ধর্মান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ, ঘৃণ্য চতুরতা,
মানুষের পৃথিবীকে শত খণ্ডে বিভক্ত করেছে
তারা টিকিয়ে রেখেছে শ্রেণিভেদ ঈশ্বরের নামে।
ঈশ্বরের নামে তারা অনাচার করেছে জায়েজ।
ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়ে আছে
চলে যাক সব পরপারে বেহেস্তে তাদের
আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে,
দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায়
আগামীর স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাবো সমতার বীজ।
০৬. নারী: ধর্ম-ভাইরাসের প্রধানতম শিকার
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের একটি ঘটনা। সৌদি আরবের এক হতভাগ্য নারী তার এক স্কুল-বন্ধুর কাছে থেকে একটি ছবি আনতে গিয়ে সেই বন্ধু আর তার ৬ জন সাঙ্গপাঙ্গদের দ্বারা ধর্ষিত হন। এ ধরণের কোন ঘটনায় ধরে নেয়া হয় যে, ধর্ষণকারীর শাস্তি হবে। অন্তত ধর্ষিতাকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন হতভাগ্য মেয়েটির পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু বিধি বাম। সৌদি আইনে (যার মূল ভিত্তি হচ্ছে ইসলামের শরিয়া), হতভাগ্য নারীটিই উল্টে বিচারের রায়ে দুশোটি বেতের আঘাত পেয়েছেন।
ছবি। পেজ ১৫২
চিত্র: সৌদি আরবে ধর্ষণকারীর বদলে ধর্ষিতাকেই বেত্রাঘাত করার হয়। [১৪০]
ব্যাপারটা হয়তো অনেককেই অবাক করবে। কিন্তু যারা ধর্মের আইনকানুনগুলো জানেন, তাদের অবাক করেনা। ইসলামী আইনে ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য চার জন পুরুষ’ চাক্ষুষ সাক্ষীর বিধান রয়েছে। কোরআনের সুরা নিসায় (৪:১৫) বর্ণিত আছে–
‘তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা (ব্যভিচারের) দুষ্কর্ম নিয়ে আসবে, তাদের (বিচারের) ওপর তোমরা নিজেদের মধ্যে থেকে চারজন সাক্ষী যোগাড় করবে, অতঃপর সে চারজন লোক যদি ইতিবাচক সাক্ষ্য প্রদান করে তাহলে সে নারীদের তোমরা ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ করে রাখবে, যতদিন না, মৃত্যু এসে তাদের সমাপ্তি ঘটিয়ে দেয়, অথবা আল্লাহতায়ালা তাদের জন্যে অন্য কোনো ব্যবস্থা না করেন।’
আর সাক্ষীরা যদি নারী হন তাহলে একজন পুরুষ সাক্ষীর পরিবর্তে দুই জন মহিলা সাক্ষী নেওয়া যেতে পারে। বলা বাহুল্য, আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন পরীক্ষার (যেমন ডিএনএ কিংবা অন্যান্য মেডিকেল টেষ্ট ইত্যাদি) কোন স্থান শরিয়া আইনে নেই।
সাক্ষী হিসেবে যে একজন পুরুষ সমান দুজন নারী তা কোরআনে (সুরা বাকারা, ২:২৮২) সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখিত আছে–
“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গত ভাবে তা। লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া এবং ঋণ গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অত:পর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গত ভাবে লিখাবো দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়…’।
এখানে লক্ষণীয় যে, এ ধরণের সাক্ষী সাবুদের ক্ষেত্রে দুজন পুরুষ সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে। দুজন পুরুষ না পাওয়া না গেলে মহিলাদের দিয়ে কাজ চলতে পারে, তবে একজন পুরুষের বদলে সেক্ষেত্রে দুজন নারীর সাক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। পুরুষ ছাড়া কেবল মহিলাদের সাক্ষী কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাথে অন্তত একজন পুরুষ থাকতেই হবে। যারা কোরআনের মধ্যে সব সময় নারী-পুরুষের সাম্য খুঁজে পান, যারা বৈষম্যের অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করেন, তারা এর কী জবাব দেবেন? গবেষকেরা বলেন, নারীরা চিন্তায় চেতনায় পুরুষদের থেকে হীন, তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল, তাদের বিচার বুদ্ধি কম, তারা ঠিকমত সাক্ষ্য দিতে পারবে না এই ভাবনা থেকেই মূলত— দুজন নারীর সাক্ষ্যকে একজন পুরুষের সমতুল্য করা হয়েছে[১৪১]।
এখন বোধ হয় পাঠকেরা বুঝতে পারছেন, সৌদি আরবে ধর্ষিতার শাস্তি হওয়ার মূল কারণ। তিনি অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে আসলে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেন যে তিনি বিবাহ বহির্ভুত যৌন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। ইসলামি আইনে ‘জেনা’ হলো, ব্যভিচার, বিবাহ-বহির্ভূত যৌনমিলন, ধর্ষণ ও পতিতাবৃত্তি। এ পর্যায়ে উল্লেখিত সাক্ষী যোগাড় করে ধর্ষণ প্রমাণ করতে না পারলে সাধারণত নারীটিকেই জেনা’র দায়ে শাস্তি দেয়া হয়। এটাই ইসলামী আইন।
অনেকে বলেন, সৌদি আরবের এই ঘটনায় শাস্তি বরং কমই দেয়া হয়েছে। ক’ বছর আগে সোমালিয়ার একটা ঘটনার কথা পড়েছিলাম, সেখানে এধরণের ধর্ষণের ঘটনায় ১৩ বছরের একটা মেয়েকে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল- ইসলামী আইন মোতাবেকই এই শাস্তি কার্যকর হয়েছিল। হাদিস থেকে দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ (দঃ) তাঁর জীবদ্দশায় ‘রজম (পাথর মেরে হত্যা) নামক অমানবিক-নৃশংস শরিয়ার আইনটির দ্বারা বহু ব্যভিচারী নরনারীকে পাথর মেরে হত্যা করেছিলেন। একটি হাদিসের উদাহরণ দেয়া যাক–
