‘মানুষের কোন কোন স্বভাব যেমন উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় বিশেষ কোন বংশাণুর পরিস্ফুটনের কারণে সৃষ্ট হয়, তেমনি মৌলবাদী সন্ত্রাসও ঘটতে পারে কোন কোন ধর্মীয় আদেশাবলীর উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় পরিস্ফুটিত হবার কারণে। এই উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করতে পারে অনেক কারণ, যার মধ্যে সামাজিক অনাচার অবশ্যই অন্যতম। কিন্তু ‘শুধু সামাজিক অনাচার থাকলেই যে মৌলবাদী সন্ত্রাস ঘটবে এটা নিশ্চিত না। বংশাণুর মত একটা মূল কারণও থাকতে হবে (মৌলবাদী সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে যা হতে ধর্মগ্রন্থের কোন কোন শ্লোক, কিংবা জাতিবিদ্বেষী বিকৃত ইতিহাস চর্চা)। আর এই ধর্মীয় বংশাণু কেবল সামাজিক অনাচারেই পরিস্ফুটিত হয়– তাও হলফ করে বলা যাবে না। কোন কোন ধর্মের আদেশাবলী এতই শক্তিশালী যে বিভিন্ন পরিস্ফুটক পরিবেশ অতি সহজেই সৃষ্ট হয় আদেশাবলীর জোরাল তাগিদেই। আর ধর্মীয় মূল কারণ না থাকলে সামাজিক অনাচার অন্যরকম সন্ত্রাসের জন্ম দিতে পারে। আবার নাও দিতে পারে। থাইল্যান্ডে অতি গরীব বৌদ্ধরা ভিক্ষা করবে কিন্তু কখন ও হিংসায় লিপ্ত হবে না। অনেক গরীব লোক চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও সততা বিসর্জন দেয় না। তিব্বতিদের ওপর অত্যাচার হয়েছে অনেক বেশী। কিন্তু তিব্বতের লোকেরা হিংসার আশ্রয় নিয়ে সন্ত্রাসবাদী হয় নি। কাজেই এটা কখনই বলা যায় না যে সামাজিক অনাচারই ধর্মীয় সন্ত্রাসের মূল কারণ, বরং বলা যায় অনুঘটক মাত্র।
কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিসের আচরণ প্রত্যক্ষ করলে অপার্থিবের এই অভিমতের সত্যতা হয়তো খুঁজে পাবেন অনেকে। চিন্তা করে দেখুন, নাফিস আমাদের আর দশটা ছেলের মতই মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তার পিতা নিজেও ব্যাংকার। তাই ভিনদেশে পাড়ি দিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মত একটি প্রতিষ্ঠান তার ছেলেকে উড়িয়ে দেবার শিক্ষা তিনি দেননি এটা ধরেই নেয়া যায়। এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি যে পারিবারিক পরিবেশ থেকে নাফিস সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছিল। বরং বাবা মা সারা জীবন ধরে সন্তানকে যেভাবে আগলে রাখে সেভাবেই রেখেছিলেন নাফিসকে। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এ ছেলেকে একটা সময় দেশের পাঠ চুকিয়ে বিদেশেও পাঠিয়েছিলেন তারা, ছেলের সুশিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার কথা ভেবে। তাহলে কে বা কারা এমন একটি ‘সোনার টুকরা ছেলেকে রাতারাতি সন্ত্রাসবাদীতে পরিণত করে ফেলল? হ্যাঁ, এ কথা এখন পরিষ্কার করেই বলার সময় এসেছে যে, তার মা-বাবা, পরিবার কেউই নাফিসকে ধর্মান্ধ বানায়নি, তার মিউটেশন ঘটেছিল ‘ধর্মের ভাইরাস’-এর মাধ্যমে। জিহাদি প্যারাসাইটিক ধারণায় আক্রান্ত নাফিসের ভাইরাস-আক্রান্ত মনন ভেবে নিয়েছিল জিহাদ করে এবং বোমা মেরে ফেডারেল ভবন কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জ ভবন উড়িয়ে দিলেই আমেরিকার টনক নড়বে, চাইকি হয়তো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বানচাল হয়ে যেতে পারে, এবং শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের প্রতি আমেরিকার দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান ঘটবে। কিন্তু নাফিস যেটা বোঝেননি তা হল, এধরণের প্রতিটি ঘটনাই তৈরি করে আরো দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের, এবং পরিস্থিতি হয়ে ওঠে তাদের নিজেদের জন্যই আরো নাজুক। এরকম আরো কিছু ঘটনার সাথে আমরা পরিচিত হব পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে।
০২. বিশ্বাসের ভাইরাস : থাবা বাবার রক্তবীজ
শাহবাগ আন্দোলন এবং কাদের মোল্লার ফাঁসি
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। কাদের মোল্লা সহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচারের প্রত্যাশায় শাহবাগ তখন উত্তাল। শুরুটা হয়েছিল কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। শতাধিক হত্যা ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী ছয়টি অভিযোগে কাদের মোল্লার জড়িত থাকার বিষয়গুলো ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও মাননীয় আদালত ফাঁসি না দিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
কাদের মোল্লার এ রাযের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক ও ব্লগসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফুঁসে ওঠে অনলাইন ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্টরা। তাদের মাধ্যমেই সূচনা হয় এক অবিস্মরণীয় মহাজাগরণের।
কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি নিয়ে ‘ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক’র ব্যানারে ওইদিন বিকেলেই শাহবাগে জড়ো হয় একদল তরুণ। আর এ খবর ছড়িযে পড়লে তাদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ একত্রিত হতে শুরু করে শাহবাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা দলে দলে যোগ দিতে থাকেন শাহবাগে। আশেপাশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও শিক্ষার্থীরা ছুটে যান শাহবাগে। ছুটে যান নারীরা। ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের জোয়ার ঢাকা শহরকে অতিক্রম করে যায়। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ছাত্রজনতাসহ সর্বস্তরের মানুষের টানা গণ অবস্থান শুরু হয় সেখানে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। দ্রুতই শাহবাগের জনসমাবেশ পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। সকল শ্রেণির মানুষের পাশাপাশি এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী মহল সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
