কুটুম্বগৃহে এমন করিয়া আর অপমান তো সহা যায় না । রামসুন্দর স্থির করিলেন যেমন করিয়া হউক টাকাটা শোধ করিয়া দিতে হইবে ।
কিন্তু যে ঋণভার কাঁধে চাপিয়াছে তাহারই ভার সামলানো দুঃসাধ্য । খরচপত্রের অত্যন্ত টানাটানি পড়িয়াছে; এবং পাওনাদারদের দৃষ্টিপথ এড়াইবার জন্য সর্বদাই নানারূপ হীন কৌশল অবলম্বন করিতে হইতেছে ।
এ দিকে শ্বশুরবাড়ি উঠিতে বসিতে মেয়েকে খোঁটা লাগাইতেছে । পিতৃগৃহের নিন্দা শুনিয়া ঘরে দ্বার দিয়া অশ্রুবিসর্জন তাহার নিত্যক্রিয়ার মধ্যে দাঁড়াইয়াছে ।
বিশেষত শাশুড়ির আক্রোশ আর কিছুতেই মেটে না । যদি কেহ বলে , “ আহা , কী শ্রী । বউয়ের মুখখানি দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায় । ” শাশুড়ি ঝংকার দিয়া উঠিয়া বলে , “ শ্রী তো ভারি । যেমন ঘরের মেয়ে তেমনি শ্রী । ”
এমন-কি , বউয়ের খাওয়াপরারও যত্ন হয় না । যদি কোনো দয়াপরতন্ত্র প্রতিবেশিনী কোনো ত্রুটির উল্লেখ করে , শাশুড়ি বলে , “ ঐ ঢের হয়েছে । ” অর্থাৎ বাপ যদি পুরা দাম দিত তো মেয়ে পুরা যত্ন পাইত । সকলেই এমন ভাব দেখায় যেন বধূর এখানে কোনো অধিকার নাই , ফাঁকি দিয়া প্রবেশ করিয়াছে ।
বোধ হয় কন্যার এই-সকল অনাদর এবং অপমানের কথা বাপের কানে গিয়া থাকিবে । তাই রামসুন্দর অবশেষে বসতবাড়ি বিক্রয়ের চেষ্টা করিতে লাগিলেন ।
কিন্তু ছেলেদের যে গৃহহীন করিতে বসিয়াছেন সে কথা তাহাদের নিকট হইতে গোপেনে রাখিলেন । স্থির করিয়াছিলেন , বাড়ি বিক্রয় করিয়া সেই বাড়িই ভাড়া লইয়া বাস করিবেন ; এমন কৌশলে চলিবেন যে , তাঁহার মৃত্যুর পূর্বে এ কথা ছেলেরা জানিতে পারিবে না ।
কিন্তু ছেলেরা জানিতে পারিল । সকলে আসিয়া কাঁদিয়া পড়িল । বিশেষত বড়ো তিনটি ছেলে বিবাহিত এবং তাহাদের কাহারো-বা সন্তান আছে । তাহাদের আপত্তি অত্যন্ত গুরুতর হইয়া দাঁড়াইল , বাড়ি বিক্রয় স্থগিত হইল ।
তখন রামসুন্দর নানা স্থান হইতে বিস্তর সুদে অল্প অল্প করিয়া টাকা ধার করিতে লাগিলেন । এমন হইল যে , সংসারের খরচ আর চলে না ।
নিরু বাপের মুখ দেখিয়া সব বুঝিতে পারিল । বৃদ্ধের পক্ক কেশে, শুষ্ক মুখে এবং সদাসংকুচিত ভাবে দৈন্য এবং দুশ্চিন্তা প্রকাশ হইয়া পড়িল । মেয়ের কাছে যখন বাপ অপরাধী তখন সে অপরাধের অনুতাপ কি আর গোপন রাখা যায় । রামসুন্দর যখন বেহাইবাড়ির অনুমতিক্রমে ক্ষণকালের জন্য কন্যার সাক্ষাৎলাভ করিতেন তখন বাপের বুক যে কেমন করিয়া ফাটে, তাহা তাঁহার হাসি দেখিলেই টের পাওয়া যাইত ।
সেই ব্যথিত পিতৃহৃদয়কে সান্ত্বনা দিবার উদ্দেশে দিনকতক বাপের বাড়ি যাইবার জন্য নিরু নিতান্ত অধীর হইয়া উঠিয়াছে । বাপের ম্লান মুখ দেখিয়া সে আর দূরে থাকিতে পারে না । একদিন রামসুন্দরকে কহিল , “ বাবা , আমাকে একবার বাড়ি লইয়া যাও । ” রামসুন্দর বলিলেন , “ আচ্ছা । ”
কিন্তু তাঁহার কোনো জোর নাই — নিজের কন্যার উপরে পিতার যে স্বাভাবিক অধিকার আছে, তাহা যেন পণের টাকার পরিবর্তে বন্ধক রাখিতে হইয়াছে । এমন-কি , কন্যার দর্শন সেও অতি সসংকোচে ভিক্ষা চাহিতে হয় এবং সময়বিশেষে নিরাশ হইলে দ্বিতীয় কথাটি কহিবার মুখ থাকে না ।
কিন্তু মেয়ে আপনি বাড়ি আসিতে চাহিলে বাপ তাহাকে না আনিয়া কেমন করিয়া থাকে। তাই , বেহাইয়ের নিকট সে সম্বন্ধে দরখাস্ত পেশ করিবার পূর্বে রামসুন্দর কত হীনতা , কত অপমান , কত ক্ষতি স্বীকার করিয়া যে তিনটি হাজার টাকা সংগ্রহ করিয়াছিলেন , সে ইতিহাস গোপন থাকাই ভালো ।
নোট-কখানি রুমালে জড়াইয়া চাদরে বাঁধিয়া রামসুন্দর বেহাইয়ের নিকট গিয়া বসিলেন । প্রথমে হাস্যমুখে পাড়ার খবর পাড়িলেন । হরেকৃষ্ণের বাড়িতে একটা মস্ত চুরি হইয়া গিয়াছে , তাহার আদ্যোপান্ত বিবরণ বলিলেন। নবীনমাধব ও রাধামাধব দুই ভাইয়ের তুলনা করিয়া বিদ্যাবুদ্ধি ও স্বভাব সম্বন্ধে রাধামাধবের সুখ্যাতি এবং নবীনমাধবের নিন্দা করিলেন ; শহরে একটা নূতন ব্যামো আসিয়াছে , সে সম্বন্ধে অনেক আজগবি আলোচনা করিলেন ; অবশেষে হুঁকাটি নামাইয়া রাখিয়া কথায় কথায় বলিলেন , “ হাঁ হাঁ, বেহাই , সেই টাকাটা বাকি আছে বটে । রোজই মনে করি , যাচ্ছি অমনি হাতে করে কিছু নিয়ে যাই, কিন্তু সময়কালে মনে থাকে না । আর ভাই , বুড়ো হয়ে পড়েছি । ” এমনি এক দীর্ঘ ভূমিকা করিয়া পঞ্জরের তিনখানি অস্থির মতো সেই তিনখানি নোট যেন অতি সহজে অতি অবহেলে বাহির করিলেন । সবেমাত্র তিন হাজার টাকার নোট দেখিয়া রায়বাহাদুর অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন ।
বলিলেন , “ থাক্, বেহাই , ওতে আমার কাজ নেই । ” একটা প্রচলিত বাংলা প্রবাদের উল্লেখ করিয়া বলিলেন , সামান্য কারণে হাতে দুর্গন্ধ করিতে তিনি চান না ।
এই ঘটনার পরে মেয়েকে বাড়ি আনিবার প্রস্তাব কাহারো মুখে আসে না — কেবল রামসুন্দর ভাবিলেন , ‘ সে-সকল কুটুম্বিতার সংকোচ আমাকে আর শোভা পায় না । ‘ মর্মাহতভাবে অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অবশেষে মৃদুস্বরে কথাটা পাড়িলেন । রায়বাহাদুর কোনো কারণমাত্র উল্লেখ না করিয়া বলিলেন , “ সে এখন হচ্ছে না । ” এই বলিয়া কর্মোপলক্ষে স্থানান্তরে চলিয়া গেলেন ।
রামসুন্দর মেয়ের কাছে মুখ না দেখাইয়া কম্পিতহস্তে কয়েকখানি নোট চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া বাড়ি ফিরিয়া গেলেন । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন , যতদিন না সমস্ত টাকা শোধ করিয়া দিয়া অসংকোচে কন্যার উপরে দাবি করিতে পারিবেন ততদিন আর বেহাইবাড়ি যাইবেন না ।
