সার্কাসে যা দেখাত তার সবটাই ছিল কৌশল। কিন্তু আমার সন্দেহ ছিল। অবশেষে একদিন আমার সাধ্য–সাধনায় রাজি হল। গভীর রাত্রে আমার সামনে একটা কাঁচা মুরগি খেল ও। সে দৃশ্য বড় ভয়ঙ্কর।’ বললেন নিবারণ কর্মকার-তাঁর মুখচোখে ভয় ফুটে উঠছিল–যেন চোখের সামনে গভীর রাত্রে একা এক পিশাচ–মহিলার সামনে বসে থাকার সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে এখনও তাড়া করছে। একটু দম নিয়ে বললেন, ‘কল্পনা করুন ঘরের বউ যাকে খুব চিনি জানি বলে মনে হয় হঠাৎ গভীর রাতে তার চেহারা ও স্বভাব বদলে যেতে দেখলে কী মনে হয়!’
আমার কিছুই বলার ছিল না। চুপ করে রইলাম।
নিবারণ বলল , ‘কিন্তু ভেবে দেখলে এ ব্যাপারে বোধহয় ভয়ঙ্কর কিছু নেই।’ বলেই খানিকক্ষণ চিন্তা করলেন নিবারণ, তারপর প্রায় আপন মনে বললেন, ‘ছবি আঁকার সঙ্গে এর তফাত কী? আমি ভেবে দেখেছি–অভ্যাস না কৌশল না অসুখ–কোনটা?’ দীর্ঘশ্বাস ছড়ালেন নিবারণ, আবার নিজের ডান হাতের সন্দেহজনক দুটো আঙুলের দিকে চেয়ে রইলেন। হঠাৎ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয় না যে এ ব্যাপারে ওর কিছু করার নেই?’
‘কী রকম?’ আমি প্রশ্ন করি।
হাসলেন নিবারণ কর্মকার ‘যেমন ছবির ব্যাপারে আমার কিছুই করবার ছিল না। নিশি দারোগার মেয়ের ব্যাপারটা ভেবে দেখুন।’
‘দেখব।’ বললাম। কেমন সন্দেহ হল নিবারণের মাথায় কোনও অদ্ভুত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কেন না হঠাৎ এক সময়ে বললেন, ‘আমার আঙুলগুলো তো নষ্টই হয়ে যাচ্ছে’–একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কুসুমকে বলে দেখব, যদি ও আমার ছবি–আঁকার আঙুল দুটো খেয়ে ফেলতে পারে। বলেই পুরোনো ধরনের খিকখিক হাসি হাসলেন নিবারণ। হঠাৎ গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনারা কুসুমকে ভয় করেন, না?’
আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। পাগল আর কাকে বলে! যখন চলে আসি তখনও নিবারণ বিড়বিড় করে যা বলছিলেন তার অর্থ–ওঁর ছবি আঁকার আঙুলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! আমরা ভেবেছিলাম মিস কে. নন্দী দেবী চৌধুরানীর মতো প্রফুল্ল রূপান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা যা বোঝা যাচ্ছে তাতে মনে হয় কোথাও কোনও গোলমাল থেকে গেল।
এদিকে গাঁয়ের লোকেরা কে. নন্দী কিংবা নিবারণ কারুরই এই গাঁয়ে থাকা পছন্দ করছিল। তারা বলে বেড়াচ্ছিল কে, নন্দী এবার তাঁর শেষ খেলা দেখাবেন। তিনি বড়ই উচ্চাকাঙ্ক্ষাসম্পন্না মহিলা–সাপ মুরগির পর এবার তিনি আরও বড় কিছুর জন্য হাঁ করেছেন। নিবারণের বিপদ ঘনিয়ে এল বলে। মনে হচ্ছিল কে, নন্দীর সেই শেষ খেলাটা দেখার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করছে।
ছবি–আঁকা ছেড়েই দিলেন নিবারণ। ঘর থেকে বড় একটা বেরোতেন না। কিন্তু তাঁর ভিতরে যে একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে, একদিন তা প্রমাণ পাওয়া গেল। গাজনের বাজনা শুনে হঠাৎ খেপে গিয়ে ওঁর ঘর ছেড়ে বেরোলেন তিনি। ডেকে উঠলেন–হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করলেন এবং এইসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনভ্যস্ত রক্তাক্ত শরীরে অবশেষে বুড়ো শিবতলার বটগাছের নীচে লুটিয়ে পড়লেন। কে, নন্দীর সেবা–যত্নে তাঁর শরীর ক্রমশ সুস্থ হল, কিন্তু রোখ কমল না। পথে পথে ঘুরে বেড়ান আর বুড়ো বাচ্চা সকলকেই ডেকে তাঁর ডানহাতটা দেখান ‘দ্যাখো তো, আমার আঙুলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কেন?’
এই সময়ে একদিন রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কষ্টে চিনতে পারলেন আমায়। বললেন, ‘শুনেছেন কিছু? নিশি দারোগা বলে পাঠিয়েছে যে কুসুমকে ত্যাগ করতে হবে। আশ্চর্য!’
