দাস বলে, চা খেয়েছেন?
সুশীলা বলে, না।
আসুন না আমার ওখানে, চা-টা খাওয়া যাবে।
মাখনের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাস যোগ দেয়, সেই কন্ট্রাক্টের কথাটাও আপনার সঙ্গে আলোচনা করা যাবে। আপনাকে খুঁজছিলাম।
মাখনের দুচোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সুশীলার নিশ্বাস আটকে যায়। আজ কদিন ধরে মাখন এই কন্ট্রাক্টটা বাগাবার চেষ্টা করছিল–প্রকাণ্ড কন্ট্রাক্ট, লাখ টাকার ওপর ঘরে আসবে। দাস যেন কেমন আমল দিচ্ছিল না তাকে, কথা তুললে এড়িয়ে এড়িয়ে যাচ্ছিল। ঈশ্বরীপ্রসাদকে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করতে দেখে আর তার সঙ্গে দাসের দহরম-মহরম দেখে ব্যাপার অনেকটা অনুমান করে নিয়ে আশা একরকম মাখন ছেড়ে দিয়েছিল। দাস আজ ও-বিষয়েই তার সঙ্গে কথা কইতে চায়। এই দরকারে তাকে দাস খুঁজছিল।
সম্ভ্রান্ত শহরতলিতে দাসের মস্ত বাড়ি। সামনে সম্ভ্রান্ত বাগান। অনেকগুলো চাকর-খানসামা নিয়ে এত বড় বাড়িতে দাস একা থাকে। বিয়ে করেনি, বৌ নেই। আত্মীয়স্বজনের সে সাহায্য করে কিন্তু কাছে রাখে না। শখ হলে মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গ উপভোগ করে দু-চার দিনের জন্য, ছুটি ভোগ করার মতো।
যেই আসুক সাহেব বাড়ি নেই বলে দরজা থেকে বিদায় করে দেবার হুকুম জারি করে দাস তাদের ভেতরে নিয়ে বসায়। ঘরের সাজসজ্জা আর আসবাবপত্র তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সুশীলা, নিজেদের বাড়িতে এখানকার কোনো বিশেষত্ব আমদানি করবে মনে মনে স্থির করে। তারপর আসে চা। এ কথা হতে হতে আসে কন্ট্রাক্টের। কথা। সুশীলার সামনেই আলোচনা চলতে থাকে, গভীর আগ্রহের সঙ্গে সে সব কথা শোনবার ও বোঝবার চেষ্টা করে, উত্তেজনায় তার বুকের মধ্যে টিপটিপ করে। মাখনের সঙ্গে আলোচনা আরম্ভ হবার পর সুশীলার দিকে দাসের বিশেষ মনোযোগ দেখা যায় না, কথাতেই তাকে মশগুল মনে হয়। বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ঘরে আলো জ্বলে স্নিগ্ধ।
তারপর দাস বলে, হাওয়ার্ডের সঙ্গে কথা বলা দরকার। বসুন, ফোন করে আসছি।
ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে সুশীলার দিকে চেয়ে হেসে বলে, খালি কাজের কথা বলছি, রাগ করবেন না।
সুশীলা তাড়াতাড়ি বলে, না, না।
দাস চলে গেলে চাপা গলায় সুশীলা বলে, সোয়া লক্ষের মতো হবে!
বেশিও হতে পারে।
ফেরবার পথে কালীঘাটে পুজো দিয়ে বাড়ি যাব। গলা বুজে আসে সুশীলার।
খানিক পরে ফিরে আসে দাস।
মাখনবাবু!
আজ্ঞে?
হাওয়ার্ডের সঙ্গে কথা বললাম। আপনাকে গিয়ে একবার কথা বলতে হবে। কাগজপত্রগুলো নিয়ে আপনি এখুনি চলে যান। দুটো সই করিয়ে নিয়ে আসবেন। দাস নিশ্চিন্তভাবে বসে।-আমরা ততক্ষণ গল্প করি। আপনাদের না-খাইয়ে ছাড়ছি না। দাস একটা সিগারেট ধরায়। সুশীলাকে বলে, উনি ঘুরে আসুন, আমরা ততক্ষণ আলাপ জমাই। আর এক কাপ চা খাবেন?
সুশীলা আর মাখন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। পাখা ঘোরবার আওয়াজে ঘরের স্তব্ধতা গমগম করতে থাকে। মাখন সুশীলা দুজনেরই মনে হয় আওয়াজটা হচ্ছে তাদের মাথার মধ্যে-অকথ্য বিশৃঙ্খল উদ্ভট আওয়াজ।
তারপর মাখন বলে, তুমি চা-টা খাও, আমি চট করে ঘুরে আসছি।
সুশীলা ঢোক গিলে বলে, দেরি কোরো না।
না, যাব আর আসব।
গাড়ি রাস্তায় পড়তেই মাখন ড্রাইভারকে বলে, জোরসে চালাও। জোরসে।
রাসের মেলা
আজ রাস পূর্ণিমা। রাসের মেলা বসেছে শহরতলির খালধারের এই রাস্তা আর দু-পাশে যেখানে যেটুকু ফাঁকা ঠাঁই আছে তাই জুড়ে। নামকরা মস্ত মেলা, প্রতিবছর হয়। দোকানপাট বসে অনেক, দূর থেকে বহু লোক আসে কেনাবেচা করতে, অনেকে সারা বছরের দরকারি মাদুর পাটি বঁটি-দা হাতা খুন্তি ঝুড়ি ধামা কুলো ঝাঁটা গেলাস বাটি থালা কেনে এই মেলাতে। মনোহারি কাজের জিনিস ও শখের জিনিস, জামাকাপড়, খেলনা পুতুল, খাবারদাবার এসব যতই কেনাবেচা হোক আসলে গেঁয়ো কারিগরের তৈরি গেরস্তের ওইসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের কেনাবেচাটাই মেলার বৈশিষ্ট্য। পাশে ফাঁপতে পারে না, রাস্তা চওড়া কম, একপাশে নর্দমার খাতটা আরো সংকীর্ণ করেছে রাস্তাটাকে মেলা তাই লম্বায় বড় হয়। হরদম লরিগাড়ির চলনে এবড়োখেবড়ো বড় রাস্তাটা খাল ডিঙিয়েছে কংক্রিটের পুলে উঠে। পুলের খানিক এদিকে ডাইনে গেছে মেলার রাস্তা খালের সঙ্গে সমান্তরালভাবে আধমাইল দূরে রেললাইনের তল দিয়ে উত্তরমুখে সোজা। মেলা বসে রাস্তার এ-মাথা থেকে রেলের পুল ছাড়িয়ে আরো প্রায় পোয়া মাইল দূর তক। মেলা সবচেয়ে জমাট হয় মাঝামাঝি স্থানে, সেখানে ওদিকে আছে রাস্তা থেকে খাল পর্যন্ত অনেকটা ফাঁকা জায়গা, আর এদিকে আছে পাশের রাস্তাটার ফাপালো মোড়। ফাঁকা জায়গায় থাকে নাগরদোলা, পুতুলনাচ আর সার্কাস, মজার খেলা ও নাচগানের তাঁবু! লোক গিজগিজ করে এখানে।
রাস্তা আর খালের মধ্যে টিন-ছাওয়া ছোটবড় গোলা ও আড়ত, মাঝে মাঝে দু-একটি জরাজীর্ণ পুরনো দালান। এখানে যে লাখ লাখ টাকার কারবার চলে, ভাটার সময় খালের কাদা ঠেলে সালতি ছাড়া ছোট নৌকা চলতে না পারলেও এও। বন্দরতুল্য, দেখে তা মনে হয় না–ঠাকুরদাদার জীবদ্দশার শৈথিল্য যেন শুধু মরচে পড়ে মরছে এখানে, আর কিছু নয়! এ পাশের দোকান ও বাড়িঘরগুলো অনেক উন্নত, যেহেতু আধুনিক।
লড়াইয়ের আঁধার বছরগুলোতে মেলা জমেনি। আলো না জ্বালাতে পারলে কি মেলা জমে, দিনে দিনে পাততাড়ি গুটোতে হলে। এ বছর শুধু ওই সাঁঝের বাতি না জ্বালাবার হুকুমটা বাতিল হতেই মেলা জীবন্ত হয়েছে আশ্চর্যরকম। সবাই যেন হা করে অপেক্ষা করছিল লড়াই শেষ হবার জন্য যতটা নয়, লড়াই শেষ হলে সাঁঝবাতি জ্বালিয়ে জাঁকজমকের সঙ্গে মেলা করার জন্য। গায়ে গায়ে ঘেঁসে দোকান বসেছে। তিন পো মাইল রাস্তার যেখানে ঠাঁই মিলিছে সেখানে, ভদ্রলোকের বাড়ির সামনের এক হাত চওড়া রোয়াকটুকু পর্যন্ত ভাড়া নিয়ে। চৌকি পেতে, কাঠের তক্তায় কিংবা স্রেফ বাঁশ দিয়ে মঞ্চ বেঁধে, চাচের বেড়া ও হোগলার চালা তুলে হয়েছে কোনো। দোকান, কারো ছাউনি একখানি কুড়িয়ে আনার মতো মরচে-পড়া ঢেউটিনের, কারো দুখানা রিজেক্ট পিপে, কেটেকুটে হাতুড়ি পিটে সোজা-করা ছাদ, কারো ভোলা। আকাশের নিচে ড্যাম রোদবিষ্টি ড্যাম ফ্যাশনের দোকান–যেন পটারি কারখানার নলভাঙা কেটলি, চটলা-ওঠা হাতলহীন কাপ ইত্যাদির দোকান-দোকানটাই যেন ঘোষণা যে বড়লোক বাবুদের জিনিস, একটু খুঁতওলা জিনিস, তাতে আর কী হয়েছে, এখানে কিনতে পাবে এমন সস্তায় তোমার পয়সায় কুলোয়, এ সুযোগ ছেড়ো না, টিনের মগে চা না খেয়ে বাবুরা যে কাপে খান সেই কাপে, শুধু একটু চটলা-ওঠা হাতলহীন কাপে, চা খাও! আর সত্যি কথা, কাপ-কেটলির দোকানে কী ভিড় মেয়েপুরুষের, চা খাওয়া যাদের নমাসে মাসে সর্দিকাশির ওষুধ হিসেবে, বিয়োনি মেয়ের ব্যথার জোর বাড়িয়ে তাকে রেহাই দেবার টোটকা হিসাবে।
