১) এটা মানুষকে সংক্রমিত করে।
২) অন্য ধারণার (ভাইরাসের প্রতি প্রতিরোধ এবং এন্টিবডি তৈরি করে।
৩) কিছু বিশেষ মানসিক এবং শারীরিক ফাংশনকে অধিকার করে ফেলে, এবং সেই ব্যক্তির মধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে সেই ব্যক্তির পক্ষে তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
৪) বিশেষ কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করে ভাইরাসের বিস্তারে
৫) বাহককে অনেকটা প্রোগ্রাম করে ফেলে ভাইরাসের বিস্তারে সহায়তা করতে।
আরো একটি মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের অনেকেই শৈশবে সর্দি কাশি গলা ব্যথা সহ অনেক উপসর্গের সম্মুখীন হতাম। শিশুরা ভাইরাসাক্রান্ত হয় বেশি, কারণ পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়ে অরক্ষিত শিশুকে কাবু করা সহজ। তাই শৈশবেই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে বেশীমাত্রায়। ঠিক একইভাবে ধর্মগুলোও ‘অরক্ষিত শৈশব’কে বেছে নেয় ভাইরাসের প্রসারে। মুক্তমনা ব্লগার আদিল মাহমুদ ‘ধর্মশিক্ষার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার সরল পাঠ’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ লিখছেন মুক্তমনায়[৯১]।
সিরিজটির প্রথম পর্বে তিনি দেখিযেছেন ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার নামে কিভাবে শিশু-কিশোরদের ‘ব্রেন-ওয়াশ’ করা হয়। তিনি বাংলাদেশের সরকারী শিক্ষা বোর্ডের নবম-দশম শ্রেণীর ইসলাম-শিক্ষা বইটির (বর্তমান পাঠ্যসূচীতে বইটির শিরোনাম বদলে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ রাখা হয়েছে) কিছু স্ক্যান করা পৃষ্ঠা উদ্ধৃত করেছেন, যা রীতিমত আতঙ্কজনক। বইটিতে ‘কুফর’ কী, ‘কাফির কারা’ এ সংক্রান্ত আলোচনা আছে, যা রীতিমত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত। অবিশ্বাসীরা হল কাফের; তারা অকৃতজ্ঞ, যাদের দুনিয়ায় কোন মর্যাদা নাই, তারা অবাধ্য ও বিরোধী, জঘন্য জুলুমকারী, হতাশ/নাফরমান। একই বইয়ের ৫৩ পাতায় বেশ গুরুত্ব সহকারে জিহাদ সম্পর্কিত শিক্ষা বর্ণিত হয়েছে। শুধু জিহাদের সংজ্ঞা নয়, কিভাবে এবং কাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে তা স্পষ্ট ভাষাতেই বর্ণনা করা হয়েছে রেফারেন্স সহকারে—
‘জিহাদের প্রকারভেদঃ জিহাদ দুই প্রকার। যথা : ১. যাহিরী বা প্রকাশ্য জিহাদ। ২. বাতিনী বা অপ্রকাশ্য জিহাদ।
প্রকাশ্য জিহাদ
ইসলামের চিরশত্রু কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদী ইত্যাদি। এরা সর্বদা ইসলামকে দুনিয়া থেকে মুছে দিতে চায়। এই আল্লাহদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে প্রকাশ্য জিহাদ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন “হে নবী, কাশ্রি ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও তাদের প্রতি কঠোর হও।” (সূরা তাওবা : ৭৩)”
অপ্রকাশ্য জিহাদ
ইবলিস ও কু-প্রবৃত্তি মানুষের চরম শত্রু। শয়তানের ফাঁদে পড়ে ক-প্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়। এই চরম শত্রু ইবলিস ও কু-প্রবৃত্তির (নফস) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে বাতিনী জিহাদ বলা হয়। কু-প্রবৃত্তিকে দমন করা কঠিন কাজ। তাই একে বড় জিহাদ বলা হয়। কু-প্রবৃত্তি ও শয়তানকে দমন করতে পারলে জান্নাতের পথ সুগম হয়। নবী কারীম (স) বলেছেন- নফস বা কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ হল বৃহওর জিহাদ।” আল্লাহর দ্বীন কায়েম তথা দুনিয়াতে শানিত-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য জিহাদ করা প্রতিটি মুসলমানের পবিত্র দায়িত্ব। ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলায় নিজের জানমাল সর্ব বিলিয়ে দেওয়া প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য। আমরা ইসলামের পথে চলব। ধর্মদ্রোহীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করব।’
বাংলাদেশের ইসলাম-শিক্ষা বইটির এই অংশটুকু পড়লে কিন্তু অনেকেরই মনে হবে বিন লাদেন, বাংলা ভাই, শায়খ রহমানদের সন্ত্রাসী বলা এই ধর্মশিক্ষার আলোকে মোটেই যুক্তিসংগত নয়। বইটি পড়লে আরো মনে হবে ইসলাম শিক্ষা বইটি যেন ইমাম আল গাজ্জালীর উগ্র আদর্শের আলোকে লেখা হয়েছে যিনি ইসলামের মধ্যে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী মোতাজিলাদের মুক্তবুদ্ধিকে এক সময় ধ্বংস সাধন করেন নির্মমভাবে। জিহাদ সম্বন্ধে গাজ্জালীর বাণী ছিল এরকমের–
“প্রত্যেক মুসলিমকে বছরে অন্তত একবার অবশ্যই জিহাদে যেতে হবে… দুর্গের ভিতরে যদি নারী এবং শিশুরাও থাকে, তবু তাদের বিরুদ্ধে ভারী পাথর বা তীর নিক্ষেপের যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে কিংবা ডুবিয়ে মারা যেতে পারে”।
গাজ্জালী, মওদুদীদের উগ্র ভাবধারা শিশু-কিশোরদের সংক্রমিত করার মাধ্যমে কীভাবে ভাইরাস আক্রান্ত মনন কীভাবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে সেটা বোধ হয় না বললেও চলবে। পাকিস্তানে নাকি শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়, এ ফর আলিফ, বি ফর বন্দুক[৯২]। সে দেশের ভাইরাস আক্রান্ত সেনাবাহিনী পরিণত বয়সে সুযোগ পেয়ে নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ মানুষ মারবে আর দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি করবে, এ আর বিচিত্র কী! মর্নিং শোজ দ্য ডে!
ছবি। পেজ ১১৬
চিত্র: পাকিস্তানে শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়, এ ফর আলিফ, বি ফর বন্দুক
ধর্মকে আসলে স্রেফ ভাইরাস হিসেবেই চিহ্নিত করা প্রযোজনা ধর্মের সংক্রমণ, পুনরুৎপাদন এবং প্যারাসাইটিক বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল ভাইরাসের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ বিশ্বাসীরা একে ভাইরাস হিসেবে না দেখে নীতি-নৈতিকতার উৎস হিসেবেই দেখতে চায়। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে দেখব, ধর্ম নৈতিকতার উৎস হিসেবে সত্যই দাঁড়াতে পারে কিনা।
০৫. ধর্ম কি সত্যই নৈতিকতার উৎস?
প্রাচীনকাল থেকেই ঈশ্বরের প্রতি অগাধ আনুগত্য এবং ধর্ম বিশ্বাসকেই মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের একমাত্র অবলম্বন বলে মনে করা হয়েছে। পাশ্চাত্য বিশ্বে গোঁড়া খ্রিস্টধর্মের অনুসারীরা সংগঠিত হয়ে অনেক আগে থেকেই মগজ ধোলাই করতে শুরু করেছে এ কথা প্রচার করে যে, ধর্মগ্রন্থগুলো আর তাদের ঈশ্বরই একমাত্র নৈতিকতা বিষয়ে শেষ কথা বলবার অধিকার রাখে। ধর্মগ্রন্থগুলোতে যেভাবে পথ দেখানো হয়েছে, সেগুলো অন্ধভাবে অনুসরণ করাই হল নৈতিকতা[৯৩]। আমাদের দেশি সংস্কৃতি তো আবার এগুলোতে সবসময়ই আবার আরও একধাপ এগিয়ে। অনেক বাসায় দেখেছি সেই ছেলেবেলা থেকেই ছোট ছেলে মেয়েগুলোর মাথা বিগড়ে দিয়ে বাংলা শেখার আগেই বাসায় হুজুর রেখে আরবি পড়ানোর বন্দোবস্ত করানো হয়, নয়ত হরি-কীর্তন শেখানো হয় আর নৈতিক চরিত্র গঠনের মূলমন্ত্র হিসেবে তোতা পাখির মতো আওরানো হয় নীরক্ত বাক্যাবলী- ‘অ্যাই বাবু, এগুলো করে না। আল্লাহ কিন্তু গোনাহ দিবে। ছোটবেলা থেকেই এইভাবে নৈতিকতার সাথে ধর্মের খিচুড়ি একসাথে মিশিয়ে এমনভাবে ছেলে-পিলেদের খাওয়ানো হয় যে তারা বড় হয়েও আর ভাবতেই পারে না যে ধর্ম মানা ছাড়াও কারো পক্ষে ভালো মানুষ হওয়া সম্ভব। কিন্তু সত্যিই কি ধর্মের সাথে নৈতিক চরিত্র গঠনের কোনো বাস্তব যোগাযোগ আছে? নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, কৃষ্ণলীলা, তবলিগ জামাত ইত্যাদির মাধ্যমে গণ মানুষের নৈতিকতা উন্নয়নের যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, সারা পৃথিবী জুড়ে ধর্মের নামে মারামারি, হানাহানি, হিংসা, শোষণ, নির্যাতন, দারিদ্র্য আর সন্ত্রাসের বিস্তার দেখে বোঝা যায়। যে ঈশ্বরে বিশ্বাস আসলে কোনো বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে মানুষের মধ্যে কথনোই কাজ। করে নি। কারণটা অতি পরিষ্কার। ঈশ্বরে বিশ্বাসের মাধ্যমে মরালিটি বা নৈতিকতা অর্জনের চেষ্টা করা আসলে সোজা পথে ভাত না গিলে কানের চারিদিকে হাত ঘুরিয়ে ভাত খাওয়ার মতন। প্রত্যেক ধর্মই বলছে বিধাতা ভালো মানুষকে পুরস্কৃত করেন আর পাপী-তাপী-নীতিহীনদের শাস্তি দেন। বোঝাই যায়, পুরস্কারের লোভটাই এখানে মুখ্য। নৈতিকতা বাদ দিয়ে অন্য যেকোনো উপায়ে আল্লাহকে তুষ্ট করে পুরষ্কার বগলদাবা করতে পারলে কোনো বান্দাই আর নৈতিকতার ধার ধারবে না। একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে, রাম-নাম, হরিবোল, পাঁঠা বলি, কোরবানি, নামাজ, হজ্জ, কোরআন তেলাওয়াত, পূজা, যজ্ঞ এই সমস্ত ব্যাপার-স্যাপারগুলোর মাধ্যমে মানুষ আসলে নৈতিকতার কোনো ধার না ধেরে বিধাতার তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টাতেই মত্ত। মানুষের প্রতি আর সমাজের প্রতি যাদের অবজ্ঞা আর প্রবঞ্চনা বেশি, তারাই কিন্তু বেশি-বেশি ‘আল্লা-আল্লা’ করে। হাজী সেলিমের মতো লোকের হজ্জ করার প্রয়োজনটা পড়ে বেশি, এরশাদের ‘আলহাজ্জ্ব হওয়ার শখ হয় প্রবল। কারণ ধর্মেই রযেছে সমস্ত আ-কাজ, কু-কাজ করেও পার পাবার ঢালাও ব্যবস্থা। মক্কা, জেরুজালেম, পুরী, বারানসী, তিরুপতি, এসব পবিত্র স্থান দর্শনে রয়েছে জীবনের সব পাপ ধুয়ে গিয়ে পরকালে স্বর্গবাসী হওয়ার নিশ্চিত গ্যারান্টি। কোটি টাকার চোরাকারবারী তাই ধুম-ধাম করে পূজা-যজ্ঞ করে নয়ত, শেষ বয়সে এলাকায় মন্দির গড়ে দেয় বেহেশতে একটা প্লট বুকিং দেবার আশায়।
