আমি অনেকসময়ই রাস্তায় বাহির হইয়া পথিকদের মুখ এবং চলনের ভাব পর্যবেক্ষণ করিতাম ; ভাবে ভঙ্গিতে যাহাদিগকে কিছুমাত্র সন্দেহজনক বোধ হইয়াছে আমি অনেকসময়ই গোপনে তাহাদের অনুসরণ করিয়াছি , তাহাদের নামধাম ইতিহাস অনুসন্ধান করিয়াছি , অবশেষে পরম নৈরাশ্যের সহিত আবিষ্কার করিয়াছি — তাহারা নিষ্কলঙ্ক ভালোমানুষ , এমন-কি তাহাদের আত্মীয়-বান্ধবেরাও তাহাদের সম্বন্ধে আড়ালে কোনোপ্রকার গুরুতর মিথ্যা অপবাদও প্রচার করে না । পথিকদের মধ্যে সবচেয়ে যাহাকে পাষণ্ড বলিয়া মনে হইয়াছে , এমন-কি যাহাকে দেখিয়া নিশ্চয় মনে করিয়াছি যে , এইমাত্র সে কোনো-একটা উৎকট দুষ্কার্য সাধন করিয়া আসিয়াছে , সন্ধান করিয়া জানিয়াছি — সে একটি ছাত্রবৃত্তি স্কুলের দ্বিতীয় পণ্ডিত , তখনই অধ্যাপনকার্য সমাধা করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিতেছে । এই-সকল লোকেরাই অন্য-কোনো দেশে জন্মগ্রহণ করিলে বিখ্যাত চোরডাকাত হইয়া উঠিতে পারিত , কেবলমাত্র যথোচিত জীবনীশক্তি এবং যথেষ্ট পরিমাণ পৌরুষের অভাবেই আমাদের দেশে ইহারা কেবল পণ্ডিতি করিয়া বৃদ্ধবয়সে পেন্সন লইয়া মরে ; বহু চেষ্টা ও সন্ধানের পর এই দ্বিতীয় পণ্ডিতটার নিরীহতার প্রতি আমার যেরূপ সুগভীর অশ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল কোনো অতিক্ষুদ্র ঘটিবাটিচোরের প্রতি তেমন হয় নাই ।
অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমাদেরই বাসার অনতিদূরে একটি গ্যাসপোস্টের নীচে একটা মানুষ দেখিলাম , বিনা আবশ্যকে সে উৎসুকভাবে একই স্থানে ঘুরিতেছে ফিরিতেছে । তাহাকে দেখিয়া আমার সন্দেহমাত্র রহিল না যে , সে একটি-কোনো গোপন দুরভিসন্ধির পশ্চাতে নিযুক্ত রহিয়াছে । নিজে অন্ধকারে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া তাহার চেহারাখানা বেশ ভালো করিয়া দেখিয়া লইলাম — তরুণ বয়স , দেখিতে সুশ্রী । আমি মনে মনে কহিলাম , ‘ দুষ্কর্ম করিবার এই তো ঠিক উপযুক্ত চেহারা ; নিজের মুখশ্রী যাহাদের সর্বপ্রধান বিরুদ্ধ সাক্ষী তাহারা যেন সর্বপ্রকার অপরাধের কাজ সর্বযত্নে পরিহার করে ; সৎকার্য করিয়া তাহারা নিষ্ফল হইতে পারে কিন্তু দুষ্কর্ম দ্বারা সফলতালাভও তাহাদের পক্ষে দুরাশা । ‘ দেখিলাম , এই ছোকরাটির চেহারাটাই ইহার সর্বপ্রধান বাহাদুরি ; সেজন্য আমি মনে মনে অনেকক্ষণ ধরিয়া তাহার তারিফ করিলাম, বলিলাম , ‘ ভগবান তোমাকে যে দুর্লভ সুবিধাটি দিয়াছেন সেটাকে রীতিমতো কাজে খাটাইতে পার , তবে তো বলি শাবাশ। ‘
আমি অন্ধকার হইতে তাহার সম্মুখে আসিয়াই পৃষ্ঠে চপেটাঘাতপূর্বক বলিলাম , “ এই যে, ভালো আছেন তো ? ” সে তৎক্ষণাৎ প্রবলমাত্রায় চমকিয়া উঠিয়া একেবারে ফ্যাকাসে হইয়া উঠিল । আমি কহিলাম , “ মাপ করিবেন , ভুল হইয়াছে , হঠাৎ আপনাকে অন্য লোক ঠাওরাইয়াছিলাম । ” মনে মনে কহিলাম , কিছুমাত্র ভুল করি নাই , যাহা ঠাওরাইয়াছিলাম তাই বটে । কিন্তু এতটা অধিক চমকিয়া ওঠা তাহার পক্ষে অনুপযুক্ত হইয়াছিল , ইহাতে আমি কিছু ক্ষুণ্ন হইলাম । নিজের শরীরের প্রতি তাহার আরো অধিক দখল থাকা উচিত ছিল ; কিন্তু শ্রেষ্ঠতার সম্পূর্ণ আদর্শ অপরাধীশ্রেণীর মধেও বিরল । চোরকেও সেরা চোর করিয়া তুলিতে প্রকৃতি কৃপণতা করিয়া থাকে ।
অন্তরালে আসিয়া দেখিলাম , সে ত্রস্তভাবে গ্যাসপোস্ট ছাড়িয়া চলিয়া গেল । পিছনে পিছনে গেলাম; দেখিলাম, ছোকরাটি গোলদিঘির মধ্যে প্রবেশ করিয়া পুষ্কুরিণীতীরে তৃণশয্যার উপর চিত হইয়া শুইয়া পড়িল ; আমি ভাবিলাম , উপায়চিন্তার এ একটা স্থান বটে , গ্যাসপোস্টের তলদেশ অপেক্ষা অনেকাংশে ভালো — লোকে যদি কিছু সন্দেহ করে তো বড়োজোর এই ভাবিতে পারে যে , ছোকরাটি অন্ধকার আকাশে প্রেয়সীর মুখচন্দ্র অঙ্কিত করিয়া কৃষ্ণপক্ষ রাত্রির অভাব পূরণ করিতেছে । ছেলেটির প্রতি উত্তরোত্তর আমার চিত্ত আকৃষ্ট হইতে লাগিল ।
অনুসন্ধান করিয়া তাহার বাসা জানিলাম । মন্মথ তাহার নাম , সে কলেজের ছাত্র , পরীক্ষা ফেল্ করিয়া গ্রীষ্মাবকাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে , তাহার বাসার সহবাসী ছাত্রগণ সকলেই আপন আপন বাড়ি চলিয়া গেছে । দীর্ঘ অবকাশকালে সকল ছাত্রই বাসা ছাড়িয়া পালায় , এই লোকটিকে কোন্ দুষ্টগ্রহ ছুটি দিতেছে না সেটা বাহির করিতে কৃতসংকল্প হইলাম ।
আমিও ছাত্র সাজিয়া তাহার বাসার এক অংশ গ্রহণ করিলাম । প্রথম দিন যখন সে আমাকে দেখিল, কেমন একরকম করিয়া সে আমার মুখের দিকে চাহিল তাহার ভাবটা ভালো বুঝিলাম না । যেন সে বিস্মিত , যেন সে আমার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়াছে , এমনি একটা ভাব । বুঝিলাম , শিকারীর উপযুক্ত শিকার বটে , ইহাকে সোজাভাবে ফস্ করিয়া কায়দা করা যাইবে না ।
অথচ যখন তাহার সহিত প্রণয়বন্ধনের চেষ্টা করিলাম তখন সে ধরা দিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করিল না । কিন্তু মনে হইল , সেও আমাকে সুতীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখে , সেও আমাকে চিনিতে চায় । মনুষ্যচরিত্রের প্রতি এইরূপ সদাসতর্ক সজাগ কৌতূহল , ইহা ওস্তাদের লক্ষণ । এত অল্প বয়সে এতটা চাতুরী দেখিয়া বড়ো খুশি হইলাম ।
মনে ভাবিলাম , মাঝখানে একজন রমণী না আনিলে এই অসাধারণ অকালধূর্ত ছেলেটির হৃদয়দ্বার উদ্ঘাটন করা সহজ হইবে না ।
একদিন গদ্গদকণ্ঠে মন্মথকে বলিলাম , “ ভাই , একটি স্ত্রীলোককে আমি ভালোবাসি , কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসে না । ”
