–’না, শুনব না। আরা অখনও পাকঘরে। খাইত্যাছে।’
–’শয়তান দুইটা। শুনলেই বাপের কানে লইয়া তুলব।’
বাবার ভয়ে মা সিঁটিয়ে যাচ্ছে যেন। মার চোখের পাতাগুলো পড়ছেই না। টুনু চুপ করে থাকে।
বাবাকে সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে। চারদিকের সবকিছুর ওপর বাবা যেন সবসময়ে খেপে আছে। টুনু একবারের বেশি দুবার ভাত চাইলেই বাবা চিৎকার করতে থাকে–’হ, সোয়াস্যার গিল্যা খাসি হইতাছ; ল্যাখাপড়ার নামে তো লবডঙ্কা! যাগো ল্যাখন পড়ন হয়, তারা স্যার–সোয়াস্যার চাউলের আহার করে না।’ কিংবা কখনও কেউ কোনও জিনিস ভেঙে ফেললে বাবা বলে—’কিরে বাসি, ঠাকুরদার জমিদারির জিনিস পাইছ নাকি নিব্বইংশো পোড়ারমুখো–’
বাবার রুদ্র মূর্তির কথা মনে পড়তেই টুনু শিউরে উঠল। আস্তে-আস্তে বলল –’আর একবার খুইজ্যা দ্যাখবা না?’
মা বলে–’হ, আর একবার খুজুম। তুইও চ’ দেখি আমার লগে।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বলে–’ঘাটে কেউ নাই অখন। একলা ডুব দিতে ডর করে।’
টুনু মনে-মনে হাসে। মা সাঁতার জানে, কিন্তু ডুব দিতে মার ভীষণ ভয়।
.
ঠিক দুপুর। নিস্তরঙ্গ সবুজ জল। কয়েকটা শুকনো পাতা জলের ওপর ভাসছে। খুব নির্জন চারদিকে। কেউ কোথাও নেই।
টুনু বলে–’কোনখানে?’
কাটা সুপুরিগাছ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে পা দিয়ে মা ইতস্তত করে। চারদিকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়।
টুনু আবার বলে–’কোনখানে মা?’
মাঝখানের জলটা সবুজ, আর ঘাটের কাছে ঘোলা। কেউ বাসন মেজে গেছে সেই ছোবড়াগুলো ছাই–কাদার মধ্যে পুকুরপাড়ে পড়ে আছে। কেমন যেন আঁশটে গন্ধ।
ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে মা বলে–’এইখানেই পড়ছে। কিন্তু–’
আঁশটে গন্ধটা এড়াবার জন্যেই টুনু ঘাটের কাছ থেকে সরে এসে টেকির শাক আর কচুর জঙ্গলের ধার ঘেঁষে দাঁড়াল।
মা ঠিক কোমরজলে দাঁড়িয়ে আছে। পা ঘষে–ঘষে খুঁজছে দুলটাকে। টুনু তাকিয়ে রইল। মা আর একধাপ নামল। জলের দিকে নিবিষ্টভাবে তাকিয়ে আছে মা। কিন্তু জলটা ঘোলা। কিছু দেখতে পাচ্ছে না মা।
–’এমনিই কপাল! দুল কি পাওন যাইব! তিন আনি আর তিন আনি–এই ছয় আনি সোনাই আছিল ঘরে। পোড়ার কপালে ছয় আনির তিন আনি গেল।’ ঠিক গলাজলে দাঁড়িয়ে মা বলে –’ইচ্ছা করে বাকি তিন আনিও উদ্দা মাইরা ফ্যালাইয়া দেই।’
কচুগাছের পাতা হাওয়ায় দুলে টুনুর পায়ে লাগে। কেমন সুড়সুড় করে যেন। খুব তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মাকে দেখে টুনু। জলগুলো গোল চাকতির মতো মার চারদিকে, বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। মা’র কথাটা একটুকরো কাঠের মতো জলের ওপর ভাসছে।
মার থুতনির কাছে জল এখন।
হঠাৎ মা চিৎকার করে–’এই যে, কী জানি একটা পায়ে লাগল রে!’
মা ডুব দেয়। ছলাৎ করে খানিকটা সবুজ জল ফেনা তুলে সরে যায়। টুনু একলাফে ঘাটের কাছে এগোয়। জলের ঠিক ওপরের ধাপে কুঁজো হয়ে হাঁটুতে হাতের ভর দিয়ে তাকিয়ে দেখে মার সাদা শাড়িটা সবুজ জলের ভিতরে মাছের মতো ডুবে যাচ্ছে। টুনু দম বন্ধ করে থাকে।
কিছুক্ষণ জলটা অল্প ঢেউ তুলল। টুনু তাকিয়ে রইল।
হুস করে মাথা তুলল মা! মুঠোকরা হাতটা জলের ওপর তুলে আঙুলগুলো আলগা করে দিল। মার হাতের চেটোয় ছোট্ট একটা লোহার।
হাসি পায় টুনুর, কিন্তু হাসে না।
মা’র মুখটা এখন আরও সাদা, ঠোঁট দুটো চেপে লেগে আছে। মা জোরে–জোরে নিশ্বাস ফেলছে এখন।
স্ক্রুটা খুব জোরে আরও গভীর জলের দিকে ছুঁড়ে দেয় মা। ক্লান্ত সরে বলে–’দ্যাখ তো বুলকি আর পানু এদিকে আছে নাকি? আইলে কইস কিন্তু। আমি আর একটু খুঁজি।’
–’আইচ্ছা’ জবাব দেয় টুনু। চারদিকে তাকিয়ে দেখে কেউ কোথাও নেই।
মার সরু রোগা দেহটা আরও গভীর জলের দিকে সরে যাচ্ছে ঢেউ তুলে। ডিঙি নৌকোর মতো স্বচ্ছন্দ গতি, দুপাশে সরু রেখার মতো ঢেউ তুলে জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। জোড়া হাতে আর পায়ের আঘাতে জলে ছপছপ শব্দ হচ্ছে আর ঢেউ উঠছে জলে। পায়ের কাছে দুটো ট্যাংরা মাছ মুখ তুলল। টুপ করে ডুবে গেল আবার।
–’আর দূরে যাইও না, মা।’ টুনু চিৎকার করে বলে। ভয় করে তার।
–’আরে ডরস ক্যানে।’ গাঙপারের মাইয়া আমি, এত সহজে ডুবুম না।’ মা বলে। জলের ওপর দিয়ে তার গলার স্বরটা কাঁপতে কাঁপতে এল। খুব ক্লান্ত স্বর। জলের জন্যেই বোধহয় ঠিক কাঁসির মতো শব্দ হল।
পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে টুনু দেখে মা টুপ করে ডুবে গেল। জলের নীচে এখন আর মাকে দেখা যাচ্ছে না। তবু টুনু চোখ দুটো স্থির করে পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল। দুপুরের রোদ ওপারে নারকোল গাছের পাতায় লেগে ঝিকমিক করছে।
চোখ দুটো করকর করে তার। চোখে জল আসে। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ ঘষে টুনু তারপর আবার তাকায়।
এবার প্রথমে মা’র হাতদুটো সরু দুটো কাঠির মতো জলের ওপর ভেসে উঠল। তারপর মাকে দেখা গেল। টুনু নিশ্বাস ফেলে নড়ে চড়ে দাঁড়ায়।
মা চিৎ করে পা দিয়ে জল কাটে। চিৎ সাঁতার দিয়ে পাড়ের দিকে এগোতে থাকে। টুনু বুঝতে পারে যে, মা আর দম পাচ্ছে না।
পাড়ে এসে কাদার মধ্যে সুপুরিগাছ আর বাঁশের সিঁড়িতে বসে হাঁফাতে থাকে মা। দুটো হাত দিয়ে ভর দেয় ছাইমাখা ছোবড়া ছড়িয়ে থাকা নোংরা জায়গাটায়। শাড়িটা কাদায় মাখামাখি।
–’আর পারি না।’ ভীষণভাবে হাঁফাতে-হাঁফাতে মা বলে–দম পাই না আর। পোড়া কপাইল্যা দুল! শরীলটায় পিছা মারে।’
