‘মেয়েরা তেঁতুলের মত, কখনো কখনো তেঁতুলের থেকেও বেশী খারাপ! তাদের দেখলে ছেলেদের মুখ থেকে লালা বের হয়,ছেলেদের দিলের মধ্যে লালা বের হয় এবং যাকেই ছেলেরা দেখে তাকেই বিয়ে করতে ইচ্ছা হয়, লাভ ম্যারেজ করতে ইচ্ছা হয়’!
কেবল ইসলাম ধর্মে নয়, সকল ধর্মেই মূলত কম বেশি একই অবস্থা। হিন্দু ধর্মের প্রসঙ্গে আসা যাক। হিন্দুধর্মের মূল গ্রন্থ বেদ। এজন্য অনেকে হিন্দুধর্মকে বৈদিক ধর্ম হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। হিন্দুধর্মের বেদ চারটি; যথা ঋগ্বেদ, সামবেদ, অথর্ব বেদ ও যজুর্বেদ। এই যজুর্বেদ দুই। ভাগে বিভক্ত–একটি হচ্ছে কৃষ্ণযজুর্বেদ বা তৈত্তরীয় সংহিতা অন্যটি শুক্লযজুর্বেদ; এই শুক্লযজুর্বেদ আবার দুই ভাগে বিভক্ত, একটি শতপথ ব্রাহ্মণ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ। শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত শতপথ ব্রাহ্মণে নারীকে তুলনা করা হয়েছে এভাবে, “সে ব্যক্তিই ভাগ্যবান, যার পশু সংখ্যা স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে বেশি” (২/৩/২/৮)। পরের আরেকটি শ্লোকে পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিতে নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান; “বজ বা লাঠি দিয়ে নারীকে দুর্বল করা উচিৎ, যাতে নিজের দেহ বা সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার না থাকতে পারে” (৪/৪/২/১৩)। এর থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্যের আর প্রয়োজন আছে? বৃহদারণ্যক উপনিষদে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেন, “স্ত্রী স্বামীর সম্ভোগ কামনা চরিতার্থ করতে অসম্মত হলে প্রথমে উপহার দিয়ে স্বামী তাকে ‘কিনবার’ চেষ্টা করবে, তাতেও অসম্মত হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মেরে তাকে নিজের বশে আনবে” (৬/৪/৭, ১/৯/২/১৪)। দেবীভাগবত-এ নারীর চরিত্র সম্পর্কে বলা আছে (৯:১) : “নারীরা জেঁকের মত, সতত পুরুষের রক্তপান করে থাকে। মুখ পুরুষ তা বুঝতে পারে না, কেননা তারা নারীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। নারীদের সম্পর্কে উচ্চারিত হয়েছে চরম অবমাননাকর কিছু শ্লোক মনুসংহিতায়। কিছুদিন আগে রণদীপ বসু মুক্তমনা ব্লগে সিরিজ আকারে লিখেছিলেন, ‘অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব’ নামের আট পর্বের একটি সিরিজ। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন,
‘পৃথিবীতে যতগুলো কথিত ধর্মগ্রন্থ রয়েছে তার মধ্যে মনে হয় অন্যতম বর্বর, নীতিহীন, শঠতা আর অমানবিক প্রতারণায় পরিপূর্ণ গ্রন্থটির নাম হচ্ছে হিন্দুদের মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা’।
কথাটি মিথ্যে নয়। মনুর দৃষ্টিতে নারী স্বভাব-ব্যভিচারিণী, কামপরায়ণা; কাম, ক্রোধ, পরহিংসা, কুটিলতা ইত্যাদি যত খারাপ দোষ আছে, সবই নারীর বৈশিষ্ট্য, এগুলো দিয়েই নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে-! যেমন, মনুসংহিতার একটি শ্লোকে (২: ২১৩) বলা হয়েছে–
স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ্ দূষণম্।
অতোহৰ্থান প্রমাদ্যন্তি প্রমদাসু বিপশ্চিতঃll
অর্থাৎ, ইহলোকে (শৃঙ্গার চেষ্টার দ্বারা মোহিত করে) পুরুষদের দৃষিত করাই নারীদের স্বভাব; এই কারণে পণ্ডিতেরা স্ত্রীলোক সম্বন্ধে কখনোই অনবধান হন না।
আরো বলা হয়েছে—
মাত্রা স্বভ্রা দুহিত্ৰা বা না বিবিক্তাসনো ভবেৎ।
বলবানিন্দ্রিয়গ্রামো বিদ্বাংসমপি কৰ্ষতি।। (২:২১৫)।
অর্থাৎ, মাতা, ভগিনী বা কন্যার সাথে কোনও পুরুষ নির্জন গৃহাদিতে বাস করবে না, কারণ এদের চিত্ত এতোই চঞ্চল যে, এরা বিদ্বান ব্যক্তিকেও আকর্ষণ করে কামের বশবর্তী করে তোলে।
মনু সংহিতা মতে, নারীর কর্তব্য গৃহকর্ম এবং সন্তান উৎপাদন (৯:২৬)। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্যই নারী এবং সন্তান উৎপাদনার্থে পুরুষ সৃষ্টি হয়েছে (৯:৯৬)। নারী মন্ত্রহীন, অশুভ (৯:১৮), নারীদের জন্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত-অমল্ক (২:৬৬); কন্যা, যুবতী, রোগাদি পীড়িত ব্যক্তির হোম নিষিদ্ধ এবং তা করলে তারা নরকে পতিত হয় (১১:৩৭)!
স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে–
বিশীলঃ কামবৃত্তো বা গুণৈবা পরিবর্জিতঃ
উপচর্যঃ স্ট্রিয়া সাধা সততং দেববৎ পতিঃ।। (৫:১৫৪)
বাংলা করলে দাঁড়ায়, স্বামী দুশ্চরিত্র, কামুক বা নিষ্ঠুণ হলেও তিনি সাধ্বী স্ত্রী কর্তৃক সর্বদা দেবতার ন্যায় সেব্য।
কোনো নারী (স্ত্রী) যদি স্বামীকে অবহেলা করে, ব্যভিচারিণী হলে সংসারে তো নিন্দিত হবেই সেই সাথে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগেও আক্রান্ত হবে। শুধু তাই নয় পরজন্মে শৃগালের গর্ভে জন্ম নিবে সেই নারী (৫:১৬৩-১৬৪); শুধু স্বামীর সেবার মাধ্যমেই নারী স্বর্গে যাবে (৫:১৫৫)। সার্ধী নারী কখনো জীবিত অথবা মৃত স্বামীর অপ্রিয় কিছু করবেন না (৫:১৫৬)। স্বামী মারা গেলে স্ত্রী সারা জীবন ফলমূল খেয়ে দেহ ক্ষয় করবেন, কিন্তু অন্য পুরুষের নামোচ্চারণ করবেন না। (৫:১৫৭)। অথচ স্ত্রী মারা গেলে দাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ করেই স্বামী আবার দার পরিগ্রহ করবেন (৫:১৬৮)।
আমাদের চারপাশের প্রচলিত ধর্মগুলোর মধ্যে বৌদ্ধধর্মকে অপেক্ষাকৃত উদার, অহিংস এবং প্রগতিশীল বলে মনে করা হয়। কিন্তু বৌদ্ধশাস্ত্র নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করলে নারীদের সম্পর্কে যে ধারণা আমরা পাই, তাকে আর যাহোক প্রগতিশীল বলার কোন উপায় নেই। এত জ্ঞানবান, এত দয়াবান, অহিংসার প্রচারক বলে বুদ্ধকে প্রচার করা হয়েছে, তিনি তার সঙ্ঘে কোন নারী ভিক্ষু রাখতে চাননি। পরে অবশ্য তিনি মত পরিবর্তন করেন, নারীরা সঙ্ঘে ঢোকার অনুমতি পায়, কিন্তু তিনি নস্ট্রাডামুসের মত ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন যে, মেয়েদের সংঘে ঢোকানোর ফলে বৌদ্ধ জামানার আয়ুষ্কাল নাকি অর্ধেকে নেমে আসবে।
