অন্য ধর্মে যেমন ‘বিশ্বাসের আগাছা’র চাষ আছে, আছে ইসলামেও। ইতিহাসবিদেরাই কিন্তু স্বীকার করেন নবী মুহম্মদের জীবনের বছরগুলো অত্যন্ত সংঘাতময় ছিল[৩৪]। তার জীবনের শেষ দশ বছরে তিনি নাখলার যুদ্ধ, বদরের যুদ্ধ, বানু কাইনুকা, বানু নাদির, বানু মুস্তালাক, আহজাব, বানু কোরাইজা, খাইবারের যুদ্ধ সহ প্রায় ৭০ টি থেকে ১০০টি আক্রমণ, লুণ্ঠন অভিযান এবং যুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ আছে[৩৫]। এর মধ্যে ১৭টি থেকে ২৯টিতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অধিকাংশ যুদ্ধই ছিল আত্মরক্ষার্থে নয়, বরং আক্রমণাত্মক[৩৬]। নৃশংস ঘটনা এবং গণহত্যার আলামতও আছে ঢের। বানু কাইনুকার ইহুদীদের সাতশ জনকে এক সকালের মধ্যে হত্যা করতে সচেষ্ট হন[৩৭], আর বানু কোরাইজার প্রায় আটশ থেকে নয়শ লোককে হত্যা করেন, এমনকি তারা আত্মসমর্পণ করার পরও[৩৮]। হত্যার ভয়াবহতা এতোই বেশি ছিলো যে, ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর মতো লেখিকা, যিনি মুসলিম সমাজের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থানীয় হিসবে গণ্য হন, তিনি পর্যন্ত মুহম্মদের কর্মকাণ্ডকে নাৎসি বর্বরতার সাথে তুলনা করেছেন[৩৯]। বহু যুদ্ধক্ষেত্র হতে সাফিয়া, রায়হান, জুয়াইরিয়ার মতো নারীকে যুদ্ধবন্দি এবং ‘মাল-এ-গণিমত হিসেবে মহানবীর জন্য অধিগ্রহণও করা হয়েছিল, ভাগ বাটোয়ারা করা হয়েছিল মুহম্মদের সৈনিকদের মাঝে। এমনকি মহানবীর মৃত্যুর পরও সহিংসতা অব্যাহত ছিল। হজরত আলী আর প্রয়াত নবীর স্ত্রী আয়েশার মধ্যে সংগঠিত জামালের যুদ্ধ কিংবা আলি আর মুয়াবিয়ার মধ্যে সংঘটিত ‘সিফিনের যুদ্ধ’ই এর প্রমাণ। জামালের প্রায় দশ হাজার মুসলিম নিহত হয়েছিল। ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয় যে, চারজন খলিফার মধ্যে তিনজনই ক্ষমতা দ্বন্দ্বে মুসলিম প্রতিপক্ষের হাতে মারা যান। তবে মারা যাবার আগে তারা ইসলামী ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখতে বহু দেশ আক্রমণ করে সেগুলো অধিগ্রহণ করেন। যেমন খলিফা আবু বকরের সময় (৬৩৩– ৬৩৪) ওমান, ইয়েমেন, ইয়ামাহ, সিরিয়া, পারস্য, বসরা, দামাস্কাস এবং আজনাদিনের যুদ্ধ, খলিফা ওমরের সময় (৬৩৪– ৬৪৪) নামারাক, সাকাটিয়া, ব্রিজ, বুয়াইব, দামাস্কাস এবং ফাহল, ইয়ারমুক, কাদিসিয়া এবং মাদাইন, জালুলা, জেরুজালেম, জাজিরা, খাজিস্তান এবং মিশর, আজারবাইজান, ফারস এবং খারান বিজয়, খলিফা ওসমানের সময় (৬৪৭– ৬৫৬) সাইপ্রাস, বাইজেন্টাইন এবং উত্তর আফ্রিকা আক্রমণ, খলিফা আলির সময় নাহরোয়ানের যুদ্ধ এবং মিশরের যুদ্ধ ইত্যাদি উল্লেখ্য। হজরত আলী ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে বিষাক্ত ছুরিকাঘাতে নিহত হলে, খালিফায়ে রাশেদীনের যুগের সমাপ্তি ঘটে এবং এ সময় একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হন মুয়াবিয়া। তার শাসনামলে বহু যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল, তার জিহাদি সৈনিকদের দ্বারা বহু রাজ্য হয়েছিল অধিকৃত। এর মধ্যে মিশর বিজয় (৬৬২ খ্রিস্টাব্দ), সিসিলি আক্রমণ (৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ), কনস্টানটিপোল আক্রমণ (৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দ), কুফার যুদ্ধ (৬৮৭ খ্রিস্টাব্দ), দের-উল-জালিকের যুদ্ধ (৬৯১ খ্রিস্টাব্দ), উত্তর আফ্রিকা আক্রমণ (৭০০ খ্রিস্টাব্দ), দের-উল-জামিলার যুদ্ধ (৭০২ খ্রিষ্টাব্দ), সিন্ধুর লড়াই (৭১২ খ্রিস্টাব্দ), ফ্রান্সের যুদ্ধ (৭৩২ খ্রিষ্টাব্দ), আইন আল জারের যুদ্ধ (৭৪৪ খ্রিস্টাব্দ), রেয়’র যুদ্ধ (৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দ), ইশফাহান এবং নিহাওয়ালের যুদ্ধ (৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রভৃতির কথা বলা যায়। এর মধ্যে ৭১১ সালে ইসলামের স্পেন বিজয়ের পর যেন বিশৃঙ্খলা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত স্পেন বিজয়ের পর থেকেই ইসলামী সাম্রাজ্যবাদী শাসন বৈশ্বিক অবস্থায় চলে যায় বললে অত্যুক্তি হয় না[৪০]। শুধু স্পেন বিজয়ই বা বলি কেন, স্পেন বিজয়ের পর নবম শতকের গোড়ার দিকে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর এবং ইতালির বাইরের দ্বীপগুলো দখল, ৮১৩ সালে সেন্টমসেলি, ইশ্চিয়া, ল্যাম্পেডুসা দখল, ৮৪৮ সালে আনকোনায় ধংসযজ্ঞ, ৮৭৬ সালে ল্যাটিয়াম ও আম্বিয়া আক্রমণ, ৬২৫-৭২৫ সাল নাগাদ ক্রমাগতভাবে সিসিলি আক্রমণ, ৮২৭ সালে মাযারা ডেল ভ্যালো আক্রমণ, ৮৩১ সালে পালের্মো, ৯৩৫ সালে প্যান্টেলেরিয়া এবং ৮৪৩ সালে মেসিনার পতন, ৮৭৮ সালে সিরাকুসের আদিবাসীদের হত্যা, ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের উপর আগ্রাসন প্রমাণ করে সাম্রাজ্যবাদ কেবল পশ্চিমাদেরই একচেটিয়া ছিল না। কনস্টান্টিনোপলের বিখ্যাত বিজয়ের পর মুসলিম জিহাদি সৈনিকেরা তিনদিন ধরে সেখানকার নাগরিকদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং অবশিষ্টদের ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল। ১০১০ থেকে ১০১৩ সালের মধ্যে কর্ডোভার নিকটবর্তী অঞ্চল এবং এবং স্পেনের অন্যান্য অঞ্চলে হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করা হয়। অমুসলিমদের সরকারী চাকুরীতে অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে ১০৬৬ সালে ব্যাপক দাঙ্গা হয়, এবং গ্রানাডার ইহুদিদের একটা গোটা সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। ইতিহাস থেকেই জানা যায়, ইসলামের জিহাদের নামে গত বার শতক ধরে সাড়া পৃথিবীতে মিলিয়নের ওপর মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথম বছরগুলোতে মুসলিম বাহিনী খুব দ্রুতগতিতে পূর্ব ভারত থেকে পশ্চিম মরক্কো পর্যন্ত আগ্রাসন চালায়। শুধু বিধর্মীদের হত্যা করেনি, নিজেদের মধ্যেও কোন্দল করে নানা দল উপদল তৈরি করেছিল। কারিজিরা যুদ্ধ শুরু করেছিলো সুন্নিদের বিরুদ্ধে। আজারিকিরা অন্য সকল পাপীদের’ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। ১৮০৪ সালে সুদানের পবিত্র সত্ত্বা উসমান দান ফোডিও গোবির সুলতানের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ শুরু করে। ১৮৫০ সালে আরেক সুদানীয় সুফি উমর-আল হজ্জ প্যাগান আফ্রিকান গোত্রের উপরে নৃশংস বর্বরতা চালায়– গণহত্যা এবং শিরচ্ছেদ করে ৩০০ জন বন্দির উপর। ১৯৮০ সালে তৃতীয় সুদানীয় ‘হলি ম্যান’ মুহাম্মদ আহমেদ জিহাদ চালিয়ে ১০,০০০ মিশরীয় লোকজন হত্যা করে। এধরণের বহু ঘটনাই অতীতে ঘটেছে, এখনো ঘটছে।
