এই বলিয়া রমণী উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “নমস্কার বাবুজি!”
মুহূর্তপরেই যেন সংশোধন করিয়া কহিল, “সেলাম বাবুসাহেব!” এই মুসলমান অভিবাদনের দ্বারা সে যেন জীর্ণভিত্তি ধূলিশায়ী ভগ্ন ব্রহ্মণ্যের নিকট শেষ বিদায় গ্রহণ করিল। আমি কোনো কথা না বলিতেই সে সেই হিমাদ্রিশিখরের ধূসর কুজ্ঝটিকারাশির মধ্যে মেঘের মতো মিলাইয়া গেল।
আমি ক্ষণকাল চক্ষু মুদ্রিত করিয়া সমস্ত ঘটনাবলী মানসপটে চিত্রিত দেখিতে লাগিলাম। মছলন্দের আসনে যমুনাতীরের গবাক্ষে সুখাসীনা ষোড়শী নবাববালিকাকে দেখিলাম, তীর্থমন্দিরে সন্ধ্যারতিকালে তপস্বিনীর ভক্তিগদগদ একাগ্র মূর্তি দেখিলাম, তাহার পরে এই দার্জিলিঙে ক্যাল্কাটা রোডের প্রান্তে প্রবীণার কুহেলিকাচ্ছন্ন ভগ্নহৃদয়ভারকাতর নৈরাশ্যমূর্তিও দেখিলাম – একটি সুকুমার রমণীদেহে ব্রাহ্মণ-মুসলমানের রক্ততরঙ্গের বিপরীত সংঘর্ষজনিত বিচিত্র ব্যাকুল সংগীতধ্বনি সুন্দর সুসম্পূর্ণ উর্দুভাষায় বিগলিত হইয়া আমার মস্তিষ্কের মধ্যে স্পন্দিত হইতে লাগিল।
চক্ষু খুলিয়া দেখিলাম, হঠাৎ মেঘ কাটিয়া গিয়া স্নিগ্ধ রৌদ্রে নির্মল আকাশ ঝলমল করিতেছে, ঠেলাগাড়িতে ইংরাজ রমণী ও অশ্বপৃষ্ঠে ইংরাজ পুরুষগণ বায়ুসেবনে বাহির হইয়াছে, মধ্যে মধ্যে দুই একটি বাঙালির গলাবন্ধবিজড়িত মুখমণ্ডল হইতে আমার প্রতি সকৌতুক কটাক্ষ বর্ষিত হইতেছে।
দ্রুত উঠিয়া পড়িলাম, এই সূর্যালোকিত অনাবৃত জগৎদৃশ্যের মধ্যে সেই মেঘাচ্ছন্ন কাহিনীকে আর সত্য বলিয়া মনে হইল না। আমার বিশ্বাস আমি পর্বতের কুয়াশার সহিত আমার সিগারেটের ধূম ভূরিপরিমাণে মিশ্রিত করিয়া একটি কল্পনাখণ্ড রচনা করিয়াছিলাম – সেই মুসলমানব্রাহ্মণী, সেই বিপ্রবীর, সেই যমুনাতীরের কেল্লা কিছুই হয়তো সত্য নহে।
(বৈশাখ, ১৩০৫ বঃ)
দুর্বুদ্ধি
ভিটা ছাড়িতে হইল । কেমন করিয়া, তাহা খোলসা করিয়া বলিব না , আভাস দিব মাত্র ।
আমি পাড়াগেঁয়ে নেটিভ ডাক্তার , পুলিসের থানার সম্মুখে আমার বাড়ি । যমরাজের সহিত আমার যে পরিমাণ আনুগত্য ছিল দারোগাবাবুদের সহিত তাহা অপেক্ষা কম ছিল না , সুতরাং নর এবং নারায়ণের দ্বারা মানুষের যত বিবিধ রকমের পীড়া ঘটিতে পারে তাহা আমার সুগোচর ছিল । যেমন মণির দ্বারা বলয়ের এবং বলয়ের দ্বারা মণির শোভা বৃদ্ধি হয় তেমনি আমার মধ্যস্থতায় দারোগার এবং দারোগার মধ্যস্থতায় আমার উত্তরোত্তর আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটিতেছিল ।
এই-সকল ঘনিষ্ঠ কারণে হাল নিয়মের কৃতবিদ্য দারোগা ললিত চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার একটু বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল । তাঁহার একটি অরক্ষণীয়া আত্মীয়া কন্যার সহিত বিবাহের জন্য মাঝে মাঝে অনুরোধ করিয়া আমাকেও প্রায় তিনি অরক্ষণীয় করিয়া তুলিয়াছিলেন । কিন্তু , শশী আমার একমাত্র কন্যা , মাতৃহীনা , তাহাকে বিমাতার হাতে সমর্পণ করিতে পারিলাম না । বর্ষে বর্ষে নূতন পঞ্জিকার মতে বিবাহের কত শুভলগ্নই ব্যর্থ হইল । আমারই চোখের সম্মুখে কত যোগ্য এবং অযোগ্য পাত্র চতুর্দোলায় চড়িল , আমি কেবল বরযাত্রীর দলে বাহির বাড়িতে মিষ্টান্ন খাইয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম ।
শশীর বয়স বারো হইয়া প্রায় তেরোয় পড়ে । কিছু সুবিধামত টাকার জোগাড় করিতে পারিলেই মেয়েটিকে একটি বিশিষ্ট বড়োঘরে বিবাহ দিতে পারিব , এমন আশা পাইয়াছি । সেই কর্মটি শেষ করিতে পারিলে অবিলম্বে আর-একটি শুভকর্মের আয়োজনে মনোনিবেশ করিতে পারিব ।
সেই অত্যাবশ্যক টাকাটার কথা ধ্যান করিতেছিলাম , এমন সময় তুলসীপাড়ার হরিনাথ মজুমদার আসিয়া আমার হাতে পায়ে ধরিয়া কাঁদিয়া পড়িল । কথাটা এই , তাহার বিধবা কন্যা রাত্রে হঠাৎ মারা গিয়াছে , শত্রুপক্ষ গর্ভপাতের অপবাদ দিয়া দারোগার কাছে বেনামি পত্র লিখিয়াছে । এক্ষণে পুলিস তাহার মৃতদেহ লইয়া টানাটানি করিতে উদ্যত ।
সদ্য কন্যাশোকের উপর এতবড়ো অপমানের আঘাত তাহার পক্ষে অসহ্য হইয়াছে । আমি ডাক্তারও বটে , দারোগার বন্ধুও বটে , কোনোমতে উদ্ধার করিতে হইবে ।
লক্ষ্মী যখন ইচ্ছা করেন তখন এমনি করিয়াই কখনো সদর কখনো খিড়কি-দরজা দিয়া অনাহুত আসিয়া উপস্থিত হন । আমি ঘাড় নাড়িয়া বলিলাম , “ ব্যাপারটা বড়ো গুরুতর । ” দুটো-একটা কল্পিত উদাহরণ প্রয়োগ করিলাম, কম্পমান বৃদ্ধ হরিনাথ শিশুর মতো কাঁদিতে লাগিল ।
বিস্তারিত বলা বাহুল্য , কন্যার অন্ত্যেষ্টি-সৎকারের সুযোগ করিতে হরিনাথ ফতুর হইয়া গেল ।
আমার কন্যা শশী করুণ স্বরে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল , “ বাবা , ঐ বুড়ো তোমার পায়ে ধরিয়া কেন অমন করিয়া কাঁদিতেছিল । ”
আমি তাহাকে ধমক দিয়া বলিলাম , “ যা যা , তোর এত খবরে দরকার কী । ”
এইবার সৎপাত্রে কন্যাদানের পথ সুপ্রশস্ত হইল । বিবাহের দিন স্থির হইয়া গেল । একমাত্র কন্যার বিবাহ , ভোজের আয়োজন প্রচুর করিলাম । বাড়িতে গৃহিণী নাই , প্রতিবেশীরা দয়া করিয়া আমাকে সাহায্য করিতে আসিল । সর্বস্বান্ত কৃতজ্ঞ হরিনাথ দিনরাত্রি খাটিতে লাগিল ।
গায়ে-হলুদের দিনে রাত তিনটার সময় হঠাৎ শশীকে ওলাউঠায় ধরিল । রোগ উত্তরোত্তর কঠিন হইয়া উঠিতে লাগিল । অনেক চেষ্টার পর নিষ্ফল ঔষধের শিশিগুলা ভূতলে ফেলিয়া ছুটিয়া গিয়া হরিনাথের পা জড়াইয়া ধরিলাম । কহিলাম , “ মাপ করো, দাদা , এই পাষণ্ডকে মাপ করো । আমার একমাত্র কন্যা , আমার আর কেহ নাই । ”
