প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবার্ট গ্রিন ইঙ্গারসোলের একটি উক্তি দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার এই বইটি– ‘বিশ্বাসী মন খাঁচায় বন্দি পাখি, আর মুক্তমন যেন মুক্ত বিহঙ্গ— ঘন মেঘের পর্দা ভেদ করে উড়ে চলা অবিশ্রান্ত এক ডানামেলা ঈগল’। বিশ্বাসের ভাইরাসের কুফলগুলো বোঝার পর বোধ হয় কারোরই এ বিষয়ে সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। বইয়ের শেষ প্রান্তে এসে আমরা আবারো সেই ইঙ্গারসোলের শরণাপন্ন হব। ইঙ্গারসোল ছিলেন পেশায় আইনজীবী, অসাধারণ বাগ্মী, এবং উনবিংশ শতকের প্রখ্যাত অজ্ঞেয়বাদী মুক্তচিন্তক। Ingersoll’s Vow’ নামে ইঙ্গারসোলের ছোট একটা রচনা আছে, যেটা আমার খুব প্রিয়[২১১]। সে লেখাতে ইঙ্গারসোল ব্যক্ত করেছেন, যখন তিনি সকল বিশ্বাসের ভাইরাস থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিলেন চারপাশের সবকিছুই প্রাকৃতিক, ঐশ্বরিক কিছু নেই, তখন কী ভীষণ আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল তার মন। রায়হান আবীর তাঁর ‘মানুষিকতা’ গ্রন্থে সে অংশটির অনুবাদ সংকলিত করেছিলেন ‘ইঙ্গারসোলের প্রতিজ্ঞা শিরোনামে, যেটি সবসময়ই আমার কাছে এক অনাবিল প্রেরণার উৎস[২১২]।
‘যেদিন নিশ্চিতভাবে বুঝে গেলাম আমার চারপাশের সবকিছুই প্রাকৃতিক, সকল দেবতা, অপদেবতা কিংবা ঈশ্বর মানুষের সৃষ্ট পৌরাণিক চরিত্র ব্যতীত কিছুই নন, সেদিন সত্যিকারের স্বাধীনতার তীব্র আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছিল আমার মন, শরীরের প্রতিটি কণা, রক্তবিন্দু, ইন্দ্রিয়। আমাকে সীমাবদ্ধ করে রাখা চার দেয়াল টুকরো টুকরো হয়ে মিশে গেল ধুলোয়, আলোর স্রোতে আলোকিত হয়ে গেল আমার অন্ধকূপের প্রতিটি কোণ। সেদিন থেকে আমি কারও চাকর, সেবক বা বান্দা নই। এই পৃথিবীতে আমার কোনো মনিব নেই, আমার কোনো মনিব নেই এই সীমাহীন মহাবিশ্বেও।
আমি স্বাধীন, মুক্ত– চিন্তা করতে, চিন্তারাজি প্রকাশে, আদর্শ নির্ধারণে, ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গী করে নিজের মতো বাঁচতে। আমি স্বাধীন আমার মানসিক এবং শারীরিক ক্ষমতা ব্যবহারে, প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে কল্পনার ডানা। মেলে উড়ে যেতে, নিজের মতো স্বপ্ন দেখতে, আশা করতে। আমি স্বাধীন– নিজের মতো ভাবতে। আমি স্বাধীন– নির্দয়, উগ্র ধর্মকে অস্বীকার করতে। আমি স্বাধীন– অসভ্য, মূখের ‘অলৌকিক’ গ্রন্থসমূহ এবং এগুলোকে পুঁজি করে ঘটা অসংখ্য নিষ্ঠুরতাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। আমি স্বাধীন অসংখ্য মহাজাগতিক মিথ্যা থেকে, স্বাধীন সীমাহীন শাস্তির ভীতি থেকে, আমি স্বাধীন ডানাওয়ালা ফেরেশতা থেকে, শয়তান থেকে, জ্বিন-ভূত এবং ঈশ্বর থেকে। জীবনে প্রথমবারের মতো আমি স্বাধীন।
আমার চিন্তার রাজ্যে সেদিন থেকে নেই আর কোনো নিষিদ্ধ জায়গা, নেই কোনো অশরীরী শৃঙুলি যা বেঁধে রাখে আমার অবয়বকে, আমাকে রক্তাক্ত করার জন্য নেই কোনো অলৌকিক চাবুক, আমার মাংসের জন্য নেই কোনো আগুন। আমার মাঝে নেই ভয়, আমার মাঝে নেই অন্যের দেখানো পথে হাঁটার দায়বদ্ধতা, আমার প্রয়োজন নেই কারও সামনে অবনত হওয়া, কাউকে পূজা করা, আমার প্রয়োজন নেই মিথ্যে কথা বলারও। আমি মুক্ত। ভয়-ভীতি, মেরুদণ্ডহীনতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সেদিন আমি প্রথমবারের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, জগতকে নতুন করে দেখার, ভাবার চেতনা নিয়ে।
আমার অন্তর সেদিন কৃতজ্ঞতায় ভরে গিয়েছিল। আমি কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিলাম ইতিহাসের সেই সব নায়কদের প্রতি, মানুষের প্রতি যারা নিজের জীবন বিপন্ন, বিসর্জন করেছিল মানুষের হাত এবং মস্তিষ্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে। আমি ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম পৃথিবীর আলোকিত সকল সন্তানদের, যাদের কেউ আত্মাহুতি দিয়েছিল মুখের সাথে যুদ্ধে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল অন্ধ প্রকোষ্ঠে আ-বদ্ধাবস্থায়, যাদের মাংস পুড়েছিল ধর্মান্ধদের আগুনে। আলোকিত সেইসব সাহসী মানুষেরা, যারা এসেছিল পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, যাদের চিন্তায়-কর্মে স্বাধীনতা পেয়েছে মানুষের সন্তানেরা। অতঃপর আমি নিচু হলাম, যে আলোর মশাল তারা জ্বালিয়েছিলেন সে আলোর মশাল তুলে নিলাম নিজের হাতে, উঁচু করে তুলে ধরলাম সেটা, এ আলো নিশ্চয়ই একদিন জয় করবে সকল অন্ধকার।
ড.ডেরেল রে যে কথাগুলো বলে তার ‘গড ভাইরাস’ বইটি শেষ করেছেন, সে কথাগুলো উচ্চারণ করে আমিও সমাপ্তি টানবো আমার এই বিশ্বাসের ভাইরাস বইটির[২১৩]–
‘ভাইরাস মুক্ত জীবনের আস্বাদন কোন সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, বরং একটি চলমান যাত্রাপথের নাম। আমরা সবাই এই ভাইরাস দিয়ে কোন না কোন ভাবে আক্রান্ত, এবং আমরা নিজেদের অজান্তেই বয়ে নিয়ে যাই অসুস্থ বিশ্বাস, মতামত কিংবা ধারণা। আমাদের অনেকের মাথাই আক্রান্ত করে ফেলা হয়েছে আমাদের শিশু বয়সেই আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পানপাত্র হাতে তুলে দিয়ে। আক্রান্ত মননকে প্রতিষেধক দিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ করে ফেলাই হবে আমাদের যাত্রাপথের লক্ষ্য। আমরা যদি বিশ্বাসের ভাইরাসের কুফলগুলো সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থাকতে পারি, তবেই আমরা ভাইরাস মুক্ত সমাজ প্রত্যাশা করতে পারি।
আর সেটা যদি আমরা পারি, তাহলে ইঙ্গারসোলের মতোই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে। পারব, এ আলো একদিন জয় করবে সকল অন্ধকার।
৯. সূত্র / তথ্য
১ দেব প্রসাদ দেবু, বিশ্বাসের ভাইরাস: মেনে নয়, মনে নিন, মুক্তমনা, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৪; বইনিউজ২৪, মার্চ ২০, ২০১৪ ইত্যাদি।
