বলা বাহুল্য, সেই সাধু ব্যক্তিই কোষাধ্যক্ষের কাজ পেলে। বাকি লোকগুলোর কাছ থেকে চোরাই মাল কেড়ে নেওয়া হল তো বটেই, তার উপরে তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হল।
কিন্তু আঠারো শতাব্দীর ইউরোপের কথা তো অতি-আধুনিক কথা। ডিটেকটিভ গল্পের সৃষ্টি হয়েছে আরও বহু শতাব্দী আগে। পৃথিবীতে যখন ঐতিহাসিক যুগ সবে আরম্ভ হয়েছে, তখনকারও একটি ডিটেকটিভ গল্প আমরা পেয়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তার আগে পৃথিবীতে আর কোনও গোয়েন্দা কাহিনি লেখা হয়নি।
এই গল্পের নায়ক বা ডিটেকটিভ হচ্ছেন দানিয়েল, বাইবেলে যিনি জ্ঞানী ব্যক্তি বলে বিখ্যাত। ঘটনাক্ষেত্র হচ্ছে বাবিলন।
প্রাচীন বাবিলনে এক মস্ত দেবতা ছিলেন তাঁর নাম বেল। তাঁকে মহা-পর্বত বলেও ডাকা হত।
হিন্দুদের দেব-দেবীরা এক হিসাবে রীতিমতো নির্লোভ। তাদের সামনে যত ভালো খাবারই ভোগ বলে ধরে দাও, তারা নির্নিমেষ নেত্রে কেবল সেইদিকে তাকিয়ে থেকেই খুশি হন, পরে খাবারগুলো অদৃশ্য হয় প্রকাশ্য ভাবেই ভক্তদের ক্ষুধার্ত উদর-গহ্বরে। কে জানে মা কালীর যদি মাংস খাবার শক্তি থাকত, তাহলে কালীঘাটে এতবেশি পাঁঠা বলি হত কিনা!
কিন্তু বাবিলনের বেল ছিলেন দস্তুরমতো পেটুক দেবতা। তাঁর সামনে ভোগ দিলে ভক্তদের একটি কণাও প্রসাদ পাওয়ার উপায় ছিল না। অন্তত বাবিলনবাসীরা সেই কথাই মনে করত।
প্রকাণ্ড দেবালয়, তার চুড়ো যেন আকাশ ভেদ করতে চায়। দেবালয়ের সঙ্গেই সংলগ্ন এক প্রাসাদে ঠাকুরের পুরোহিতরা বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাস করে।
ভোগমন্দিরে রাজবাড়ি থেকে রোজ বড় বড় থালায় রাশি রাশি উপাদেয় খাবার আসে, ঠাকুরের পেট ভরার জন্যে।
বেল-ঠাকুর খাইয়ে ছিলেন বটে, কিন্তু লোকের চোখের সামনে খেতে হয়তো তাঁর লজ্জা হয়। তাই তাঁর সামনে খাবারের থালাগুলো সাজিয়ে রেখে সবাই সরে পড়ে এবং রাত্রে মন্দিরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কিন্তু রোজ সকালে উঠে দেখা যায় কী আশ্চর্য! পাথরের ঠাকুর বেল জ্যান্ত হয়ে সব খাবার খেয়ে হজম করে ফেলেছেন!
দেবতার শক্তি দেখে রাজার মনে ভক্তি-শ্রদ্ধা আর ধরে না এবং যাদের মন্ত্রশক্তিতে দেবতা এমন জাগ্রত, সেই পুরোহিত-সম্প্রদায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও লাভের অঙ্ক বেড়ে উঠল রীতিমতো।
এমন সময়ে ঘটনাক্ষেত্রে দানিয়েলের প্রবেশ। জাতে তিনি ছিলেন ইহুদি, বাবিলনে এসেছেন যুদ্ধে বন্দি হয়ে। কাজেই বেলের উপরে তার একটুও ভক্তি শ্রদ্ধা নেই।
দানিয়েল সমস্ত দেখেশুনে একদিন বললেন, মহারাজ, পাথুরে দেবতার পেটের ভিতরটাও নিরেট পাথরে ভরতি হয়ে আছে, রাশি রাশি মিষ্টান্ন, ফল আর মাংসের লোভে সে পেট ফঁপা হতে পারে না। বেল এসব খাবার খান না।
রাজা বললেন, কি যে বলো তার মানে হয় না। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, রাত্রে মন্দিরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ থাকে। মন্দিরের ভিতরে জনপ্রাণী থাকে না, তবু খাবার কোথায় উড়ে যায়?
দানিয়েল বললেন, আমার মুখে সে কথা শুনলে আপনি বিশ্বাস করবেন না। আমার কর্তব্য আমাকে করতে দিন, তারপর কাল সকালেই আপনাকে দেখাব, বেল খাবার খান না।
সে-রাত্রেও ষোড়শোপচারে ঠাকুরকে ভোগ দেওয়া হল।
তারপর দানিয়েল এসে প্রথমে মন্দিরের মেঝের উপর সর্বত্র ভালো করে ছাই ছড়িয়ে দিলেন এবং তারপর মন্দিরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে দিয়ে চলে গেলেন।
সকাল হল। রাজাকে সঙ্গে করে দানিয়েল মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজা খোলা হল। কিন্তু ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, ঠাকুর চেটেপুটে সব থালার খাবার খেয়ে ফেলেছেন।
রাজার পুরোহিতরা ও সাঙ্গোপাঙ্গোরা দানিয়েলকে লক্ষ করে বললে, কোথাকার এক অবিশ্বাসী ইহুদি এসে আমাদের এত বড় ঠাকুরের শক্তিতে সন্দেহ করে! কী স্পর্ধা!
রাজা দেবমূর্তির দিকে তাকিয়ে ভক্তিভরে গদগদ স্বরে বললেন, হে বাবিলনের সনাতন দেবতা, হে মহাপ্রভু বেল! অসীম তোমার মহিমা, জাগ্রত তোমার উদর!
দানিয়েল কিন্তু কিছুমাত্র দমলেন না। হাসিমুখে বললেন, মহারাজ, মন্দিরের মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখুন!
ছাই-ছড়ানো মেঝের দিকে তাকিয়ে রাজা সবিস্ময়ে বললেন, একী! এখানে এত ছাই কেন? ছাইয়ের উপরে এত পায়ের দাগ এল কেমন করে? এ যে দেখছি পুরুষের পায়ের দাগ, মেয়ের পায়ের দাগ, শিশুর পায়ের দাগ। এসবের মানে কী?
দানিয়েল বললেন, মানে খুব স্পষ্ট, মহারাজ! মন্দিরের পিছনে এক গুপ্তদ্বার আছে। পুরুতরা তাদের বউ আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে সেই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেবতার ভোগ পেট ভরে খেয়ে পালায়। কিন্তু কাল যে আমি এখানে ছাই ছড়িয়ে রেখেছি, অন্ধকারে সেটা তারা দেখতে পায়নি। তাই পায়ের দাগই তাদের ধরিয়ে দিলে।
তখন রাজার চোখ ফুটল। বেলের উপরে তাঁর ভক্তি কমল কিনা জানি না, কিন্তু পুরোহিতদের প্রাণদণ্ড হল!
প্যারির বালক বিভীষিকা
এক
টেট ডি-ওর হচ্ছে এক গাঁটকাটার ছেলে। তার মা সার্কাসে খেলা দেখাত। জাতে সে ফরাসি। টেটকে দেখতে ছিল ভারি সুন্দর। যেমন মুখ-চোখ, মাথায় তেমনি একরাশ সোনালি চুলের গোছা। তার মিষ্টি চেহারা দেখলেই লোকে আদর না করে পারত না।
দিনরাত সার্কাসের খেলোয়াড়দের সঙ্গে থেকে সে খুব কম বয়সেই হরেকরকম কায়দা শিখে ফেললে। লম্বা বাঁশ বেয়ে বানরের মতো সড়সড় করে উপরে উঠে যেতে পারত। কেউ ধরতে এলে তার পায়ের তলা দিয়ে ফস করে গলে পালিয়ে যেতে পারত। কেউ হাতে চেপে ধরেও তাকে বন্দি করতে পারত না–সে মাছের মতন হাত থেকে পিছলে সরে পড়ত। তারের খেলা, দড়ির খেলা, এসব কিছুই তার অজানা ছিল না। এই দুষ্টু খোকাটির দৌরাত্ম্যে সার্কাসের সমস্ত লোক ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল।
