যা হোক, শায়েস্তা আহমদ, নুরুল এইচ খান, মাহবুব হোসেন ও শাহ আবদুল হান্নানের সুপারিশে এবং প্রভাবে প্রথম থেকেই বিএনপি-জামায়াত মতাদর্শের শিক্ষকেরা নিযোগ লাভ করে। প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক হাফিজ জিএ সিদ্দিকী রাজনৈতিক ভাবে জামাত মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলে পত্রিকায় এসেছে (পরে গত বছর অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সাত্তার)। জামাত এবং হিযবুত তাহরীর কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার মানসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ড. মঞ্জুরুল হক খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কথাও শোনা গেছে। মাঝখানে খবর এসেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের ভাগ্নে ও সাবেক ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় নেতাকে উপাচার্য বানাতে চাচ্ছিলেন[৫২]। কিন্তু নাফিসের ঘটনার পর সাধারণ শিক্ষকদের চাপে সেটা তাদের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। হয়নি। এর আগে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সে সময়কার উপাচার্য হাফিজ জিএ সিদ্দিকী বিশ্ববিদ্যালয়ে হিযবুত তাহরীরের জঙ্গি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. মঞ্জুরুল হক, কতিপয় শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদ সদস্যদের নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। পরিচালনা পরিষদের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে হিযবুত তাহরীরের কর্মকাণ্ডে ওতপ্রোত জড়িত থাকার বিষয়টি খুব পরিষ্কার বলে জানা যায়। শাহ আবুল হান্নানের মতোই আরেক হান্নান (ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী) রযেছেন নর্থ সাউথের শিক্ষক হিসেবে; এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন এবং বর্তমানে স্কুল অব বিজনেসের ডিন হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তিনি জামায়াতের অন্যতম নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত। এছাড়া জামাতি মতাদর্শের আরেক প্রভাবশালী শিক্ষক ড. গোলাম মোহাম্মদের কথাও ২০১০ সালের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছিল যিনি অর্থনীতির শিক্ষক হলেও মূলত ছাত্রছাত্রীদের হিযবুত তাহরীরের আদর্শ প্রচারে তৎপর ছিলেন। এই স্বনামধন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে তার নিজের স্ত্রীই ২০০৪ সালে নারী নির্যাতন মামলা করেছিলেন বলে জানা গেছে (তিনি ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেছেন)। শেখ তৌফিক নামে আরেক শিক্ষক যিনি অ্যাকশন এইড নামের এনজিওর সাথে জড়িত ছিলেন, এবং বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক কর্মরত আছেন, তিনি হিযবুত তাহরীরের নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত। এরা সবাই মিলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি করেছে এক জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্য। ২০১৩ সালের মার্চ মাসের তিন তারিখে প্রথম আলো পত্রিকাতেও এইসব গুণধর শিক্ষকদের নাম উহ্য রেখে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে—’কিছু শিক্ষকের ছায়ায় জঙ্গি হচ্ছেন নর্থ সাউথের ছাত্ররা শিরোনামে[৫৩]।
এ ধরণের অভ্যারণ্য তৈরির খেসারত হিসেবে এখানে নিয়মিতভাবে দেখা গেছে উগ্রপন্থী ছাত্রদের নানামুখী বিচরণ। দৈনিক সমকালে সম্প্রতি প্রকাশিত লোমহর্ষক বর্ণনা দিল ঘাতকরা শিরোনামের লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে রাজীব হত্যার সাথে জড়িত দুইজনের সঙ্গে হিযবুত তাহরীরেরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ওই দু’জনের পরিবারও ডিবিকে জানিয়েছেন, তাদের সন্তান হিযবুতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ওই দু’জনের বাসা থেকেও হিযবুতের মতাদর্শের বিভিন্ন জিহাদি বইপত্র পাওয়া গেছে। বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদে জেএমবি ও হুজি সৃষ্টি হয়েছিল। এ দু’টি দল নিষিদ্ধ হলে জামায়াত আন্তর্জাতিক মানের জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর গঠনে মদদ যোগানো শুরু করে। হিযবুত তাহরীরের নেতাকর্মীদের শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগই ছাত্রশিবিরের সদস্য বলে জানা গেছে।
এ সময়ই আলোচনায় উঠে আসে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামে নতুন উগ্রবাদী সংগঠনের কথা। মূলত ছাত্রশিবির ও হিযবুত মিলে গঠিত এ দলটির সদস্যরা রাজীব হত্যায় ইন্ধন যুগিয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে[৫৪]। একটা সময় পর বাংলাদেশ সরকার আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মূল হোতা মুফতি জসিমউদ্দীনসহ তার ত্রিশ জন অনুসারীকে গ্রেফতার করে। মুফতি জসিমউদ্দীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদে লিপ্ত হতে বাংলাদেশী তরুণদের উস্কানি দিত এবং এই কাজে মসজিদ ও মাদ্রাসার মত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসতে থাকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামাজ ঘরটি নাকি জঙ্গি সদস্য নিয়োগের আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পত্রিকাতেই এসেছে রাজীব হত্যাকারীরা একে অপরের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন সেখানেই। শুধু ছেলেদের নামাজ ঘরটিই নয়, একই ভাবে জঙ্গি মনন চাষাবাদে ব্যবহৃত হচ্ছিল মেয়েদের নামাজের ঘরটিও। সে সময় সচলায়তন ব্লগে নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’ শিরোনামের একটি লেখা লিখেছিলেন, যেখানে তিনি নিজের স্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেন এভাবে—
