নিচে ভাঁড়ারের পাশে এক সারিতে খানসাতেক ঘর আছে, বনমালী যাদের খাইতে দেয় ওটা তাদের কলোনি অথবা বস্তি। ক্ষেন্তির পাশের ঘরখানা ওই সারিতেই।
পরীর মুখ পাংশু হইয়া গেল। ইতিমধ্যে শুধু সন্দেহের উপর তার বিচার হইয়া শাস্তির ব্যবস্থা হইয়া গিয়াছে, এটা সে হঠাৎ ধারণা করিয়া উঠিতে পারিল না। এ বাড়িতে যাদের স্থান ঝি-চাকরেরও নিচে, বনমালী অনায়াসে তাকে তাদের দলে নামাইয়া দিল? সারাদিন ধরিয়া সে যে নিজের অনুপস্থিতির কৈফিয়ত রচনা করিয়াছে সেটা একবার শোনাও দরকার মনে করিল না?
সে কাঁদিয়া ফেলার উপক্রম করিয়া বলিল, আমি কী করেছি? তোমার গা ছুঁয়ে বলছি
কিন্তু গা সে ছুঁইবে কাহার? বনমালী আগাইয়া গিয়াছে, বিদায় লইয়াছে।
পরীকে নিচেই যাইতে হইল।
ক্ষেন্তি বলিল, কী গো, ওপর থেকে তাড়িয়ে দিলে? বড়লোকের মর্জি দিদি, কী করবে বলো।
পরী বলিল, কী যে বল তার ঠিক নেই। তাড়িয়ে আবার দেবে কে? আমি যেচে এসেছি। ওপরে যে সব ম্লেচ্ছাচার-বিধবা মানুষ আমি, আমার পোষাল না।
ক্ষেন্তি বলিল, ভাবলে অবাক লাগে বোন, এ বাড়ি তো একদিন তোমার নিজের দিদির ছিল! আজ যে রানী, কাল সে দাসী। হায় রে কপাল!
ছোট স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়া পরী কাঁদিয়া ফেলিল।
ক্ষেন্তি পিছু পিছু আসিয়া বলিল, কাঁদছ কেন? সয়ে যাবে।
বলিয়া সে পরীর বিছানাতে বসিল।
শোনো বলি। কলকাতার সে বাড়িতে আমি যখন কপাল পুড়িয়ে এলাম—
পরী বাধা দিয়া বলিল, থাক। তুমি যাও।
শোনোই না। আমি যখন কপাল পুড়িয়ে এলাম, বাড়ির রাজা আমাকে বললে, নিচেটা সঁতসেঁতে, তুই ওপরেই থাক। তোর মার সহ্য হয়ে গেছে, কিছু হবে না, তোর অসুখ করবে। আমি–
ক্ষেন্তির হঠাৎ খেয়াল হইল, পরী সখী নয়, ওকে শুনাইয়া বুক হালকা হইবে না।
হঠাৎ গম্ভীর হইয়া ঢোক গিলিয়া সে বলিল, ব্যাপার বুঝে আমি রাজি হলাম না। নিচে মার কাছেই রইলাম।
পরী শুইয়া পড়িল। আগাগোড়া চাদর মুড়ি দিয়া বলিল, আমার জ্বর আসছে, তুমি যাও ভাই।
.
একদিন হেমলতা জিজ্ঞাসা করিলেন, হারে, ভুবনের কোনো খোঁজ করলি না?
বনমালী বলিল, আপদ গেছে, যাক।
ঠিক সেই সময় মাথার উপর দিয়া একটা এরোপ্লেন উড়িয়া যাইতেছিল। দেখিতে দেখিতে সেটা সুন্দরবনের উপর পৌঁছিয়া গেল। মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া বনের পশুরা যেখানে আশ্রয় লইয়াছে।
স্বামী-স্ত্রী
রাত দশটায় মেনকা ঘরে এল। এ বাড়িতে সকাল সকাল খাওয়াদাওয়ার হাঙ্গামা চুকে যায়।
ছোট ঘর, চওড়ার চেয়ে লম্বায় দুহাতের বেশি হবে না। মেনকার বিয়েতে মেনকার স্বামী গোপালকে দেওয়া খাটখানাই ঘরের অর্ধেক জুড়ে আছে। খাটের সঙ্গে কোণাচেভাবে পাশ কাটানোর কৌশলে পাতা আছে গোপালের ক্যাম্পচেয়ার, চারদিকেই চেয়ারটির পাশ কাটিয়ে চলাফেরা সম্ভব। সামনে ছোট একটি টুলে পা উঠিয়ে এই চেয়ারে চিৎ হয়ে গোপাল আরাম করে বিড়ি মেশাল দিয়ে সিগারেট খায় আর বই পড়ে। পপুলার বই–উঁচুদরের বই যারা লেখেন তাদের পর্যন্ত–যে-বই পড়ে সময় কাটিয়ে মনকে বিশ্রাম দিতে হয়। ঘরের এককোণে ট্রাংক ও সুটকেস-স্টিল, চামড়া আর টিনের। ট্রাংকটি মেনকার বিয়ের সময় পাওয়া। রং এখনো উজ্জ্বল, তবে কিসে ঘা লেগে যেন একটা কোণ থেবড়ে গেছে। দেয়ালে কয়েকটি বাজে ছবি আর মেনকা ও গোপালের বড় একটি ফটো টাঙানো। শাড়ি, শাড়ি পরার ঢং, গয়নার আধিক্য আর চুল বাধার কায়দা ছাড়া ফটোর মেনকার সঙ্গে যে মেনকা ঘরে এল তার বিশেষ কোনো তফাত চোখে পড়ে না। গায়ে একটু পুরন্ত হয়েছে মনে হয়, আবার সন্দেহও জাগে। ফটোর গোপালের চেয়ে ক্যাম্পচেয়ারের গোপাল কিন্তু অনেক রোগা। এতে ফটোর ফাঁকি নেই, বিয়ের পর সত্যই গোপাল রোগা হয়ে গেছে। বিয়ে করার জন্য অথবা চাকরি করার জন্য বলা কঠিন, চাকরি আর বিয়ে তার হয়েছে প্রায় একসঙ্গে।
ঘরে এসে দরজায় খিল তুলে দিয়ে মেনকা শেমিজ ছাড়ল। খাটের প্রান্তে পা ঝুলিয়ে বসে জোরে জোরে পাখা চালিয়ে বলল, বাবা, বাঁচলাম।
গোপাল বই নামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে সায়-দেওয়া হাসি একটু হাসল। তারপর আবার বই তুলে নিল।
উহ মাগো, সেদ্ধ হয়ে গেছি একেবারে।
এবার গোপাল বই নামাল না, পড়তে পড়তেই বলল, বিশ্রী গরম পড়েছে।
টেবল ফ্যানটা তুমি আর কিনলে না।
তুমি শাড়িটা না কিনলে–
ন্যাংটো হয়ে তো থাকতে পারি না।
পাখার হাওয়া গায়ে লাগাতে তাই সে এ রকম হয়ে আছে। ঘর যেন নির্জন, একজোড়া চোখও যেন ঘরে নেই। তিন মাস বাপের বাড়িতে কাটিয়ে সাত দিন আগে এখানে এসেছে। প্রথম দিন এভাবে হাওয়া খেতে পারেনি। ছি, লজ্জা করে না মানুষের! একদেহ, একমন, একপ্রাণ যারা, তিন মাসের ছাড়াছাড়ি তাদের এমনি করে দেয়, দেখা হওয়ামাত্র চট করে এক হয়ে যেতে পারে না। তিন মাস তারা পরস্পরকে কল্পনা করেছে, কামনা করেছে, ব্যথা আর ব্যর্থতার নিশ্বাস ফেলেছে, মুক্তির আস্বাদ আর স্বাধীনতার গৌরবে আনন্দ অনুভব করেছে শাস্তির মতো, রাত জেগেছে, আবেগের চাপে সময় সময় দম যেন আটকে এসেছে কয়েক মুহূর্তের জন্য। কত অভিনব পরিবর্তন ঘটেছে দুজনের মনেই দুজনের। দেখা হবার পর আবার একদেহ, একমন, একপ্রাণ হতে খিল দেওয়া ঘরে একটা রাতের, অন্তত আধখান বা সিকিখান রাতের, সময় লাগবে বৈকি। যন্ত্রের পার্টস খুলে আবার ফিট করতে পর্যন্ত সময় লাগে–বিধাতা মিস্ত্রি হলেও লাগে।
