–আপনি তো সর্বাগ্রে মনোহরবাবুকে আবিষ্কার করতে চান?
নিশ্চয়ই!
–তাহলে আমাদের সঙ্গে আর একবার সুলতানপুর চলুন।
–সেটা হবে ডাহা পণ্ডশ্রম। কারণ সে-অঞ্চলের কোনও পাথরই আমি ওলটাতে বাকি রাখিনি।
না, একখানা পাথর ওলটাতে আপনি ভুলে গিয়েছেন।
–কোনখানা শুনি?
যথাসময়ে প্রকাশ পাবে।
সুন্দরবাবু একটা নিশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, বেশ তাই সই।
–মানিক সব শুনলে।
–এখানে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।
ফরমাজ করো।
–তোমার ছবি আঁকার হাত খুব পাকা!
–তুমি ছাড়া আর কেউ ওকথা বলে না!
–এখন আমার কী করতে হবে তাই বলো।
–মনোহরবাবুর আকৃতি-প্রকৃতির বিশেষত্বগুলি আগে তুমি সুন্দরবাবুর কাছ থেকে ভালো করে আর একবার শুনে নাও। তারপর এমন একটি মনুষ্য মূর্তি আঁকো, যার মধ্যে থাকবে ওই বিশেষত্বগুলি।
সুন্দরবাবু কৌতূহলী হয়ে বললেন, ওরকম ছবি এঁকে কী লাভ হবে?
–ওই ছবির সাহায্যে হয়তো আসামিকে শনাক্ত করা যাবে।
জয়ন্ত কী যে বকে তার ঠিক নেই। মনোহরকে আমিও দেখিনি, মানিকও দেখেনি। আমি খেয়েছি পরের মুখে ঝাল! সাতসকালে আমল খাস্তা! মানিক শিব গড়তে বানর গড়ে বসবে। ছবি দেখে মনোহরকে চেনাই যাবে না।
ফলেন পরিচিয়তে সুন্দরবাবু, ফলেন পরিচিয়তে! অর্থাৎ ফলের দ্বারা চেনা যায় বৃক্ষকে। আসল তাৎপর্য হচ্ছে, আকৃতির দ্বারা মানুষকে না চিনলেও তার ব্যবহারের দ্বারা তাকে চেনা যায় অনায়াসেই। বহু অভিজ্ঞতার ফলেই এরকম এক একটি প্রবাদ বাক্য রচিত হয় বুঝলেন মশাই।
তবু সুন্দরবাবুর মন মানল না, তিনি বললেন, তুমি কেবল নিজের মনগড়া কথাই বলছ, একটা প্রমাণও তো দিতে পারলে না।
জয়ন্ত হাসতে হাসতে বলল, একটা কেন, অনেক প্রমাণই দিতে পারি।
তাই নাকি? এ দেশের কোনও গোয়েন্দা যে এমন বর্ণনা শুনে প্রতিকৃতি এঁকে অপরাধী গ্রেপ্তার করেছে আমি তো কখনও তা শুনিনি।
–এদেশের কথা শিকেয় তুলে রাখুন সুন্দরবাবু এদেশের কথা নিয়ে মাথা ঘামাবেন । কিন্তু পাশ্চাত্য দেশের গোয়েন্দারা অনেক বারই এমনি বর্ণনা শুনে আঁকা প্রতিকৃতির সাহায্যে আসল অপরাধীকে বন্দি করতে পেরেছে।
সুন্দরবাবু বিস্ফারিত চক্ষে বললেন, বটে, বটে? আমি তো জানতুম না।
মানিক বললে, সুন্দরবাবু, আপনি অনেক কিছুই আগে জানতেন না। এখনও জানেন না, আবার না জানালে ভবিষ্যতেও জানতে পারতেন না। তবু জানতে গেলেও এত বেশি তর্ক করেন কেন বলুন দেখি?
সুন্দরবাবু দীপ্ত নেত্রে কেবল বললেন, হুম!
জয়ন্ত বললে, জানাজানি নিয়ে হানাহানি ছেড়ে দাও মানিক। এখন বর্ণনা শুনে মনোহরের চিত্র আঁকবার চেষ্টা করো। কালই আমরা সুলতানপুরে যাত্রা করব।
.
তিন । সিদ্ধেশ্বরবাবুর চিঠি
সুলতানপুর ছোট শহর হলেও তিনটি রেলপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত বলে এখানে লোকজনের সংখ্যা বড় অল্প নয়।
শহরের ভিতর দাঁড়িয়ে দেখা যায় সুলতানপুরের বাইরের চারিদিকে প্রকৃতি যেন নিজে ভাণ্ডার উজাড় করে ছড়িয়ে দিয়েছে অজস্র সৌন্দর্যের ঐশ্বর্য।
মানিক বললে, জয়ন্ত, এমনি সব জায়গাতেই জন্মলাভ করে কবির কল্পনা!
জয়ন্ত বলল, কিন্তু আমরা কবি নই।
সুন্দরবাবু বললে, আমরা ঠিক তার উলটো। আমরা এখানে কাল্পনিক মিথ্যার সঙ্গে মিতালি করতে আসিনি, আমরা এসেছি বাস্তব সত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে।
ফাঁক পেলে মানিক ছাড়ে না। বললে, সত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে? সে কী সুন্দরবাবু সত্য কি আপনার শত্রু?
সুন্দরবাবুর বদনমণ্ডলে ঘনিয়ে উঠেছিল অন্ধকার, কিন্তু জয়ন্ত তাড়াতাড়ি তার পক্ষ অবলম্বন করে বললে, না মানিক, সুন্দরবাবু বোধ করি বলতে চান, উনি এসেছেন সত্যের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে।
সুন্দরবাবুর মুখ তৎক্ষণাৎ প্রসন্ন হয়ে উঠল। তিনি বললেন, জয়ন্ত ঠিক ধরেছে। আমি তো ওই কথাই বলতে চাই।
–পোস্ট অফিস। যাবে নাকি?
–পরে বিবেচনা করব। কলকাতার বিখ্যাত চৌধুরী ব্যাংকের একটা শাখা এখানে আছে না?
–হ্যাঁ। সেটি এখানকার প্রধান ব্যাংক।
–একবার সেই ব্যাংকে যেতে চাই।
–কেন বলো দেখি?
–সেখানে গেলেই বুঝতে পারবেন।
চৌধুরী ব্যাংক। দোতলায় উঠে দেখা গেল, একটি বিলাতি পোশাক পরা যুবক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রবল বাতাসে দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।
তাকে দেখেই মানিক বিস্মিত স্বরে বলে উঠল, একী করুণা!
–আরে মানিক নাকি? এখানে যে?
–এই ব্যাংকের ম্যানেজারকে একটু দরকার।
–আমিই এখানকার ম্যানেজার।
–সে কী হে, কবে থেকে?
বছর তিনেক তুমি তো আমাদের পাড়া আর মাড়াও না, জানবে কেমন করে? এঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও।
ইনি হচ্ছেন সুন্দরবাবু–ডাকসাইটে পুলিশ কর্মচারী। ইনি হচ্ছেন আমার বন্ধু জয়ন্ত, আমার মুখে এর কথা নিশ্চয় তুমি অনেকবার শুনেছ। আর জয়ন্ত এটি হচ্ছে আমার বাল্যবন্ধু করুণা ভট্টাচার্য, আমার মামার বাড়ির পাশেই এদের বাড়ি।
করুণা বললে, আপনাদের মতো মহাবিখ্যাতরা এই ধারধারা গোবিন্দপুরে কেন? আচ্ছা, সেকথা পরে হবে, আগে আমার ঘরে এসে বসুন।
পাশেই ম্যানেজারের ঘর। সকলে আসন গ্রহণ করলে পর নিজেও টেবিলের সামনে গিয়ে বসে করুণা বললে, এইবার আপনাদের জন্যে কী করতে পারি আদেশ করুন।
জয়ন্ত সহাস্যে বললে, আদেশ-ফাঁদেশ কিছুই নয়। প্রথমেই একটি বিনীত নিবেদন আছে। বলতে পারেন, সুলতানপুর ডাকঘরের এলাকার মধ্যে সবচেয়ে ধনী বাঙালি এমন কে আছেন যিনি আপনাদের মক্কেল।
