বর্তমান কালের প্রথানুসারে অন্যদিন বৃদ্ধকে দেখিয়া কোনোপ্রকার অভিবাদন করিতাম না – আজ তাঁহাকে প্রণাম করিলাম। বৃদ্ধ নিশ্চয় মনে ভাবিলেন, গতকল্য ছোটোলাট তাঁহার বাড়িতে আসাতেই সহসা তাঁহার প্রতি আমার ভক্তির উদ্রেক হইয়াছে। তিনি পুলকিত হইয়া শতমুখে ছোটোলাটের গল্প বানাইয়া বলিতে লাগিলেন – আমিও কোনো প্রতিবাদ না করিয়া তাহাতে যোগ দিলাম। বাহিরের অন্য লোক যাহারা শুনিল তাহারা এ কথাটাকে আদ্যোপান্ত গল্প বলিয়া স্থির করিল, এবং সকৌতুকে বৃদ্ধের সহিত সকল কথায় সায় দিয়া গেল।
সকলে উঠিয়া গেলে আমি অত্যন্ত সলজ্জ মুখে দীনভাবে বৃদ্ধের নিকট একটি প্রস্তাব করিলাম। বলিলাম, যদিও নয়নজোড়ের বাবুদের সহিত আমাদের বংশমর্যাদার তুলনাই হইতে পারে না, তথাপি-
প্রস্তাবটা শেষ হইবামাত্র বৃদ্ধ আমাকে বক্ষে আলিঙ্গন করিয়া ধরিলেন, এবং আনন্দবেগে বলিয়া উঠিলেন, “আমি গরিব-আমার যে এমন সৌভাগ্য হবে তা আমি জানতুম না ভাই – আমার কুসুম অনেক পুণ্য করেছে তাই তুমি আজ ধরা দিলে।”
বলিতে বলিতে বৃদ্ধের চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল।
বৃদ্ধ, আজ এই প্রথম, তাঁহার মহিমান্বিত পূর্বপুরুষদের প্রতি কর্তব্য বিস্মৃত হইয়া স্বীকার করিলেন যে তিনি গরিব, স্বীকার করিলেন যে আমাকে লাভ করিয়া নয়নজোড়-বংশের গৌরবহানি হয় নাই। আমি যখন বৃদ্ধকে অপদস্থ করিবার জন্য চক্রান্ত করিতেছিলাম তখন বৃদ্ধ আমাকে পরম সৎপাত্র জানিয়া একান্তমনে কামনা করিতেছিলেন।
জৈষ্ঠ ১৩০২
ডিটেকটিভ
আমি পুলিসের ডিটেকটিভ কর্মচারী । আমার জীবনের দুটিমাত্র লক্ষ্য ছিল — আমার স্ত্রী এবং আমার ব্যবসায় । পূর্বে একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে ছিলাম , সেখানে আমার স্ত্রীর প্রতি সমাদরের অভাব হওয়াতেই আমি দাদার সঙ্গে ঝগড়া করিয়া বাহির হইয়া আসি । দাদাই উপার্জন করিয়া আমাকে পালন করিতেছিলেন , অতএব সহসা সস্ত্রীক তাঁহার আশ্রয় ত্যাগ করিয়া আসা আমার পক্ষে দুঃসাহসের কাজ হইয়াছিল ।
কিন্তু কখনো নিজের উপরে আমার বিশ্বাসের ত্রুটি ছিল না । আমি নিশ্চয় জানিতাম , সুন্দরী স্ত্রীকে যেমন বশ করিয়াছি বিমুখ অদৃষ্টলক্ষ্মীকেও তেমনি বশ করিতে পারিব । মহিমচন্দ্র এ সংসারে পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না ।
পুলিসবিভাগে সামান্যভাবে প্রবেশ করিলাম , অবশেষে ডিটেক্টিভ-পদে উত্তীর্ণ হইতে অধিক বিলম্ব হইল না ।
উজ্জ্বল শিখা হইতেও যেমন কজ্জলপাত হয় তেমনি আমার স্ত্রীর প্রেম হইতেও ঈর্ষা এবং সন্দেহের কালিমা বাহির হইত । সেটাতে আমার কিছু কাজের ব্যাঘাত করিত; কারণ পুলিসের কর্মে স্থানাস্থান কালাকাল বিচার করিলে চলে না , বরঞ্চ স্থানের অপেক্ষা অস্থান এবং কালের অপেক্ষা অকালটারই চর্চা অধিক করিয়া করিতে হয় — তাহাতে করিয়া আমার স্ত্রীর স্বভাবসিদ্ধ সন্দেহ আরো যেন দুর্নিবার হইয়া উঠিত । সে আমাকে ভয় দেখাইবার জন্য বলিত , “ তুমি এমন যখন-তখন যেখানে-সেখানে যাপন কর , কালেভদ্রে আমার সঙ্গে দেখা হয় , আমার জন্য তোমার আশঙ্কা হয় না ?” আমি তাহাকে বলিতাম , “ সন্দেহ করা আমাদের ব্যবসায় , সেই কারণে ঘরের মধ্যে সেটাকে আর আনি না । ”
স্ত্রী বলিত , “ সন্দেহ করা আমার ব্যবসায় নহে , উহা আমার স্বভাব , আমাকে তুমি লেশমাত্র সন্দেহের কারণ দিলে আমি সব করিতে পারি । ”
ডিটেকটিভ লাইনে আমি সকলের সেরা হইব , একটা নাম রাখিব , এ প্রতিজ্ঞা আমার দৃঢ় ছিল । এ সম্বন্ধে যতকিছু বিবরণ এবং গল্প আছে তাহার কোনোটাই পড়িতে বাকি রাখি নাই । কিন্তু পড়িয়া কেবল মনের অসন্তোষ এবং অধীরতা বাড়িতে লাগিল ।
কারণ , আমাদের দেশের অপরাধীগুলা ভীরু এবং নির্বোধ , অপরাধগুলা নির্জীব এবং সরল , তাহার মধ্যে দুরূহতা দুর্গমতা কিছুই নাই । আমাদের দেশের খুনী নররক্তপাতের উৎকট উত্তেজনা কোনোমতেই নিজের মধ্যে সংবরণ করিতে পারে না । জালিয়াত যে জাল বিস্তার করে তাহাতে অনতিবিলম্বে নিজেই আপাদমস্তক জড়াইয়া পড়ে , অপরাধব্যূহ হইতে নির্গমনের কূটকৌশল সে কিছুই জানে না । এমন নির্জীব দেশে ডিটেক্টিভের কাজে সুখও নাই , গৌরবও নাই ।
বড়োবাজারের মাড়োয়ারী জুয়াচোরকে অনায়াসে গ্রেফতার করিয়া কতবার মনে মনে বলিয়াছি ,‘ ওরে অপরাধীকুলকলঙ্ক , পরের সর্বনাশ করা গুণী ওস্তাদলোকের কর্ম ; তোর মতো আনাড়ি নির্বোধের সাধুতপস্বী হওয়া উচিত ছিল । ‘ খুনীকে ধরিয়া তাহার প্রতি স্বগত উক্তি করিয়াছি , ‘ গবর্মেন্টের সমুন্নত ফাঁসিকাষ্ঠ কি তোদের মতো গৌরববিহীন প্রাণীদের জন্য হইয়াছিল — তোদের না আছে উদার কল্পনাশক্তি , না আছে কঠোর আত্মসংযম , তোরা বেটারা খুনী হইবার স্পর্ধা করিস! ‘
আমি কল্পনাচক্ষে যখন লণ্ডন এবং প্যারিসের জনাকীর্ণ পথের দুই পার্শ্বে শীতবাষ্পাকুল অভ্রভেদী হর্ম্যশ্রেণী দেখিতে পাইতাম তখন আমার শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিত । মনে মনে ভাবিতাম , ‘ এই হর্ম্যরাজি এবং পথ-উপপথের মধ্য দিয়া যেমন জনস্রোত কর্মস্রোত উৎসবস্রোত সৌন্দর্যস্রোত অহরহ বহিয়া যাইতেছে , তেমনি সর্বত্রই একটা হিংস্রকুটিল কৃষ্ণকুঞ্চিত ভয়ংকর অপরাধপ্রবাহ তলে তলে আপনার পথ করিয়া চলিয়াছে ; তাহারই সামীপ্যে য়ুরোপীয় সামাজিকতার হাস্যকৌতুক শিষ্টাচার এমন বিরাটভীষণ রমণীয়তা লাভ করিয়াছে । আর , আমাদের কলিকাতার পথপার্শ্বের মুক্তবাতায়ন গৃহশ্রেণীর মধ্যে রান্নাবাটনা , গৃহকার্য , পরীক্ষার পাঠ , তাসদাবার বৈঠক , দাম্পত্যকলহ , বড়োজোর ভ্রাতৃবিচ্ছেদ এবং মকদ্দমার পরামর্শ ছাড়া বিশেষ কিছু নাই — কোনো-একটা বাড়ির দিকে চাহিয়া কখনো এ কথা মনে হয় না যে , হয়তো এই মুহূর্তেই এই গৃহের কোনো-একটা কোণে শয়তান মুখ গুঁজিয়া বসিয়া আপনার কালো কালো ডিমগুলিতে তা দিতেছে । ‘
