এই আক্রমণের সময় বিজাপুরী দক্ষিণ-কেঁকনের অনেকটা (অর্থাৎ বিনগুরলা ও কুড়াল) শিবাজীর হাত হইতে উদ্ধার করিল। কানাড়ার উপকুলে করোয়ার প্রভৃতি স্থান দুই পক্ষের দ্বারাই লুঠ হইতে লাগিল।
ফোণ্ডা দুর্গ অধিকার
গোয়ার পূর্ব্ব-সীমানার নিকট বিজাপুর-রাজ্যের সর্ব্বপ্রধান দুর্গ ফোণ্ডা ১৬৬৬ সালের প্রথম ভাগে শিবাজী একদল সৈন্য পাঠাইয়া ফোণ্ডা অবরোধ করেন, কিন্তু বিজাপুরীদের অরও সৈন্য আসিয়া শিবাজীর লোকদের তাড়াইয়া দিয়া ঐ দুর্গ বাঁচাইল। তাহারা এই অঞ্চলে আরও চারটি দুর্গ শিবাজীর হাত হইতে উদ্ধার করিল। (মার্চ, ১৬৬৬)।
তার পর সাত বৎসর ধরিয়া শিবাজীর দৃষ্টি এদিকে পড়ে নাই। ১৬৭৩ সালের এপ্রিল মাসে তাঁহার সৈন্যরা কানাড়ার অধিত্যকায় ঢুকিয়া অনেক নগর ও দুর্গ লুঠিল। তাহার সেনাপতি প্রতাপ রাও হুবলীর ইংরাজ-কুঠী হইতে চল্লিশ হাজার টাকার কোম্পানীর মাল ছাড়া কর্মচারীদের নিজ সম্পত্তিও লইয়া গেল। কিন্তু বিজাপুর হইতে মুজফফর খাঁ চারি হাজার অশ্বারোহী লইয়া আসিয়া পড়ায় মারাঠারা হুবলী ছাড়িয়া পলাইল; তাড়াতাড়িতে তাহারা রাস্তায় বস্তা বস্তা লুঠের মাল ফেলিয়া দিয়া গেল।
এই বৎসর বিজয়া দশমীর দিন (১০ই অক্টোবর ১৬৭৩) শিবাজী পঁচিশ হাজার সৈন্য লইয়া দেশ-জয়ে বাহির হইলেন; সঙ্গে বিশ হাজার বড় বড় থলিয়া লইলেন, তাহাতে লুঠের জিনিষ ভরিয়া আনা হইবে। এই অভিযানে তিনি কানাড়া অবধি অগ্রসর হন, কিন্তু ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বহলাল ও শর্জা খাঁর নিকট পরাস্ত হইয়া দেশে ফিরিলেন।
বিজাপুরের দরবারে ক্রমেই গোলমাল ও নৈতিক অবনতি বাড়িতে লাগিল; তাহাতে দুরবর্ত্তী প্রদেশগুলির অত্যন্ত দুরবস্থা হইল, সেগুলি রক্ষা করিবার শক্তি বিজাপুরের রহিল না। সেই সুযোগে শিবাজী ১৮৭৫ সালে কানাড়া উপকূল স্থায়িভাবে দখল করিলেন।
নয় হাজার সৈন্য লইয়া ৮ই এপ্রিল শিবাজী ফোণ্ডা দুর্গের অবরোধ শুরু করিয়া দিলেন। দুর্গস্বামী মহম্মদ খাঁ একমাস ধরিয়া মহা বীরত্ব ও সহিষ্ণুতার সহিত লড়িলেন। শিবাজী দুর্গ-প্রাকারের নীচে চারিটি সুড়ঙ্গ খুঁডিলেন; কিন্তু মহম্মদ খাঁ তাহার সবগুলি নষ্ট করিয়া দিলেন। তখন শিবাজী এক মাটির দেওয়াল তুলিয়া দুর্গের বাহিরে চারিদিক ঘেরিয়া ফেলিলেন; মারাঠা সৈন্য তাহার আড়ালে নিরাপদে থাকিয়া গুলি চালাইতে লাগিল; তিনি পরিখার এক জায়গায় ভরাট করিয়া দুর্গ দেওয়াল অবধি পথ করিলেন। আধ সের ওজনের পাঁচশত সোনার বালা গড়াইয়া বলিলেন, যে-যে সৈন্য দুর্গ-দেওয়ালে চড়িতে পারিবে তাহাদের উহা দেওয়া হইবে। অবশেষে কোন সাহায্য না পাওয়ায় একমাস পরে (৬ই মে) ফোণ্ডার পতন হইল। আশেপাশের মহালগুলি দখল করিতে শিবাজীকে সাহায্য করিবেন—এই শর্তে মহম্মদ খাঁ এবং চার-পাঁচজন প্রধানকে প্রাণদান করা হইল; দুর্গের আর সব লোককে বধ করা হইল। অল্পদিনের মধ্যে দক্ষিণে গঙ্গাবতী নদী পর্যন্ত ঐ জেলার সমস্তটা শিবাজীর অধিকারে আসিল। কিন্তু কানাড়া অধিত্যকায় অনেক যুদ্ধের পরও শিবাজীর অধিকার স্থায়ী হইল না। বিদনুরের রাণী মারাঠা-রাজাকে কর দিতে সম্মত হইলেন। তাহার পর বিদনুর-সোলার মধ্যে যুদ্ধ, বিজাপুর ওমরাদের হস্তক্ষেপ, মারাঠা-সৈন্যের লুঠ ইত্যাদিতে দেশটা অশান্তি ও ক্ষতি ভোগ করিতে লাগিল।
পোর্তুগীজদেr সহিত শিবাজীর সম্বন্ধ
শিবাজীর রাজ্যের পশ্চিম সীমানার পাশেই পাতুগীজদের ভারতীয় প্রদেশ—উত্তরে দামন জেলা, মধ্যে বম্বে-থানাবাই (Bassein) চৌল, দক্ষিণে গোযা-বার্দেশ-ষষ্ঠি (Salette)।[৩]
অনেক ছোট ছোট বিষযে, প্রধানতঃ পোর্তুগীজদের ভারত-সাগরে একাধিপত্য এবং সর্বোচ্চ প্রভুত্বের দাবি লইয়া, শিবাজীব সহিত গোয়া সরকাবের বিবাদ বাধে, কিন্তু তাহা কখনও যুদ্ধ অবধি গড়ায় নাই, কারণ পোর্তুগিজদের সৈন্য ও অর্থবল বড় কম, তাহাদের স্থানীয় দেশ সৈন্য (কানাড়া) অত্যন্ত ভীরু, এবং গোরা সৈন্য (প্রকৃওপক্ষে মিশ্রজাতীয় ফিরিঙ্গি)-গুলি আসল ইউরোপীয়দের অপেক্ষা অনেক নিকৃষ্ট। এইজন্য পোর্তুগীজ গভর্ণর নানা উপায়ে ও কথার চালাকিতে শিবাজীকে ভুলাইয়া, শান্ত রাখেন। দুইবার (১৬৬৭ এবং ১৬৭০ সালে। তাহাদের মধ্যে লিখিত সন্ধি হইয়া উপস্থিত বিবাদের নিষ্পত্তি হয়।
চৌবে উৎপত্তি
রামনগরের কোলী-জাতীয় রাজারা ঐ দেশের পশ্চিমে সমুদ্রকুলের অনেক গ্রাম হইতে লুঠ না করার মূল্য-স্বরূপ বার্ষিক টাকা পাইতেন। এই টাকাকে সাধারণ কথায় ‘চৌথ’ বলা হইত, কিন্তু ইহা সর্বত্রই রাজকরের ঠিক চৌখা, অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশ ছিল না; কোন গ্রামে খাজানার দশমাংশ, কোন গ্রামে অষ্টমাংশ, কোন গ্রামে বংশ ইত্যাদি; দুই-এক জায়গায় চতুর্থাংশ। এই রাজাদের “চৌথিয়া-রাজা” বলিয়া ডাক-নাম ছিল। পোর্তুগীজ দামন জেলার (অর্থাৎ বম্বের উত্তরে) কতকগুলি গ্রাম তাঁহাদের এই চৌথ দিত। ১৬৭৬ সালে শিবাজী যখন কোলী দেশ স্থায়িভাবে অধিকার করিলেন, তখন কোলী-রাজাদের স্বত্ব অনুসারে ঐসব গ্রাম হইতে তিনিও চৌথ দাবি করিলেন। গোয়ার গভর্ণর নানা ওজরে সময় কাটাইয়া স্পষ্ট উত্তর দিতে যথাসম্ভব বিলম্ব করিলেন। শেষে শিবাজী যুদ্ধ করিবেন বলিয়া শাসাইলেন, কিন্তু শিবাজীর অকালমৃত্যুতে এই যুদ্ধ পরে তাহার পুত্র চালাইয়াছিলেন।
