হরিনাথ শশব্যস্ত হইয়া কহিল , “ ডাক্তারবাবু , করেন কী , করেন কী । আপনার কাছে আমি চিরঋণী , আমার পায়ে হাত দিবেন না । ”
আমি কহিলাম , “ নিরপরাধে আমি তোমার সর্বনাশ করিয়াছি , সেই পাপে আমার কন্যা মরিতেছে । ”
এই বলিয়া সর্বলোকের সমক্ষে আমি চীৎকার করিয়া বলিলাম , “ ওগো , আমি এই বৃদ্ধের সর্বনাশ করিয়াছি , আমি তাহার দণ্ড লইতেছি; ভগবান আমার শশীকে রক্ষা করুন । ”
বলিয়া হরিনাথের চটিজুতা খুলিয়া লইয়া নিজের মাথায় মারিতে লাগিলাম, বৃদ্ধ ব্যস্তসমস্ত হইয়া আমার হাত হইতে জুতা কাড়িয়া লইল ।
পরদিন দশটা-বেলায় গায়ে-হলুদের হরিদ্রাচিহ্ন লইয়া শশী ইহসংসার হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিল ।
তাহার পরদিনেই দারোগাবাবু কহিলেন , “ ওহে আর কেন , এইবার বিবাহ করিয়া ফেলো । দেখাশুনার তো একজন লোক চাই ? ”
মানুষের মর্মান্তিক দুঃখশোকের প্রতি এরূপ নিষ্ঠুর অশ্রদ্ধা শয়তানকেও শোভা পায় না । কিন্তু , নানা ঘটনায় দারোগার কাছে এমন মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়াছিলাম যে , কোনো কথা বলিবার মুখ ছিল না । দারোগার বন্ধুত্ব সেই দিন যেন আমাকে চাবুক মারিয়া অপমান করিল ।
হৃদয় যতই ব্যথিত থাক্ , কর্মচক্র চলিতেই থাকে । আগেকার মতোই ক্ষুধার আহার , পরিধানের বস্ত্র , এমন-কি চুলার কাষ্ঠ এবং জুতার ফিতা পর্যন্ত পরিপূর্ণ উদ্যমে নিয়মিত সংগ্রহ করিয়া ফিরিতে হয় ।
কাজের অবকাশে যখন একলা ঘরে আসিয়া বসিয়া থাকি তখন মাঝে মাঝে কানে সেই করুণ কণ্ঠের প্রশ্ন বাজিতে থাকে , “ বাবা , ঐ বুড়ো তোমার পায়ে ধরিয়া কেন অমন করিয়া কাঁদিতেছিল । ” দরিদ্র হরিনাথের জীর্ণ ঘর নিজের ব্যয়ে ছাইয়া দিলাম , আমার দুগ্ধবতী গাভীটি তাহাকে দান করিলাম , তাহার বন্ধকি জোতজমা মহাজনের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া দিলাম ।
কিছুদিন সদ্যশোকের দুঃসহ বেদনায় নির্জন সন্ধ্যায় এবং অনিদ্র রাত্রে কেবলই মনে হইত , আমার কোমলহৃদয়া মেয়েটি সংসারলীলা শেষ করিয়াও তাহার বাপের নিষ্ঠুর দুষ্কর্মে পরলোকে কোনোমতেই শান্তি পাইতেছে না । সে যেন ব্যথিত হইয়া কেবলই আমাকে প্রশ্ন করিয়া ফিরিতেছে , বাবা , কেন এমন করিলে ।
কিছুদিন এমনি হইয়াছিল , গরিবের চিকিৎসা করিয়া টাকার জন্য তাগিদ করিতে পারিতাম না । কোনো ছোটো মেয়ের ব্যামো হইলে মনে হইত, আমার শশীই যেন পল্লীর সমস্ত রুগ্না বালিকার মধ্যে রোগ ভোগ করিতেছে ।
তখন পুরা বর্ষায় পল্লি ভাসিয়া গেছে । ধানের খেত এবং গৃহের অঙ্গনপার্শ্ব দিয়া নৌকায় করিয়া ফিরিতে হয় । ভোররাত্রি হইতে বৃষ্টি শুরু হইয়াছে , এখনও বিরাম নাই ।
জমিদারের কাছারিবাড়ি হইতে আমার ডাক পড়িয়াছে । বাবুদের পান্সির মাঝি সামান্য বিলম্বটুকু সহ্য করিতে না পারিয়া উদ্ধত হইয়া উঠিবার উপক্রম করিতেছে ।
ইতিপূর্বে এরূপ দুর্যোগে যখন আমাকে বাহির হইতে হইত তখন একটি লোক ছিল যে আমার পুরাতন ছাতাটি খুলিয়া দেখিত, তাহাতে কোথাও ছিদ্র আছে কি না , এবং একটি ব্যগ্র কণ্ঠ বাদলার হাওয়া ও বৃষ্টির ছাঁট হইতে সযত্নে আত্মরক্ষা করিবার জন্য আমাকে বারংবার সতর্ক করিয়া দিত । আজ শূন্য নীরব গৃহ হইতে নিজের ছাতা নিজে সন্ধান করিয়া লইয়া বাহির হইবার সময় তাহার সেই স্নেহময় মুখখানি স্মরণ করিয়া একটুখানি বিলম্ব হইতেছিল । তাহার রুদ্ধ শয়নঘরটার দিকে তাকাইয়া ভাবিতেছিলাম , যে লোক পরের দুঃখকে কিছুই মনে করে না তাহার সুখের জন্য ভগবান ঘরের মধ্যে এত স্নেহের আয়োজন কেন রাখিবেন । এই ভাবিতে ভাবিতে সেই শূন্য ঘরটার দরজার কাছে আসিয়া বুকের মধ্যে হু হু করিতে লাগিল । বাহিরে বড়োলোকের ভৃত্যের তর্জনস্বর শুনিয়া তাড়াতাড়ি শোক সংবরণ করিয়া বাহির হইয়া পড়িলাম ।
নৌকায় উঠিবার সময় দেখি , থানার ঘাটে ডোঙা বাঁধা , একজন চাষা কৌপীন পরিয়া বৃষ্টিতে ভিজিতেছে । আমি জিজ্ঞাসা করিলাম , “ কী রে । ” উত্তরে শুনিলাম গতরাত্রে তাহার কন্যাকে সাপে কাটিয়াছে , থানায় রিপোর্ট করিবার জন্য হতভাগ্য তাহাকে দূরগ্রাম হইতে বহিয়া আনিয়াছে । দেখিলাম , সে তাহার নিজের একমাত্র গাত্রবস্ত্র খুলিয়া মৃতদেহ ঢাকিয়া রাখিয়াছে । জমিদারি কাছারির অসহিষ্ণু মাঝি নৌকা ছাড়িয়া দিল ।
বেলা একটার সময় বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া দেখি , তখনো সেই লোকটা বুকের কাছে হাত পা গুটাইয়া বসিয়া বসিয়া ভিজিতেছে ; দারোগাবাবুর দর্শন মেলে নাই । আমি তাহাকে আমার রন্ধন-অন্নের এক অংশ পাঠাইয়া দিলাম । সে তাহা ছুঁইল না ।
তাড়াতাড়ি আহার সারিয়া কাছারির রোগীর তাগিদে পুনর্বার বাহির হইলাম । সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরিয়া দেখি তখনো লোকটা একেবারে অভিভূতের মতো বসিয়া আছে । কথা জিজ্ঞাসা করিলে উত্তর দিতে পারে না , মুখের দিকে তাকাইয়া থাকে । এখন তাহার কাছে এই নদী , ঐ গ্রাম , ঐ থানা , এই মেঘাচ্ছন্ন আর্দ্র পঙ্কিল পৃথিবীটা স্বপ্নের মতো । বারংবার প্রশ্নের দ্বারা জানিলাম , একবার একজন কন্স্টেবল আসিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিল , ট্যাঁকে কিছু আছে কি না । সে উত্তর করিয়াছিল , সে নিতান্তই গরিব , তাহার কিছু নাই । কন্স্টেবল বলিয়া গেছে , “ থাক্ বেটা , তবে এখন বসিয়া থাক্ । ”
এমন দৃশ্য পূর্বেও অনেকবার দেখিয়াছি , কখনো কিছুই মনে হয় নাই । আজ কোনোমতেই সহ্য করিতে পারিলাম না । আমার শশীর করুণাগদ্গদ অব্যক্ত কণ্ঠ সমস্ত বাদলার আকাশ জুড়িয়া বাজিয়া উঠিল । ঐ কন্যাহারা বাক্যহীন চাষার অপরিমেয় দুঃখ আমার বুকের পাঁজরগুলাকে যেন ঠেলিয়া উঠিতে লাগিল ।
