বহুদিন গেল । নিরুপমা লোকের উপর লোক পাঠায় কিন্তু বাপের দেখা পায় না । অবশেষে অভিমান করিয়া লোক পাঠানো বন্ধ করিল — তখন রামসুন্দরের মনে বড়ো আঘাত লাগিল , কিন্তু তবু গেলেন না ।
আশ্বিন মাস আসিল । রামসুন্দর বলিলেন , ‘ এবার পূজার সময় মাকে ঘরে আনিবই , নহিলে আমি —’ খুব একটা শক্ত রকম শপথ করিলেন ।
পঞ্চমী কি ষষ্ঠীর দিনে আবার চাদরের প্রান্তে গুটিকতক নোট বাঁধিয়া রামসুন্দর যাত্রার উদ্যোগ করিলেন । পাঁচ বৎসরের এক নাতি আসিয়া বলিল , “ দাদা , আমার জন্যে গাড়ি কিনতে যাচ্ছিস ? ” বহুদিন হইতে তাহার ঠেলাগাড়িতে চড়িয়া হাওয়া খাইবার শখ হইয়াছে , কিন্তু কিছুতেই তাহা মিটিবার উপায় হইতেছে না । ছয় বৎসরের এক নাতিনী আসিয়া সরোদনে কহিল , পূজার নিমন্ত্রণে যাইবার মতো তাহার একখানিও ভালো কাপড় নাই ।
রামসুন্দর তাহা জানিতেন , এবং সে সম্বন্ধে তামাক খাইতে খাইতে বৃদ্ধ অনেক চিন্তা করিয়াছেন । রায়বাহাদুরের বাড়ি যখন পূজার নিমন্ত্রণ হইবে তখন তাঁহার বধূগণকে অতি যৎসমান্য অলংকারে অনুগ্রহপাত্র দরিদ্রের মতো যাইতে হইবে , এ কথা স্মরণ করিয়া তিনি অনেক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়াছেন ; কিন্তু তাহাতে তাঁহার ললাটের বার্ধক্যরেখা গভীরতর অঙ্কিত হওয়া ছাড়া আর-কোনো ফল হয় নাই ।
দৈন্যপীড়িত গৃহের ক্রন্দনধ্বনি কানে লইয়া বৃদ্ধ তাঁহার বেহাইবাড়িতে প্রবেশ করিলেন । আজ তাঁহার সে সংকোচভাব নাই ; দ্বাররক্ষী এবং ভৃত্যদের মুখের প্রতি সে চকিত সলজ্জ দৃষ্টিপাত দূর হইয়া গিয়াছে , যেন আপনার গৃহে প্রবেশ করিলেন । শুনিলেন , রায়বাহাদুর ঘরে নাই , কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইবে । মনের উচ্ছ্বাস সংবরণ করিতে না পারিয়া রামসুন্দর কন্যার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন । আনন্দে দুই চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল । বাপও কাঁদে, মেয়েও কাঁদে ; দুইজনে কেহ আর কথা কহিতে পারে না । এমন করিয়া কিছুক্ষণ গেল । তার পরে রামসুন্দর কহিলেন , “ এবার তোকে নিয়ে যাচ্ছি মা । আর কোনো গোল নাই । ”
এমন সময়ে রামসুন্দরের জ্যেষ্ঠপুত্র হরমোহন তাঁহার দুটি ছোটো ছেলে সঙ্গে লইয়া সহসা ঘরে প্রবেশ করিলেন । পিতাকে বলিলেন , “ বাবা , আমাদের তবে এবার পথে ভাসালে ? ”
রামসুন্দর সহসা অগ্নিমূর্তি হইয়া বলিলেন , “ তোদের জন্য কি আমি নরকগামী হব । আমাকে তোরা আমার সত্য পালন করতে দিবি নে ? ” রামসুন্দর বাড়ি বিক্রয় করিয়া বসিয়া আছেন ; ছেলেরা কিছুতে না জানিতে পায় , তাহার অনেক ব্যবস্থা করিয়াছিলেন , কিন্তু তবু তাহারা জানিয়াছে দেখিয়া তাহাদের প্রতি হঠাৎ অত্যন্ত রুষ্ট ও বিরক্ত হইয়া উঠিলেন ।
তাঁহার নাতি তাঁহার দুই হাঁটু সবলে জড়াইয়া ধরিয়া মুখ তুলিয়া কহিল , “ দাদা আমাকে গাড়ি কিনে দিলে না ? ”
নতশির রামসুন্দরের কাছে বালক কোনো উত্তর না পাইয়া নিরুর কাছে গিয়া কহিল , “ পিসিমা , আমাকে একখানা গাড়ি কিনে দেবে ? ”
নিরুপমা সমস্ত ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া কহিল , “ বাবা , তুমি যদি আর এক পয়সা আমার শ্বশুরকে দাও তা হলে আর তোমার মেয়েকে দেখতে পাবে না , এই তোমার গা ছুঁয়ে বললুম । ”
রামসুন্দর বলিলেন , “ ছি মা , অমন কথা বলতে নেই । আর, এ টাকাটা যদি আমি না দিতে পারি তা হলে তোর বাপের অপমান, আর তোরও অপমান । ”
নিরু কহিল , “ টাকা যদি দাও তবেই অপমান । তোমার মেয়ের কি কোনো মর্যাদা নেই । আমি কি কেবল একটা টাকার থলি , যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম। না বাবা , এ টাকা দিয়ে তুমি আমাকে অপমান কোরো না । তা ছাড়া আমার স্বামী তো এ টাকা চান না । ”
রামসুন্দর কহিলেন , “ তা হলে তোমাকে যেতে দেবে না , মা । ”
নিরুপমা কহিল , “ না দেয় তো কী করবে বলো । তুমিও আর নিয়ে যেতে চেয়ো না । ”
রামসুন্দর কম্পিত হস্তে নোটবাঁধা চাদরটি কাঁধে তুলিয়া আবার চোরের মতো সকলের দৃষ্টি এড়াইয়া বাড়ি ফিরিয়া গেলেন ।
কিন্তু রামসুন্দর এই-যে টাকা আনিয়াছিলেন এবং কন্যার নিষেধে সে টাকা না দিয়াই চলিয়া গিয়াছেন , সে কথা গোপন রহিল না । কোনো স্বভাবকৌতূহলী দ্বারলগ্নকর্ণ দাসী নিরুর শাশুড়িকে এই খবর দিল । শুনিয়া তাঁহার আর আক্রোশের সীমা রহিল না ।
নিরুপমার পক্ষে তাহার শ্বশুরবাড়ি শরশয্যা হইয়া উঠিল । এ দিকে তাহার স্বামী বিবাহের অল্পদিন পরেই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হইয়া দেশান্তরে চলিয়া গিয়াছে; এবং পাছে সংসর্গদোষে হীনতা শিক্ষা হয় এই ওজরে সম্প্রতি বাপের বাড়ির আত্মীয়দের সহিত নিরুর সাক্ষাৎকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হইয়াছে ।
এই সময়ে নিরুর একটা গুরুতর পীড়া হইল । কিন্তু সেজন্য তাহার শাশুড়িকে সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া যায় না । শরীরের প্রতি সে অত্যন্ত অবহেলা করিত । কার্তিক মাসের হিমের সময় সমস্ত রাত মাথার দরজা খোলা , শীতের সময় গায়ে কাপড় নাই । আহারের নিয়ম নাই । দাসীরা যখন মাঝে মাঝে খাবার আনিতে ভুলিয়া যাইত তখন যে তাহাদের একবার মুখ খুলিয়া স্মরণ করাইয়া দেওয়া , তাহাও সে করিত না । সে-যে পরের ঘরের দাসদাসী এবং কর্তাগৃহিণীদের অনুগ্রহের উপর নির্ভর করিয়া বাস করিতেছে , এই সংস্কার তাহার মনে বদ্ধমূল হইতেছিল । কিন্তু এরূপ ভাবটাও শাশুড়ির সহ্য হইত না । যদি আহারের প্রতি বধূর কোনো অবহেলা দেখিতেন তবে শাশুড়ি বলিতেন , “ নবাবের বাড়ির মেয়ে কিনা। গরিবের ঘরের অন্ন ওঁর মুখে রোচে না । ” কখনো-বা বলিতেন , “ দেখো-না একবার , ছিরি হচ্ছে দেখো-না , দিনে দিনে যেন পোড়াকাঠ হয়ে যাচ্ছে । ”
