কিন্তু আপনি অবাক হয়ে যাবেন যদি শোনেন এরা কোন চোরাকারবারি নন। এরা কৃতবিদ্য লেখক। অনলাইন কমিউনিটিতে লেখেন, যাদের আমরা ‘ব্লগার’ বলি। আর তাদের সামনে টেবিলে যা রাখা সেটা ফেন্সিডিলের বোতলও নয়, নয় কোন মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র, কিংবা কোন চোরাই মাল। টেবিলে রাখা তাদের কম্পিউটার, আর ল্যাপটপগুলো। কি বিশাল প্রাপ্তি পুলিশের! ঘটনাক্রমে দিনটা ছিল ২০১৩ সালের পয়লা এপ্রিল। এদিন বাংলা ব্লগের পরিচিত চারজন ব্লগারকে যেভাবে পাকড়াও করা হয়েছে যে ভাবে তাঁদের চোরের মত সাজিয়ে মিডিয়াতে উপস্থাপন করা হয়েছে তা ছিল ভয়াবহ রকমের দুঃস্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্ন কোন ‘এপ্রিল ফুল’-এর তামাসা ছিল না, ছিল রূঢ় বাস্তবতা।
অবশ্য এমনি এমনি তাদের গ্রেফতার করা হয়নি। গ্রেফতারের একদিন আগে, বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্রে : ৮৪ ব্লগারের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় যার ভাষ্য ছিল এরকমের:
ছবি। পেজ ৬৭
১লা এপ্রিল ‘আমার দেশ পত্রিকার রিপোর্টার এম এ নোমান একটি রিপোর্ট লেখেন ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ধর্মবিদ্বেষী ৮৪ ব্লগারের নথি জমা : ব্লগারদের মুখোশ উন্মোচনকারী পত্রিকাগুলোকে ধন্যবাদ শিরোনামে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন[৬৫]:
‘তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ইসলামবিদ্বেষী ৮৪ ব্লগারকে চিহ্নিত করে ছবিসহ তাদের নাম-ঠিকানা ও ব্লগের বিবরণ এবং আপত্তিকর মন্তব্যগুলোর প্রিন্ট কপিও আলেমদের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরুপ কপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেয়া হয়।
ঘটনাবহুল এ সময়গুলোতে, বিএনপি জামাতের মুখপত্র এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রিয় পত্রিকা ‘আমার দেশ’ মুক্তমনা সাইটের নামে নতুন করে বিষেদগার শুরু করা শুরু করে। অবশ্য আমার দেশ এটা না করলেই আমি বরং অবাক হতাম। ভাবতাম, মুক্তমনার প্রভাব তাহলে এখনো জনসাধারণের মধ্যে পৌঁছয়নি। মাহমুদুর রহমানের তুর্কি নাচ দেখে বুঝলাম জায়গা মতোই আঘাত করা হয়েছে। সরকার ও দেশবাসীর প্রতি শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফীর খোলা চিঠি শিরোনামের একটি লেখা প্রকাশ করে আমার দেশ, যেখানে ভেতরের দিকে ‘অন্তরালে ইসলাম অবমাননাকারী অনলাইন চক্র’ অনুচ্ছেদ যোগ করে ধর্মান্ধদের খেপিয়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। আধাপাতার দুই প্যারাগ্রাফের প্রতিটি লাইন মুক্তমনার প্রতি নৈবদ্য আকারে খিস্তি আকারে প্রকাশ করে আমার দেশের প্রতিবেদক। যদিও ‘নির্ভীক প্রতিবেদক’ নিজের নামটি প্রকাশ করেননি সেই প্রতিবেদনে। আমরা ধরে নিতে পারি, নামহীন এই ‘গরলামৃত’ নীলকণ্ঠী মাহমুদুর রহমানেরই কণ্ঠনির্গত :
ছবি। পেজ ৬৮
আওয়ামীলীগ সরকার কার্যত তখন ‘আমার দেশ’ নামক প্রপাগাণ্ডামূলক পত্রিকা থেকে সংক্রমিত ভাইরাসের শিকার হল। ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা না করে ‘অ্যান্টিভাইরাস’কেই ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করলো। এর ফলে গ্রেফতার হলেন মননশীল মুক্তচিন্তার ব্লগারেরা।
তবে, ‘আমার দেশ’ এই ব্লগারদের নিয়ে যত মিথ্যাচার করুক না কেন, ব্লগারেরা কোন অপরাধী ছিলেন না। তারা বরং সমাজ-সচেতন লেখক। তাদের জ্ঞানগর্ভ লেখা বরং আমার মত ছাপোষা পাঠকেরাও মন দিয়ে পড়ে, তাদের যুক্তি-বুদ্ধিতে নিজেকে শানিত করে তুলে। আমি তাদের লেখালিখির মধ্যে খুঁজে পাই জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত। সুব্রত শুভ নামের যে ছেলেটিকে ধরা হয়েছে তার লেখালিখির সাথে আমি খুব ভালভাবেই পরিচিত ছিলাম। কিছুদিন আগে নিজে থেকেই মুক্তমনায় লিখবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তার প্রথম পোস্টটিই ছিল মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক মামা কে নিয়ে। সুব্রতের। লেখা থেকেই আমি জেনেছি কাদের মোল্লার বিচারের অন্যতম প্রধান সাক্ষী শহিদুল হক মামা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন; গেরিলা বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন সে সময়। মিরপুরে কাদের মোল্লা ও বিহারীদের নির্মম ধ্বংসলীলা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। এছাড়াও তিনি ৬৬–তে ছয় দফা, ৬৯-তে গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত ছিলেন। লেখাটা পড়ার আগে উনার কাজের সাথে পরিচয়ই ছিল না আমার। সুব্রত আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল জ্ঞানে গুনে কত ক্ষুদ্র আমি, শহিদুল হক মামার নামই আমি আগে শুনিনি। তার লেখা থেকেই জেনেছিলাম, সুইডেন নিবাসী অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে দেশে চলে এসেছিলেন। প্রথম রাযে উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় বেদনাহত কণ্ঠে বলেছিলেন– ‘বুক ভরা আশা নিয়ে সুইডেন থেকে আসছিলাম। অন্তত আমি ন্যায় বিচার পাব। যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, গণহত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ন্যায় বিচার পাব আদালত থেকে। ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ নেই। আমার অভিযোগ হচ্ছে রায়ের বিরুদ্ধে। সুব্রত শুধু শহিদুল হক মামাকে নিয়েই লিখেনি। তার আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের কথা মনে পড়ছে— ‘মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধশিশু প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কিছু কথা’ এবং অন্যটি– ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রাম-এর ভূমিকা।’ পোস্টগুলোর শিরোনাম দেখেই নিশ্চয় পাঠকেরা অনুমান করতে পারছেন কি অপরিসীম ভালবাসা ছেলেটি বুকে ধারণ করে দেশের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য বলতে দ্বিধা নেই এদের মত দৃপ্ত তরুণদের জন্যই শাহবাগের গণজাগরণ সম্ভব হয়েছে। মানুষ পেযেছে হারানো শক্তি, উদ্যম নতুন আশায় বুক বেঁধেছে পরবর্তী রায়ের জন্য।
