–’আমি একবার দেখুম, মা?’
–’দূর! জলে লামলে ঠান্ডা লাগব তর। আরে, কপালে নাই ঘি, ঠক ঠকাইলে হইব কি।’ খুব ক্লান্ত সুরে মা বলে। পা দুটো জলের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে নোংরা মাটিতে হাতের ওপর শরীরের ভার রেখে মাথাটা ডান কাঁধে কাত করে দিয়ে মা বলে। মাথার চুলগুলো একদিকে সরানো। মা’র সরু ঘাড় আর ঘাড়ের ওপর তিনটে ঢিবির মতো উঁচু হাড় দেখতে পায় টুনু। মার জন্য কেন যেন ভীষণ কষ্ট হয় তার।
–’মা’–টুনু মা’র খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে মার পাশেই উবু হয়ে বসে চাপা গায় বলে –’পরাণ মাঝিরে ডাকুম একবার?
–’কী হইব হ্যারে ডাইক্যা?
–’একবার খুইজ্যা দেখব।’
–’পয়সা নিব না? তখন পয়সা পামু কই?’
একটু চিন্তা করে টুনু। বলে–’বেশি লাগব না। দুলটা যদি পাওন যায়–’
–’হু, দে একবার খবর। বেশি জানাজানি হইলে কিন্তু আমার কপালে কষ্ট আছে।’ মা খুব আস্তে-আস্তে বলে। জল থেকে পা দুটো টেনে আনে মা। পা দুটো ভেজা, পায়ের পাতার নীচের দিয়ে বলে–’একবার ধর তো আমারে টুনু। শরীলটা য্যান কাঁপে আমার।’
টুনু মা’কে ধরে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না মা। পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। মাথাটা নুয়ে পড়েছে সামনের দিকে।
–’ওয়াক’–হিক্কা ওঠে মা’র। টুনু মাকে জড়িয়ে থেকে টের পায় যে মার শরীরের ভিতরটা গুরগুর করে কাঁপছে। মা’কে শক্ত করে ধরে থাকে সে। মাথার ভেজা চুলগুলো সামনের দিকে দড়ির মতো দুলছে। মুখটা সাদা।
আর একবার হিক্কা তোলে মা। খানিকটা হলুদ জল বেরোয় মুখ দিয়ে। তারপর মা হাঁফাতে থাকে। টুনু চিৎকার করে–’কীগো মা কী হইছে তোমার?
মা এবার তার কাঁধে ভয় দেয়–‘কিছু না, কিছু হয় নাই। সারাদিন খাই নাই তো কিছু। পিত্তি পড়ছে। গিয়া একটু শুইয়া থাকলেই সারব।’
–’হ তোমারও মাথা খারাপ। এই শরীল লইয়া কেউ জলে ডুবায়?’ টুনু বলে। তার চিৎকার করে কাঁদছে ইচ্ছে হয় যেন।
–‘কিন্তু দুলটা’–হাঁফাতে হাঁফাতেই বলে–’আমার বিয়ার দুল। তর বাবায় দিছিল। বড় শখের দুল রে! সব তো গেছে। এই দুলজোড়া আছিল।’ মা কাঁদতে থাকে, আর হাঁফাতে থাকে আর কাঁপতে থাকে।
টুনু ধমক দেয়–’কান্দনের কী হইছে। বাবায় ট্যার পাওনের আগেই দুল পাইয়া যাইবা। অখন গিয়া শুইয়া থাক। আমি পরাণ মাঝিরে একবার খবর দেই।’
মা’কে ধরে খুব সাবধানে আস্তে-আস্তে চলতে থাকে টুনু। মা’র গা থেকে ভিজে জলের আর বমির কটু গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। একটু গা ঘিনঘিন করে তার।
উঠোনের আগলটা হাত বাড়িয়ে ধরে মা বলে–’তুই এইবার মাঝির কাছে যা। আমি একলাই ঘরে যাইতে পারুম।’ তারপর ঘরের দিকে তাকিয়ে দুর্বল স্বরটায় যতদূর সম্ভব জোর দিয়ে মা ডাকে–’বুলকিরে, পানুরে, এদিকে আইয়া ধর দেখি আমারে একটু।’
টুনু বলে–’শয়তান দুইটা পাড়া বেড়াইতে বাইর হইছে বোধ হয়।‘
মাকে ধরে মাটি লেপা দাওয়ায় বসিয়ে রেখে টুনু বলে–’ঘরে গিয়া শুইয়া থাক, আমি পরাণ মাঝিরে খবর দেই।’
.
পরাণ মাঝি পুকুর থেকে চোখ ঘুরিয়ে টুনুর দিকে তাকাল। একটু হেসে বলল –’না কর্তা, আট আনায় হইব না। পুরা একখানা ট্যাহা দিলে লামতে পারি জলে।’
–’ক্যান মাঝি, জল দেইখ্যা ভয় পাইলা নাকি?’ মনে-মনে যেন একটু রাগ করেই বলে টুনু। দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড চেহারা নিয়ে লোকটা হাসছে।
–’ভয়? কত পদ্মা ম্যাঘনা পার হইলাম কর্তা, অখন হালার পুর্ণীরে ভয়! দিয়েন কর্তা, বারো আনাই দিয়েন।’
পরাণ মাঝি মাথার গামছাটা খুলে কোমরে জড়াল। এবার খালি মাথাটা দেখতে পেল টুনু। চুলগুলো প্রায় সাদা হয়ে এসেছে, গালের খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোও সাদায় কালোয় মেশান। শরীরটা মস্ত বড় পরাণ মাঝির, কিন্তু চামড়াটা ঢিলে, কোঁচকান। খাটো একটা কাপড় আঁট করে। পরা। পায়ের অনেকটা দেখা যাচ্ছে! কেঁচোর মতো শিরাবহুল মোটা গোঁড়ালি। পাগুলো সরু সরু।
খুব আস্তে-আস্তে জলটাকে একটুও ঘোলা না করে মাঝি জলে নামতে লাগল। গলাজলে দাঁড়াল মাঝি। এক আঁটি বিচালির মতো সাদা মাথাটা জলে ভাসছে।
টুনু দেখে মাঝির কালো লম্বা শরীরটা প্রকাণ্ড একটা বোয়াল মাছের মতো নড়ছে জলের নীচে।
হুস করে ডুব দেয় মাঝি। অনেকক্ষণ পর ভেসে ওঠে। টুনুর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে। অর্থাৎ পাওয়া যায়নি। মুখ থেকে খানিকটা জল ‘পিড়িক’ করে ছুঁড়ে দিয়ে আবার ডুব দেয় মাঝি। দুপুরের কড়া রোদে সবুজ, ঘন জলের নীচে অনেক নীচে একটা প্রকাণ্ড মাছের মতো পরাণ মাঝির শরীরটা নেমে যেতে থাকে। তারপর তাকে আর দেখতে পায় না টুনু।
পরাণ মাঝিকে কুশলী ডুবুরির মতো লাগে টুনুর। সে সব ডুবুরি (সে বইতে পড়েছে) একটুও ভয় না করে সমুদ্রের জলে ডুব দিয়ে ঝিনুক তুলে আনে। সেই ঝিনুকের ভিতরে মুক্তো। মুক্তো দেখেনি টুনু, ডুবুরিও না। পরাণ মাঝিকে দেখে শুধু ডুবুরির কথা মনে হয়।
পরাণ মাঝির মাথাটা এবার প্রায় মাঝ–পুকুরে ভেসে ওঠে। হাতের মুঠো থেকে খানিকটা কাঁদা ছুঁড়ে ফেলে পরাণ মাঝি আবার ডুব দেয়। সেই ছুঁড়ে দেওয়া কাদার মধ্যে কয়েকটা শামুক।
এবার পাড়ের কাছে মুখ তোলে মাঝি। ভীষণভাবে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলে–’না কর্তা, ঠিক কুনখানে পড়ছে হেইরে না জানলে হইব না।’
টুনু মনে-মনে ভয় পায়। ব্যস্ত হয়ে বলে–’এইখানেই পড়ছে। তুমি আর একটু খুইজ্যা দ্যাখো। ছানের সময় বেশি দূরে যায় নাই মা।’
