এরপরে এদেশে আসে পারস্যের তুর্কিস্তান থেকে শকেরা। এরাও আমাদের রক্তে মিশে যায়। এভাবে নানা আকারের বিভিন্ন রঙের মানুষের মিলনের ফল আমরা। শকদের পরেও বাঙালির রক্তে মিশেছে আরো অনেক রক্ত। বিদেশ থেকে এসেছে বিভিন্ন সময়ে বিজয়ীরা;—এদেশ শাসন করেছে, এখানে বিয়ে করেছে, বাঙালিদের মধ্যে মিশে গেছে। এসেছে মানুষ আরব থেকে, পারস্য থেকে, এসেছে আরো বহু দেশ থেকে। তারাও আমাদের মধ্যে আছে।
বাঙালি মুসলমানেরা কিন্তু প্রকৃতই বাঙালি। একালে বাঙালিদের মধ্যে কেউ কেউ নিরর্থক গর্ব করতো যে তারা এদেশের নয়, তারা অমলিন মরুভূ আরবের। আমাদের মাঝে আরব রক্ত কিছুটা থাকতে পারে, কিন্তু আমরা এ-দেশেরই। আমরা আবহমানকাল ধরে বাঙালি। এদেশে মুসলমানদের আগমনের পরে, অনেকটা ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরে, এদেশের দরিদ্ররা, নিম্নবর্ণের লোকেরা, উৎপীড়িত বৌদ্ধরা মুসলমান হতে থাকে। কেননা মুসলমানরা সে-সময়ে এসেছে বিজয়ীর বেশে। অনেকে বিজয়ী শক্তির মোহে, অনেকে ধর্মের মোহে এবং অধিকাংশ দারিদ্র ও অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্যে মুসলমান হয়েছে। এরা জাতিতে বাঙালি আর ধর্মে মুসলমান, যেমন আমরা। আমাদের প্রধান পরিচয় আমরা বাঙালি।
তবে বহুদিন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কখনো ঠাণ্ডা, কখনো উত্তপ্ত লড়াই চলেছে নিজেদের জাতিত্ব নিয়ে। মুসলমানদের একদল, যারা কোনো রকমে অর্থ ও মর্যাদা লাভ করতে পেরেছিলো, তারা গর্ব করতে ভালোবাসতো এ বলে যে তারা এদেশের নয়, তারা আরবইরানের। এরা ছিলো অনেকটা গৃহহীনের মতে, বাস করতো এদেশে, খেতো এদেশের মাছভাত, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আরবইরানের। আরো একটি দল ছিলো, যারা অর্থ লাভ করতে পারে নি, সমাজের মাতব্বর হতে চায় নি, তারা নিজেদের দাবি করে এসেছে বাঙলার বাঙালি বলে। এ-দু-দলের বিরোধ অনেক দিন ছিলো, এয়োদশ শতক থেকে এই সেদিন পর্যন্ত এ-বিরোধে বাঙালি মুসলমানেরা সময় কাটিয়েছে। এজন্যে মধ্যযুগের এক মহৎ কবি রেগে গিয়ে বলেছিলেন, যারা বাঙলায় জন্মে বাঙলা ভাষাকে ঘৃণা করে তারা কেননা এদেশ ছেড়ে চলে যায় না? তারা চলে যাক। এ-কবির নাম আবদুল হাকিম। আমরা আজ এ-সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছি, আমরা বাঙালি, বাঙলা আমাদের ভাষা, বাঙলাদেশ আমাদের দেশ।
বাঙলা ভাষা কোথা থেকে এলো? অন্য সকল কিছুর মতো ভাষাও জন্ম নেয়, বিকশিত হয়, কালে কালে রূপ বদলায়। আজ যে-বাঙলা ভাষায় আমরা কথা বলি, কবিতা লিখি, গান গাই, অনেক আগে এ-ভাষা এরকম ছিলো না। বাঙলা ভাষার প্রথম বই চর্যাপদ আমরা অনেকে পড়তেও পারবো না, অর্থ তো একবিন্দুও বুঝবো না। কেননা হাজার বছর আগে যখন বাঙলা ভাষার জন্ম হচ্ছিলো, তখন তা ছিলো আধোগঠিত। তার ব্যবহৃত শব্দগুলো ছিলো অত্যন্ত পুরোনো, যার অনেক শব্দ আজ আর কেউ ব্যবহার করে না। সেভাষার বানানও আজকের মতো নয়। কিন্তু চর্যাপদ-এ যে-বাঙলা ভাষা সৃষ্টি হয় তাতো একদিনে হয় নি, হঠাৎ বাঙলা ভাষা সৃষ্টি হয়ে এসে কবিদের বলে নি, ‘আমাকে দিয়ে কবিতা লেখো।’ বাঙলা ভাষা আরো একটি পুরোনো ভাষার ক্রমবদলের ফল। ওই পুরোনো ভাষাটির নাম ‘প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা।’ এ-প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা মানুষের মুখে মুখে বদলে পরিণত হয়েছে বাঙলা ভাষায়।
ভাষা বদলায় মানুষের কণ্ঠে। সব মানুষ এক রকম উচ্চারণ করে না, কঠিন শব্দ মানুষ সহজ করে উচ্চারণ করতে চায়। এর ফলে পঞ্চাশ কি একশো বা তার চেয়েও বেশি সময় পরে দেখা যায়, ওই ভাষার অনেক শব্দের উচ্চারণ বদলে গেছে, বানান বদলে গেছে। দেখা যায় কোনো ভাষায় একশো বছর আগে যে-সব শব্দ ব্যবহৃত হতো, সেগুলোর আর ব্যবহার হচ্ছে না। তার বদলে মহাসমারোহে রাজত্ব বসিয়েছে নতুন নতুন শব্দ। এভাবে ভাষা বদলে যায়; এক ভাষার বুক থেকে জন্ম নেয় নতুন এক ভাষা, যার কথা বেশ আগে ভাবাও যেতো না। কিছু শব্দের বদল দেখা যাক। চন্দ্র একটি প্রাচীন ভারতীয় আর্য বা সংস্কৃত শব্দ। শব্দটি সুন্দর, মনোরম; কিন্তু উচ্চারণ করতে বেশ কষ্ট হয়। মানুষ ক্রমে এর। উচ্চারণ করতে লাগলো ‘চন্দ’। ‘র’ ফলা বাদ গেলো, উচ্চারণ সহজ হয়ে উঠলো। এরকম চললো অনেক বছর। পরে একদা নাসিক্যধ্বনি ‘ন’-ও বাদ পড়লো, এবং ‘চ’-এর গায়ে লাগলো আনুনাসিক আ-কার। এভাবে চন্দ্র হয়ে উঠলো ‘চাঁদ’। এভাবে কর্ণ’ হয়ে গেলো ‘কন্ন’, এবং তার পরে হয়ে উঠলো ‘কান’। আরো কিছু শব্দের বদল দেখা যাক :
শব্দটি প্রথমে ছিল | তারপর হয় | আর আজ |
হস্ত | হত্থ, হাথ | হাত |
বংশী | বংসী | বাঁশী, বাঁশি |
বধূ | বহু | বউ |
আলোক | আলোঅ | আলো |
নৃত্য | ণচ্চ | নাচ |
ভাষা এভাবে বদলে যায়। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা দিনে দিনে বদলে এক সময় হয়ে ওঠে বাঙলা ভাষা। ভাষা বদলের কিন্তু নিয়ম রয়েছে; খামখেয়ালে ভাষা বদলায় না। ভাষা মেনে চলে কতকগুলো নিয়মকানুন। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা একদিন পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় ‘পালি’ নামক এক ভাষায়। পালি ভাষায় বৌদ্ধরা তাদের ধর্মগ্রন্থ ও অন্যান্য নানা রকমের বই লিখেছে। পালি ভাষা ক্রমে আরো পরিবর্তিত হয়; তার উচ্চারণ আরো সহজ সরল রূপ নেয়, এবং জন্ম নেয় ‘প্রাকৃত ভাষা’। এ-বদল একদিনে হয় নি, প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় লেগেছে এর জন্যে। প্রাকৃত ভাষা আবার বদলাতে থাকে, অনেক দিন ধরে বদলায়। তারপর দশম শতকের মাঝভাগে এসে এ-প্রাকৃত ভাষার আরো বদলানো একটি রূপ থেকে উদ্ভূত হয় একটি নতুন ভাষা, যার নাম বাঙলা। এ-ভাষা আমাদের।