সবিতা মৃদু হাসিয়া বলিল, তার কি ঠিক আছে কিছু!
সবিতার গাড়ি চলিয়া গেলে বিমল ভাবিতে লাগিল, এখন কী করা যায়? একবার সে বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা দামি ঘড়িটার দিকে চাহিয়া দেখিল। হরেন তাকে একদিন ঘড়িটি কিনিয়া দিয়াছিল। এত শিগগির বাড়ি ফিরিয়া কোনো লাভ নাই। মাধুরীদের বাড়িতে যদি যায়, কেমন হয়? মাধুরী হয়তো দু-একখানা গান শোনাইতে পারে, তারপর হয়তো তার সঙ্গে বেড়াইতে যাইতেও রাজি হইতে পারে। কিন্তু বড় ক্ষুধা পাইয়াছে, কিছু খাইয়া যাওয়া দরকার, মাধুরী তো শুধু এক কাপ চা খাইতে দিবে।
.
সেদিন রাত্রি নটার সময়ও হরেন বাড়ি ফিরিল না। নরেন আর বিমলকে ভাত দিয়া। মায়া দুটি দুধও দুজনের থালার সামনে আগাইয়া দিল।
বিমল আশ্চর্য হইয়া বলিল, দুধ কেন?
নরেন বলিল, দাদার দুধ আছে তো?
মায়া বলিল, ওঁর দুধ লাগবে না।
খাইয়া উঠিয়া নরেন ঘরে গেল, আপিসে একজন একপয়সা দামের একটি চুরুট উপহার দিয়াছিল, বিছানায় আরাম করিয়া বসিয়া সবে চুরুটটি ধরাইয়াছে, হরেনের ছোট মেয়ে অমলা আসিয়া খবর দিল, বাবা তোমায় ডাকছে কাকু।
নরেন অন্য কথা ভাবিতেছিল, ইতিমধ্যে দাদা কখন বাড়ি ফিরিয়াছে টেরও পায় নাই। জানালার সিমেন্টের উপর চুরুটটি নামাইয়া রাখিয়া একটু অস্বস্তির সঙ্গেই সে হরেনের কথা শুনিতে গেল। এমন সময় বাড়ি ফিরিয়া তাকে ডাকিয়া হরেনের কী বলিবার থাকিতে পারে?
হরেন তাকে পাঁচটি টাকা দিয়া বলিল, একেবারেই টাকা নেই বলছিলে, এই টাকা কটা রাখো। আর শোনো, বসাকদের কোম্পানিতে একটা কাজ ঠিক করে এলাম। বুড়ো কদিন থেকে আমায় বলছিল–তুমি তো চেন বুড়োকে, চেন না? শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, কিন্তু কী আর করা যায়, সংসার তো চালানো চাই। মেয়েটারও বিয়ে দিতে হবে দুদিন পরে।
এইসব ভেবে–
হরেনের ভাব দেখিয়া মনে হয়, একটা চাকরি ঠিক করিয়া আসিয়া সে যেন অপরাধ করিয়াছে এবং নিজেকে সমর্থন করার জন্য নরেনের কাছে কৈফিয়ত দিতেছে। হঠাৎ থামিয়া গিয়া সে ডাকিল, অলি!
অমলা আসিলে বলিল তোর কাকিমাকে বল তো গিয়ে, আমি ভাত খাব না, শুধু দুধ খাব।
নরেন নিজেই মায়াকে খবরটা জানাইয়া আসিল। হরেনের চাকরির খবরের চেয়ে সে শুধু দুধ খাইবে এই খবরটাই যেন মায়াকে বিচলিত করিয়া দিল বেশি। গৃহিণীর কর্তব্য পালনের জন্যই সে যে আজ একফোঁটা দুধও রাখে নাই, দুধের কড়াইটা পর্যন্ত মাজিবার জন্য কলতলায় বাহির করিয়া দিয়াছে! কী হইবে এখন?
বিমলকে ডাকো শিগগির–আর, কআনা পয়সা দাও।
বিমল মোড়ের ময়রার দোকান হইতে দুধ আনিতে গেল, নরেন ঘরে গিয়া আবার বিছানায় আরাম করিয়া বসিল। চুরুটটা নিভিয়া গিয়াছে। রাত্রে সহজে ঘুম না আসিলে দরকার হইতে পারে ভাবিয়া দুটি সিগারেট নরেন সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছিল–ঘুম না আসিলে গভীর রাত্রে ক্রমাগত সিগারেট টানিবার ইচ্ছাটা কেন যে প্রচণ্ড হইয়া ওঠে কে জানে! বিমলকে পাঁচটা সিগারেটও আনিতে দেওয়া হইয়াছে, সুতরাং নিশ্চিন্ত মনেই সঞ্চিত সিগারেটের একটি ধরাইয়া সে টানিতে লাগিল। যার যা টানা অভ্যাস সেটা না হইলে কি তার আরাম হয়!
হরেন আবার চাকরি করিবে, সংসারের অভাব অনটন দূর হইবে, এ চিন্তার চেয়ে অন্য একটা অতি তুচ্ছ কথা নরেনের বেশি মনে হইতে থাকে। কাল বাজার করার পয়সা কোথায় পাইবে সে ভাবিয়া পাইতেছিল না, হরেন পাঁচটা টাকা দেওয়ায় এই দুশ্চিন্তার হাত হইতে সে রেহাই পাইয়াছে। বাজারের পয়সা পর্যন্ত না রাখিয়া দুটাকা দিয়া লটারির টিকিট কিনিয়াছে, এই চিন্তাটাও মনের মধ্যে বড় বেশি বিধিতেছিল। হাজার পঞ্চাশেক টাকা পাইয়া গেলে যে কী মজাটাই হইবে; এ কল্পনায় যেন তেমন সুখ হইতেছিল না। এবার চোখ বুজিয়া নিশ্চিন্ত মনে কল্পনাকে আমল দেওয়া সম্ভব হইয়াছে।
পড়ার টেবিলের সামনে বসিয়া বিমল ভাবিতে থাকে, এতরাত্রে সে যে কষ্ট করিয়া তার খাওয়ার জন্য দুধ কিনিয়া আনিয়াছে, পাকে-প্রকারে জেঠামহাশয়কে এ খবরটা জানাইয়া দিতে পারিলে বোধ হয় ভালো হইত। সকালের ব্যাপারেও জেঠামশায় যদি চটিয়া থাকে, কথাটা শুনিয়া খুশি হইতে পারে। খুশি হইলে হয়তো–
রাত্রির মতো মায়ার সংসারের হাঙ্গামা চুকিতে এগারটা বাজিয়া গেল। হরেন তখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। অন্যদিন সন্ধ্যার পরেই নেশা জমিয়া আসে, এগারটা-বারটা পর্যন্ত ঝিমানোর আরাম ভোগ করিয়া সে ঘুমাইয়া পড়ে। আজ সে সুখটা ফসকাইয়া গিয়াছে। রাত নটা পর্যন্ত বাহিরে বাহিরে ঘুরিয়া এমন শ্রান্তই সে হইয়া পড়িয়াছিল যে ভালো করিয়া নেশা জমিবার আগেই ঘুম আসিয়া গিয়াছে। নরেন চিৎ হইয়া শুইয়া তৃতীয়বার লটারির টিকিটের লেখাগুলি খুঁটিয়া খুঁটিয়া পড়িতেছে। বিমলও পড়ার টেবিল ছাড়িয়া কয়েকখানা বই আর খাতা-পেন্সিল লইয়া বিছানায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। মুখে তার গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ। কিছুক্ষণ হইতে সে মনে মনে একটা গল্প গড়িয়া তুলিতেছিল।কলেজ হইতে সবিতার গাড়িতে মোড় পর্যন্ত আসিবার সময় একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়া গিয়াছে, হাসপাতালে সে আর সবিতা একটা ঘরে পাশাপাশি দুটি বেডে পড়িয়া আছে। সবিতার বিশেষ কিছু হয় নাই, সবিতাকে বাঁচাইতে গিয়া তার আঘাত লাগিয়াছে গুরুতর। ডাক্তারের বারণ না মানিয়া সবিতা বেড ছাড়িয়া উঠিয়া আসিয়া তার কপালে হাত বুলাইয়া দিতেছে। গল্পটি যখন জমিয়া আসিয়াছে, হঠাৎ তখন বিমলের মনে পড়িয়া গিয়াছে, আহত হইয়া এক হাসপাতালে গেলেও তাদের তো এক ওয়ার্ডে রাখিবে না!
